সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার। ২০১১ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য। ১৯৮৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। জন্ম ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে করেছেন ১০০টি সেঞ্চুরি। খেলেছেন ২০০টি টেস্ট। টেস্টে ৫১টি সেঞ্চুরিসহ ১৫ হাজার ৯২১ রান এবং ৪৬৩টি ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪৯টি সেঞ্চুরিসহ ১৮ হাজার ৪২৬ রানের মালিক তিনি।

default-image

শুধু ভারতের হয়ে খেলা গত ২২ বছর ধরে নয়, তারও অনেক আগে থেকেই ক্রিকেট আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১১ বছর বয়সে যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে ক্রিকেট আমি সিরিয়াসলি খেলব, তখন থেকে ক্রিকেটই আমার জগৎ। এর আগেও আমি ক্রিকেট খেলতাম, কিন্তু সেটা ছিল আমার পড়শি বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে টেনিস বল দিয়ে খেলা—এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। কিন্তু যে মুহূর্ত থেকে আমি ঠিক করলাম, আমি ক্রিকেট খেলব এবং আমার লক্ষ্য হবে ভারতের হয়ে খেলা; সে মুহূর্ত থেকে আমার জীবনে যা ঘটেছে, তা ক্রিকেটকে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে। আমার জীবনের সব দায়িত্ব, সব চাপ সামাল দিয়েছে আমার বড় ভাই অজিত এবং বিয়ের পরে আমার স্ত্রী অঞ্জলি। এ কথা বললে ভুল হবে না, আমার জীবনের মঞ্চে সামনে ছিল শুধুই ক্রিকেট, বাকি সবই পেছনে।
আমি যখন স্কুলে পড়তাম, অনেকবারই আমার ইচ্ছা হয়েছে প্র্যাকটিসে না গিয়ে আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলি। তাদের সঙ্গে ভেলপুরি, পানিপুরি খেয়ে সময় কাটাই; সিনেমা দেখি, টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলি কিংবা বাসার সামনে ছোটাছুটি করি—১২ বছর বয়সী একটি ছেলের এসবই তো করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমার কোচ রমাকান্ত আচরেকার তাঁর স্কুটার নিয়ে শিবাজি পার্ক থেকে চলে আসতেন এবং আমাকে নিয়ে যেতেন। তিনি আমাকে ক্রিকেট খেলিয়েই ছাড়তেন। আমি অনেকবার লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রতিবারই তিনি আমাকে খুঁজে বের করতেন। এখন যখন আমি পেছনে ফিরে তাকাই এবং সেসব দিনের কথা ভাবি, যখন আমি ক্রিকেট খেলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতাম, আমি খুবই আনন্দ পাই এই ভেবে যে এসব আমার জীবনে হয়েছে। এ ঘটনাগুলো না ঘটলে জীবনে আমি অনেক কিছুই পেতাম না। ক্রিকেটে আমার সাফল্যের পেছনে আমার বড় ভাই অজিত এবং কোচ রমাকান্ত আচরেকারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
আমি ভারতের ক্রিকেট ক্যাপ প্রথম মাথায় দিই ১৯৮৯ সালে, পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের আগের প্রস্তুতি ম্যাচে। সেটা ছিল আমার জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর অন্যতম। ভারতীয় দলের টুপি, সোয়েটার, জার্সি—সবকিছুই আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমি সব সময় মাঠে নেমেছি বড় রান করার জন্য। আমার সব ব্যক্তিগত রেকর্ড, মানুষ আমার যেসব বড় রানের কথা স্মরণ করে—সবকিছুই এসেছে ভারতের হয়ে খেলতে গিয়ে। আমি ভালো বা খারাপ, যা-ই খেলি না কেন, ভারতের হয়ে খেলতে গিয়েই এসব এসেছে এবং সব সময়ই আমার লক্ষ্য ছিল একটাই—মাঠে নেমে ম্যাচ জিতে আসা। এটা করতে গিয়ে আমি যা অর্জন করেছি কিংবা যা অর্জন করতে পারিনি, এসব ছিল আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি সব সময়। আমি বিশ্বাস করি, একজন খেলোয়াড়ের জন্য ম্যাচের আগের প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্ব বহন করে, এটা নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগায় যে আমি আমার সেরাটা দিতে পারব। কিন্তু ম্যাচে কী হবে, সেটা একমাত্র সর্বশক্তিমানই জানেন, আমরা সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কখনো ম্যাচের ফল আমাদের পক্ষে যায়, কখনো বিপক্ষে—আমরা সব সময় মাঠে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করি।
স্বপ্ন দেখা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নের পেছনে শ্রম দেওয়া। আমরা স্বপ্ন দেখি নিদ্রায়, কিন্তু কাজ করি জেগে থেকে; জেগে থাকাটাও আমাদের জীবনে সমান গুরুত্ববহ। আমি যেভাবে নিজেকে ম্যাচের জন্য প্রস্তুত করি, তাতে প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আমার হাতে থাকে। নিজের প্রস্তুতির কাজটা আমি নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। মাঠে খেলতে নেমে কোনো খেলোয়াড়ই এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে না যে আমি আজকে সেঞ্চুরি করব বা পাঁচ উইকেট তুলে নেব। কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুতির গ্যারান্টি একজন খেলোয়াড় দিতে পারে, কারণ এটা তার নিয়ন্ত্রণের আওতায়। একজন খেলোয়াড়ের উচিত নিজের নিয়ন্ত্রণের আওতায় যে জিনিসগুলো আছে, সে ব্যাপারগুলোতে সময় দেওয়া। আর যে ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলোকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। আমি যখন জানি যে আমি ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি এবং এর চেয়ে আর ভালো কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, তখন আমি নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাই। খেলায় আমি চেষ্টা করি নিজের চিন্তাকে যতটা সম্ভব শূন্য রাখতে, এতে করে আমি যেকোনো বলকে তার মতো করেই খেলতে পারি। এটা আমার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসে।
এটা ভাবতে আমার খুবই ভালো লাগে যে মানুষ আমার খেলাকে ভালোবেসেছে, আমাকে সমর্থন দিয়েছে, আমার জন্য প্রার্থনা করেছে। এমন অনেক মানুষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, যারা আমার মঙ্গল কামনায় কয়েক সপ্তাহ ধরে উপবাস পালন করেছে। আমি সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই এ সবকিছুর জন্য এবং প্রার্থনা করি, সবকিছু যেন এভাবেই চলতে থাকে। যখন কেউ কোনো কাজে নিজের মনপ্রাণ ঢেলে দেয় এবং লাখ লাখ মানুষ তার সেই কাজের প্রশংসা করে—এটা সেই মানুষকে অসীম আনন্দ এনে দেয়, তার প্রতি মুহূর্তের শ্রমকে সার্থক করে তোলে। আমি সেই মানুষ হতে পেরেছি, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

সূত্র: ডেইলি মোশন ডট কম। অর্ণব গোস্বামীকে দেওয়া শচীন টেন্ডুলকারের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন মনীষ দাশ

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন