গম্ভীর সেই রসিক মানুষটি

বিজ্ঞাপন
default-image
>আনিসুজ্জামান ছিলেন আমাদের বটবৃক্ষ। মানে তিনি আমাদের সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করেছেন আজীবন। ১৪ মে তিনি পরলোক গমন করেছেন। এই লেখার মাধ্যমে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ...

তাঁর চেহারাটায় বেশ একটা গাম্ভীর্য লেগে থাকত। কেউ তাঁকে ঠিকভাবে না জানলে চেহারা দেখে একটু থতমত খাবে। এবং এ রকম মানুষের সামনে পড়লে যা হয়, কথা বলত গিয়ে তোতলাতে থাকবে। কিন্তু যারা তাঁকে চিনত, তারা খুব সহজেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারত। কথা বলতে বলতেই জেনে নিত তাঁর রসিক মনটাকে।

একবার হয়েছে কি, তাঁর লেখা কথার কথা নামে একটি বই এসেছে আমার হাতে। রিভিউ করতে হবে। পড়তে বসে দেখি, আরে, এ তো বাংলা শব্দ নিয়ে মজার মজার সব লেখা! প্রথম লেখাটার কথাই তোমাদের বলি। ‘মানে নেই, মানে আছে’ নামের সে লেখাটিই টেনে নিয়ে যায় অন্য লেখাগুলোর দিকে। মন বলে, দেখি তো এরপর কী আছে! তা সেই লেখায় তিনি বলছেন, কুচকুচে কালোই হয়, আর টকটকে লাল। ধবধবে সাদা। কিন্তু এই কুচকুচে, ধবধবে, টকটকের মানেটা কী? এ শব্দগুলোর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কী মজা! এভাবেই আমরা কথা বলি। আমরা কুচকুচে লাল কিংবা ধবধবে কালো তো বলি না! একটা বাক্য লিখেছেন তিনি, ‘ফিনফিনে কাপড় পরে, চকচকে জুতো পরে মচমচ করে হাঁটে।’ এরপর এ রকম অনেকগুলো শব্দ লিখেছেন আর বলেছেন, ‘এসব শব্দ দিয়ে বাক্য বানাও তো। কয়েকটা শব্দ থাকল তোমাদের জন্য: আঁকুপাঁকু, কিলবিল, খটমট, গজগজ, চপচপ, ছপছপ, ঠাসঠাস। এ এক মজার খেলা!’

বইটির রিভিউ ছাপা হওয়ার পর রাতে তাঁর ফোন এল। তিনি বললেন, ‘কাকা, তোমার রিভিউটা আমার বইটার চেয়ে ভালো হয়েছে!’

শুনেছ কথা! রসিক মানুষ না হলে কেউ এ রকম বলে?

সেই মানুষটা, আমাদের সবার প্রিয় আনিসুজ্জামান চলে গেলেন ১৪ মে। আমি তাঁকে ‘কাকা’ বলে ডাকতাম। খুব স্নেহ করতেন আমাদের। আমার বাবা ছিলেন তাঁর ছোট মাস্টার, সেই ১৯৪৫-৪৬ সালের দিকের কথা সেটা। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ভালো আঁকতে পারতেন আমার বাবা। সেটাই ছিল শিশু আনিসুজ্জামানের বেশি পছন্দ!

কলকাতায় বড় হচ্ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হওয়ার পর তাঁরা চলে এলেন খুলনায়, তারপর ঢাকায়। আর তার পরপরই ১৯৫২ সালে কলেজের ছাত্র অবস্থায় যুক্ত হলেন ভাষা আন্দোলনে। সেই কলেজপড়ুয়া ছেলেটিই লিখলেন বায়ান্ন সালে ভাষা নিয়ে প্রথম পুস্তিকা। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে রক্ত ঝরল, ২২ তারিখে রক্ত ঝরল। ২১ তারিখ সেই ঐতিহাসিক ছাত্রসমাবেশে ছিলেন আনিসুজ্জামান। ২৩ তারিখ রাতজুড়ে মেডিকেল কলেজের ছেলেরা বানালেন শহীদ মিনার। ২৪ তারিখে তা উদ্বোধন করা হলো। পরদিন আনিসুজ্জামানের মা তাঁর মৃত মেয়ের গলার হার রেখে এলেন শহীদ মিনারে।

দেশজুড়ে কিংবা দেশের বাইরে যে অনুষ্ঠানগুলো হতো, সেগুলোয় তাঁকে অতিথি হিসেবে পেলে আয়োজকদের মন ভরে যেত। তিনি বলতেন খুব কম কথা। কিন্তু যা বলতেন পাঁচ মিনিটে, তা অন্য অনেকে বললে লাগত এক ঘণ্টা। খুব গুছিয়ে মূল কথাগুলো বলে ফেলতে পারতেন তিনি।

তাঁকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। বরং কারও অনুরোধে ‘না’ করতে পারতেন না বলে আমরাই কেউ কেউ তাঁর ওপর রাগ করতাম। কিন্তু তাঁর মনটা এতটাই কোমল ছিল যে কেউ তাঁর কথায় মন খারাপ করতে পারেন, সেটা তিনি একেবারেই চাইতেন না।

বাংলা ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতি নিয়ে ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। সুযোগ পেলেই এ তিনটি বিষয়ের উন্নতির জন্য সময় দিয়েছেন। আরও অনেক কিছুই বলা যায় তাঁকে নিয়ে। তবে একটা বিষয় নিয়ে বলাটা খুব জরুরি। ১৯৯১ সালে পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী দলটি তাদের আমির নির্বাচিত করলে ফুঁসে উঠেছিল বাংলাদেশের মানুষ। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সে আন্দোলনে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, আনিসুজ্জামান ছিলেন তাঁদের একজন। গণ–আদালতে তিনজন অভিযোগকারীর মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। বাকি দুজন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও সৈয়দ শামসুল হক। সে সময়ের সরকার গণ–আদালতের ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে যাঁরা হৃদয়ে ধারণ করেন, তাঁদের কাছে ১৯৯২ সালের গণ–আদালত ছিল অনুপ্রেরণার অন্য নাম। এখনো তা মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।

খেতে এবং খাওয়াতে পছন্দ করতেন তিনি। একবার জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের রেসিপিতে রান্না করছিলেন আনিসুজ্জামানের স্ত্রী, আমাদের বেবি কাকি। টেবিলে যখন সব প্রস্তুত, আমি বললাম, কী যেন নেই টেবিলে। বলে রসিকতা করে একটি খাবারের নাম বললাম। ‘আছে তো!’ বলে সে খাবারটিও টেবিলে জায়গা করে দিলেন তিনি।

এ রকম একজন মানুষ নেই, সে কথা ভাবতে গিয়ে মনটা ভারী হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন