>

গল্পটা মনের জোর ও ভালোবাসার শক্তির:  করোনা জয় করার অভিজ্ঞতা

default-image

সাহস আর উৎসাহ দিতে সেই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি ইতিবাচক হও, ‘বি পজেটিভ’। কিন্তু অর্ধশতক বয়স পার হওয়ার পর ‘পজিটিভ’ কথাটা যে এতটা আতঙ্ক ছড়াবে, তা প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম ১৯ এপ্রিল, রোববার। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—আইইডিসিআরের ছোট্ট একটা ই-মেইল বার্তা এই দিন পেয়েছিলাম ঠিক বেলা ২টা ৪ মিনিটে। বার্তার শুরুতেই লেখা ‘পজিটিভ’।

করোনাভাইরাসের এখন আনুষ্ঠানিক নাম কোভিড-১৯। শুরু থেকেই শুনে আসছি আক্রান্ত হওয়া যাবে না। আর হয়ে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মনের জোর রাখা। অর্থাৎ ‘পজিটিভ’ হলেও ‘পজিটিভ’ থাকতে হবে। পেশায় সাংবাদিক। তাই শুরু থেকেই কোভিড-১৯-এর সব ধরনের দেশি ও বিদেশি সংবাদ ও বিশ্লেষণ দেখতে হয়েছে। অফিসেও ছিল সতর্কতামূলক সব ধরনের ব্যবস্থা। তার পরও আমি কীভাবে আক্রান্ত হলাম, সেটি এখনো আমার কাছে রহস্য।

লেবাননের গৃহযুদ্ধ নিয়ে জিয়াদ দুয়েরির বিখ্যাত ‘ওয়েস্ট বৈরুত’ সিনেমাটার শেষের দিকে একটা দৃশ্য আছে। গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ায় অবস্থাপন্ন তারিকের জীবন বদলে গেছে। কলেজ বন্ধ, মা-বাবার কাজ নেই। হতাশ তারিক তার বন্ধুকে বলছে, ‘তুমি কখনো মহাবিপর্যয়ের মধ্যে কাউকে পড়তে দেখেছো। কাউকে এ রকম দেখে তুমি বলো, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এই লোকটা আমি না। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে আমি সেই লোকটির মতো। আর সবাই আমাকে দেখে বলছে, আহারে, বেচারা। আর ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে বলছে, ভাগ্যিস এই লোকটি আমি না।’ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পর আমার অনুভূতি ছিল তারিকের মতোই। অনিশ্চিত সেই ভবিষ্যতের মধ্যেও সিনেমার শেষ দৃশ্যে তারিকের পরিবার বেঁচে থাকার স্বপ্ন ঠিক দেখেছে। সেই স্বপ্ন আমিও দেখেছি।

এর পরের ১২ দিন আসলে একটা যুদ্ধ জয়েরই গল্প। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন আগেই বলে দিয়েছেন, ‘এবারের এই যুদ্ধ অদৃশ্য এক শত্রুর সঙ্গে।’ এ এমন এক শত্রু, যাকে দেখা যায় না, আচরণ বোঝা যায় না, এর পরের চালটিও জানা যায় না। এই যুদ্ধে একাও জয়ী হওয়া যায় না। প্রয়োজন হয় সবার ভালোবাসা, সহযোগিতা ও জরুরি চিকিৎসা। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। থাকতে হয়েছে নানা শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে। কখনো হতাশ হয়েছি, আবার মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেকে সামাল দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে এই অভিজ্ঞতা বিরল। সাংবাদিক হিসেবে সব সময় অন্যের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে খবর লিখেছি, আর এবার আমি নিজেই ছিলাম খবরের মধ্যে।

জ্বর ও পরীক্ষা পর্ব
১২ এপ্রিল থেকে বাসায় থেকেই অফিস করতাম। সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর ২৫ মার্চ থেকেই সাবধানতার জন্য থাকতাম আলাদা রুমে। ১৫ এপ্রিল ছিল বুধবার। দিনটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না, অন্য আরেকটা দিনের মতোই। কেবল দুপুরে একবার পানি খেতে গিয়ে মনে হয়েছিল একটু বেশি ঠান্ডা। রাতের দিকে একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেই প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম জ্বর এসেছে।

জ্বর ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু সময়টাই এমন যে সামান্য মেঘ দেখলেই ভয়। কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ তখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। পত্রিকার পাতাজুড়ে কেবল সেই খবর। ভাইরাসটি নতুন। নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য এলেই পাঠকদের জানানো তখন আমাদের বড় কাজ। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের লেখা ছাপা হচ্ছে। জানছি ভাইরাসটির নতুন নতুন অনেক কিছু। সামান্য জ্বরও আর হেলার বিষয় না। মনের তখন দুটো ভাগ। এক ভাগ বলছে, চিন্তার কিছু নেই, সাধারণ জ্বর। আরেক ভাগ আতঙ্ক বাড়াচ্ছে।

কোভিড-১৯ পরীক্ষা করার জন্য তখন একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর। সে সময় পরীক্ষা করতে পারাটাই ছিল বিশেষ এক ঘটনা। তাদের একটা হটলাইন ছিল বটে, কিন্তু নাগাল পাওয়া কঠিন একটা ব্যাপার। কেবল জ্বর আর বিদেশফেরত কারও সংস্পর্শে না আসা মানেই পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট কারণ ঘটেনি। প্রথম আলোয় আমার সহকর্মী শিশির মোড়ল শুরু থেকেই কোভিড-১৯-এর সব ধরনের সংবাদের পেছনে ছুটেছেন। আমার বৃহত্তর পরিবারে একাধিক চিকিৎসক আছেন। আমার স্ত্রীর বড় ভাই ও বড় বোন দুজনই চিকিৎসক। সবার চেষ্টায় আইইডিসিআরের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাসায় এলেন ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার। এই দিন কিন্তু আমার তেমন জ্বর ছিল না। ভালো হয়ে গেছি, এ রকম এক বিশ্বাস রাখতে চেষ্টা করেছিলাম সারা দিন।

আমি থাকি মিরপুর ডিওএইচএসের মতো খানিকটা সংরক্ষিত এলাকায়। এর আগে এখানে কেউ আক্রান্ত ছিলেন না। সবার মধ্যে আতঙ্ক আছে। মিরপুর ডিওএইচএস পরিষদের সাধারণ সম্পাদককে জানাতেই বাসা লকডাউন করে দেওয়া হলো। বিকেলে নমুনা সংগ্রহ করলেন আইইডিসিআরের দুজন স্বাস্থ্যকর্মী।

সাধারণত আক্রান্ত হলে উপসর্গগুলো দেখা দেয় ১২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে। বিপদটা এখানেই। নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক পরার মতো নিয়মকানুন পালন করলেও বাসায় এক টেবিলে খাওয়া বা টেলিভিশন দেখা বন্ধ ছিল না। তবে জ্বর হওয়ার পর থেকে সম্পূর্ণভাবে কোয়ারেন্টিন বা সঙ্গনিরোধ কঠোরভাবে পালন করেছি। লক্ষণ দেখলে এটা করতেই হবে, বিশেষ করে পরিবারের বাকি সদস্যদের জন্য।

পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়ার এক দিন পর সামান্য গলাব্যথা শুরু হয়েছিল, আর জ্বর ছিল ১০১। আক্রান্ত বা ‘পজিটিভ’ হলে আইইডিসিআর সাধারণত দুদিনের মধ্যে জানিয়ে দেয়। ‘নেগেটিভ’ হলে একটু দেরি হয়। একদিকে দ্রুত জেনে মনের অস্থিরতা কমানোর তাগিদ, অন্যদিকে গোপন প্রত্যাশা, দেরি মানেই তো সাধারণ জ্বর। তার পরই আইইডিসিআরের সেই ই-মেইল বার্তা।

বার্তাটি পেয়েই প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, এ কি আমার মৃত্যু পরোয়ানা? পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়া মনে হয় একেই বলে। তাৎক্ষণিক ভাবনা ছিল আমার পরিবারের কী হবে। আমি থাকব না, এর চেয়েও বড় চিন্তা ওরা সংক্রমিত হলে তা হবে বড় বিপর্যয়। সবাইকে জানানো হলো। সহকর্মী শিশির মোড়ল জানালেন সম্পাদক মতি ভাইকে।

আইইডিসিআর থেকে ডা. ফারসিম নামের একজন চিকিৎসক ফোন দিলেন সাড়ে তিনটার দিকে। জানতে চাইলেন, আমি হাসপাতালে যেতে চাই কি না? কোভিড-১৯ আক্রান্ত সবার হাসপাতালে যেতে হয় না। বাসায় নিয়মকানুন পালন করলেই সুস্থ হয়ে যায় বড় অংশ। যাঁদের কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে, সংকট তাঁদের নিয়েই। ফুসফুস আক্রান্ত হতে পেরে। রক্ত জমাট বেঁধে যায় কারও কারও। প্রয়োজন হয় অক্সিজেনের, কাউকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সুবিধা দিতে হয়।

অধ্যাপক আহমেদুল কবির মেডিসিনের একজন বড় চিকিৎসক। সহকর্মী শিশির মোড়ল তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে কথা বলতে বললেন। অধ্যাপক কবির সব শুনে সংক্রমণ কতটা ছড়িয়েছে তা জানতে বুকের এক্সরেসহ রক্তের কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এসব পরীক্ষা বাসায় বসে করা সম্ভব নয়। আর কোভিড-১৯ পজিটিভ একজন রোগীকে অনেক প্রতিষ্ঠানই গ্রহণ করতে চাইবে না। সুতরাং হাসপাতালে যেতে হবে। আর কেউ ঝুঁকিও নিতে চাইছিলেন না।

হাসপাতালভীতি সম্ভবত সবারই থাকে। হাসপাতালে কোভিড-১৯-এর চিকিৎসা নিয়ে তখন অনেক অভিযোগ। রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। চিকিৎসা না পেয়ে পথেই মারা গেছেন বা দরজায় দরজায় ঘুরলেও ভর্তি হতে পারেননি, এসব তো আমরাই ছেপেছি।

সবচেয়ে কাছের হাসপাতাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। তবে সেখানে শয্যা বা বেডের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রথম আলো থেকেই মুগদা জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। মাত্রই করোনোভাইরাসে সংক্রমিত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

হাসপাতাল ও ওয়ার্ড পর্ব
দিনটি ছিল ২০ এপ্রিল, সোমবার। ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের দ্বিতীয় রোগী হিসেবে ঠাঁই হয় নবম তলার ৪৪ নম্বর শয্যা বা বেডে। এরপর ১২ দিন আমাকে থাকতে হয়েছে এই হাসপাতালেই। এই ১২ দিনের দুই দিন থেকেছি ওয়ার্ডে, এক রাত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে, বাকি সময়টায় কেবিনে। সুতরাং সাধারণ রোগী আর গুরুত্বপূর্ণ রোগী—উভয় পরিচয়েই আমার দেখা হয়েছে অনেক কিছু।

একটি ওয়ার্ডে ছয়টা করে শয্যা। চারটা সিলিং ফ্যান থাকলেও রেগুলেটর সব কটিই নষ্ট। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে জ্বর প্রায় অবধারিত। কিন্তু সবার এক অবস্থা না। ফ্যান বন্ধ করলে গরম, ছাড়লে ঠান্ডা। তবে সবচেয়ে দুরবস্থা বাথরুমের। মাত্র দুটো টয়লেট, দুটো বেসিন, নোংরা। কিছুক্ষণ পর পর ব্লিচিং পাউডার দেন ক্লিনাররা। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে কুসুমগরম পানি খেতে হবে, এমনটাই পরামর্শ সবার। কিন্তু গরম পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। কে ওয়ার্ডবয়, কে ক্লিনার, বোঝার কোনো উপায় ছিল না। সবাই দূরে দূরে থাকেন। কথা বলতে চাইলেও কেউ সাড়া দেন না। সবার মধ্যে আতঙ্ক।

ওয়ার্ডে নানা ধরনের রোগী ভর্তি। কয়েকজনের অবস্থা বেশ খারাপ। বয়স্ক মানুষ, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। বিছানাতেই প্রস্রাব করে সেখানেই শুয়ে থাকছেন। কিছুক্ষণ পরে আবার রুমের বাইরে গিয়ে বসে থাকছেন, সেখানেও একই কাণ্ড! তাঁকে বিশেষভাবে দেখার এমন কেউ নেই। কেউ ধরেনও না। দুঃখজনক আচরণও আছে। বয়স্ক ওই ভদ্রলোক রুমের বাইরে বের হলে অন্য রোগীদেরই কেউ কেউ দরজা আটকে রাখতেন। সারা রাত তাঁদের কাউকে বাইরে মেঝেতে শুয়ে থাকতেও দেখেছি।

সরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯-এর চিকিৎসা পুরোটাই বিনা মূল্যে। খাবারও হাসপাতাল সরবরাহ করে। রান্নার মান নিয়ে প্রশ্ন তো থাকেই। তবে প্রথম দিনই কিন্তু আমার মনে হয়েছিল এখানকার জীবন নাটক-সিনেমায় দেখা কয়েদিদের জীবনের মতোই। তিন বেলা যথেষ্ট পরিমাণে খাবার দেওয়া হয়। সকালে পাউরুটি, জেলি, একটা কলা এবং দুটো সেদ্ধ ডিম। আর দুই বেলা ভাত, একটা সবজি, মাছ বা মুরগি, আর সন্দেহ হয় হয়তো ডালজাতীয় কিছু একটা থাকে। রাতের খাবার সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দেওয়া হয়। সন্ধ্যার খাবারের সঙ্গেই থাকে একটা আপেল, এক প্যাকেট এনার্জি বিস্কুট আর খানিকটা গুঁড়া দুধ।

কেউ একজন একটা ট্রলি নিয়ে রুমের বাইরে ‘প্লেট প্লেট’ করে চিৎকার করতে থাকেন। আমরা প্লেট রেখে দেওয়ার পর খাবার আসে এবং একই প্রক্রিয়ায় তা দেওয়া হয়। একই ভাবে রাতে ট্রলিতে করে ওষুধ আনা হয়। ছোট্ট একটা কাগজে রোগীর শয্যা নম্বর লেখা থাকে। শুরু থেকেই এটা বেশ নিয়ম মেনে করা হয়। পরে অবশ্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট-গ্লাসের ব্যবস্থা করা হয়।

ওয়ার্ডে থাকার দ্বিতীয় দিন রুম থেকে বের হয়ে দেখি, হাসপাতালেরই এক কর্মচারী একটা ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি গরম করে অনেককে দিচ্ছেন। তাঁর ভাইও আক্রান্ত ও ভর্তি। আমিও লাইনে দাঁড়াই। সেই পানি সারা দিন রেশনের মতো করে খেয়েছি।

আমার ওয়ার্ড জীবনের আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা না বললেই নয়। কথা ছিল ভর্তি হওয়ার পরপরই বুকের একটা এক্স-রে করা হবে। কেউ আসেননি, পরের দিনও না। সেই এক্স-রে করা সম্ভব হয় দুই দিন পর। তা-ও হঠাৎ করে বদলে যাওয়া নতুন এক পরিস্থিতিতে।

default-image

হঠাৎ পরিবর্তন
ওয়ার্ড জীবনের অবসান হয় হঠাৎ করেই। প্রথম থেকেই জ্বর পিছু ছাড়ছিল না। আধো ঘুম আধো জেগে কেটে যেত পুরো রাত। সেদিন ছিল ২২ এপ্রিল, বুধবার। উঠেই দেখি ঠিক দরজার সামনে মেঝেতে বয়স্ক এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছেন। হয়তো সারা রাত সেভাবেই ছিলেন। তার পরও আমার দিনটি শুরু হয়েছিল ভিন্নভাবে। হঠাৎ দেখি হাসপাতালের কেউ একজন একটা নতুন ইলেকট্রিক কেটলি এনে বসিয়ে দিয়ে গেলেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঠিয়েছে শুনে বেশ অবাকই হয়েছিলাম। অধ্যাপক ডা. রুবিনা ইয়াসমিন মুগদা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান। কিছুক্ষণ পর তিনি ফোন করে আরও অবাক করে দিয়ে বললেন, আমাকে কেবিনে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর কিছু পরই আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো এক্স-রে করাতে। ঝটপট সব হতে লাগল।

অপেক্ষা করছিলাম কেবিনে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তখন সবাই ব্যস্ত অন্য এক কারণে। কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত এক মহিলা মারা গেছেন। মুগদা হাসপাতালে করোনায় এটাই প্রথম মৃত্যু। চিকিৎসক বললেন, আমি যেন নিজেই লিফটের ১১-তে চলে যাই। সেখানে কেবিনের জন্য আমার কথা বলা আছে।

বের হয়ে দেখি যিনি মারা গেলেন, তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে। একটা বিশেষ ব্যাগে রাখা। কিছুক্ষণ পর একদল কর্মী এসে ভালোভাবে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে গেলেন। হাসপাতালে এসে প্রথম কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত কারও মৃত্যু দেখা।

কিন্তু আমি কেবিনে যেতে পারছিলাম না। হাসপাতালে তিনটি লিফটের দুটিই বন্ধ। বাকি লিফটে উঠে দেখি, এটা কেবল নিচে যায় আর অষ্টম তলায় এসে থামে। অসহায়ের মতো যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম, ঠিক তখন ফোন করলেন মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. গোলাম নবী। তিনি জানালেন, আগের রাত থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একাধিকবার ফোন করে আমার খবর নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আর তখনই বদলে যাওয়ার রহস্যেরও উদঘাটন হলো। লিফটম্যান কিছু না বলে চলে গেছেন বলেই এই বিপত্তি। তিনি হাসপাতালের এক কর্মীকে পাঠালেন। এক ট্রলিতে সব জিনিসপত্র নিয়ে লিফটে উঠতেই আরেক বিপত্তি। লিফট গেল আটকে। অনেক চেষ্টার পরে সামান্য একটু দরজা খুলতেই সঙ্গের লোকটি উধাও। আবার লিফটে আটকা। বাধ্য হয়ে আবার ফোন দিতে হলো। অবশেষে বের হয়ে আমার ঠাঁই হয় ১২১৪ নম্বর কেবিনে।

কেবিনে আমি
কেবিনে এসে সংলগ্ন বাথরুমটিই সবার আগে আমাকে স্বস্তি দিয়েছিল। শরীর যদিও মোটেই স্বস্তিদায়ক ছিল না। কোভিড-১৯ তার নিয়ম মেনে আমার স্বাদ ও রুচি সব নিয়ে নিয়েছে। রাতের ঘুম প্রায় উধাও, জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সঙ্গে সামান্য শ্বাসকষ্ট। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রাও কমে ৯৩ হলো, অথচ ভর্তির সময়ে ছিল ৯৭। রুমেই অক্সিজেন নিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে হাসপাতালের কেউ একজন অক্সিজেনের মাস্কসহ সব খুলে নিয়ে চলে গেলেন। অথচ এক মাস্ক আরেকজনকে ব্যবহার করতে দেওয়া বিপজ্জনক।

পরের দিন ২৪ এপ্রিল, শুক্রবার। শরীর আরও খারাপ, সীমাহীন দুর্বলতা, সঙ্গে অল্প শ্বাসকষ্ট ও কাশি। জ্বর তো ছিলই। নিশ্চয়ই শরীরে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে আমার বাকি সময়টা কেবিনে কাটিয়ে দিলে নতুন আরেক অভিজ্ঞতা হয়তো হতো না। এখন বরং সে সময়টার কথাই বলি।

দুঃসহ স্মৃতি
২৪ এপ্রিল, শুক্রবার আমাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে নেওয়া হলো। রক্তের বেশ কিছু পরীক্ষা করতে হবে। সেসব পরীক্ষার ব্যবস্থা হাসপাতালে নেই। হাসপাতাল রক্ত সংগ্রহ করে দেবে, আমার দায়িত্ব বাইরে থেকে টেস্ট করিয়ে আনা। ভরসার জায়গা তো অফিস। সে ব্যবস্থাও হলো।

আইসিইউ যেন ভিন্ন এক জগৎ। আমার সামনের শয্যার বয়স্ক মানুষটির জ্ঞান তেমন নেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরপর বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে ওঠেন। পাশের মেয়েটির বয়স কম, তবে কিডনির জটিলতা আছে। আমার ঠিক বাম পাশের শয্যার বয়স্ক মানুষটি একই অবস্থায় শুয়ে ছিলেন।

প্রায় এক বছর আগে আমার বড় বোন এই আইসিইউতেই জীবনের শেষ কয়টা দিন কাটিয়েছিলেন। বারে বারেই চোখ যাচ্ছিল কোনার সেই শয্যার দিকে। এও এক মানসিক চাপ। তত দিনে স্থানীয় সাংসদ ও মুগদা হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের প্রধান সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। বেলা তিনটার কিছু পর তিনি ফোন করে আমার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, পালস রেট আর প্রেশারের অবস্থা জানিয়ে বললেন, চিকিৎসকেরা বলেছেন যে আমি ভালো আছি। কিন্তু আমাকে তো তখন পর্যন্ত কেউ এসে দেখেননি, মনিটরের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়নি। এ কথা জানালে তিনি হয়তো আমার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর একজন চিকিৎসক এসে দেখে গেলেন। এরপর মনিটরের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হলো।

সন্ধ্যা পার হলে সাতটার দিকে একজন নারী কর্মী এসে অন্য রোগীদের দেখভাল করা শুরু করলেন। তিনি আসলে একজন ক্লিনার। নার্স বা অন্যরা কোথায়? প্রশ্ন করে জানলাম তারা ভেতরে তেমন আসেন না। আর তিনি যে ক্লিনার, এটা বলতেও মানা। স্বাভাবিক সময়েই আইসিইউ থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। আর এখন তো মহামারির সময়। তাই হয়তো আতঙ্কের মাত্রা বেশি।

তবে আমার আতঙ্কে বেড়েছিল আরেকটি তথ্য জেনে। ক্লিনার মহিলা এক ফাঁকে জানালেন যে আমার ঠিক পাশের শয্যার বয়স্ক মানুষটি মারা গেছেন আগের রাতেই। জানানো হলেও এখনো সেভাবেই আছেন। তবে ভ্যান্টিলেশন ছিল। দ্রুত শিশির মোড়লকে জানানোর কিছুক্ষণ পরেই সরিয়ে নেওয়া হয় তাঁকে।

আমার মনে হয়েছিল আইসিইউ থেকে বের হতে হবে। ডা. রুবিনা বললেন, রক্তের পরীক্ষার ফল পেলে তবেই সিদ্ধান্ত। ওই রাতের মধ্যেই রিপোর্ট পাওয়ার ব্যবস্থা আমার অফিসই করল। সহকর্মী আহমেদ জায়িফ রক্ত পরীক্ষার সেই ফল সংগ্রহ করে ছবি তুলে পাঠালেন রাত সাড়ে ৯টার দিকে।

আইসিইউতে আমার সেই রাতটা কেটেছিল বলতে গেলে প্রায় না ঘুমিয়েই। সামনের মানুষটি সারা রাত চিৎকার করেছেন। রাত তিনটার দিকে সামনের মেয়েটা বলল যে তাঁর অক্সিজেনের পানি শেষ হয়েছে সেই গভীর রাতে। কাউকেই আর খুঁজে পাইনি। সকালে উঠেই মনে হয়েছিল ওখান থেকে বের হতে হবে। আবার ফিরলাম কেবিনে।

করোনার ওষুধ
কোভিড-১৯-এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। এই ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। সুতরাং সংক্রমণের ধরন জানা এবং তা ঠেকানোই হচ্ছে মূল কাজ। ১৯ এপ্রিল পজিটিভ হওয়ার পরপরই আমার স্ত্রীর বড় ভাই (যাঁকে আমরা ভাইজান বলে ডাকি) ডা. আবু কায়সার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে ওষুধের একটা তালিকা তৈরি করে রাতেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

আমাকে দেওয়া হলো ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ব্যাকটেরিয়াপ্রতিরোধক ডক্সিসাইক্লিন। আরেকটি বিকল্প প্রটোকল হচ্ছে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন। এর সঙ্গে ছিল প্যারাসিটামল, অ্যান্টি হিস্টামিন, ভিটামিন সি ও জিংক ট্যাবলেট। এখন ভিটামিন ডি দেওয়া হচ্ছে। তবে হাসপাতালে যাওয়ার পর কার্যকর হচ্ছে না বলে এক দিন পরই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বাদ দেওয়া হয়। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন খেয়ে যাচ্ছেন।

কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে ওষুধের পাশাপাশি আরও জরুরি কিছু কাজ আছে। ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দেখা দেওয়া স্প্যানিশ ফ্লুকে এই অঞ্চলে ডাকা হতো যুদ্ধজ্বর। ভারতও রেহাই পায়নি সেই মহামারি থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও দেখেছেন মহামারির সেই রূপ। তিনি তখন শান্তিনিকেতনে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে তিনি নিজে তৈরি করেছিলেন একটি ভেষজ প্রতিষেধক, নাম দিয়েছিলেন ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’। তেউরি, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা ও থানকুনি বেটে একসঙ্গে সবটা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই পাঁচন। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় পড়লাম দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রকে ১৯১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘ছাত্র সৌভাগ্যক্রমে সকলেই ভাল আছে— তাদের সকলকেই রোজ পঞ্চতিক্ত পাঁচন খাওয়াই—আমার বিশ্বাস সেই জন্য তাদের মধ্যে একটি কেসও হয়নি, অথচ তারা অধিকাংশই সংক্রামকের কেন্দ্র থেকে এবং রোগগ্রস্ত পরিবার থেকে এসেচে।’

এখন আর সেই পঞ্চতিক্ত পাঁচন নেই। কিন্তু রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। খেতে হয় প্রচুর পানি ও ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল, প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার। অনেকে আদা ও লবঙ্গ মিশিয়ে গ্রিন টি খেতে বলেন। এগুলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। আর জরুরি হচ্ছে গরম পানির গড়গড়া ও ভাপ নেওয়া। মনে রাখতে হবে, কোনোভাবেই পানিশূন্যতা যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ঠান্ডা যেকোনো কিছুই নিষিদ্ধ। যাঁরা সুস্থ আছেন, কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হননি, তাঁরাও সাবধানতার জন্য এসব চালিয়ে যেতে পারেন। আর লক্ষণ দেখা দিলে তো বটেই।

আগেই বলেছি, ওষুধ সব হাসপাতাল থেকেই সরবরাহ করা হয়। তবে কোভিড-১৯-এর আক্রমণ হতে পারে অনেক দিক থেকে। তাতে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। আর এ কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে আরও কিছু ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন আমার হয়েছিল।

default-image

আমার চিকিৎসা
২৫ এপ্রিল, শনিবারে কেবিনে চলে এলাম ঠিকই, তবে জ্বর, কাশি ও দুর্বলতা বাড়ছিল। এ রকম একদিনে দুপুরে হঠাৎ হাজির আইইডিসিআরের স্বাস্থ্যকর্মীরা। আগের টেস্টের পর ৭ দিন পার হয়ে গেছে। তাই নিয়ম মেনে আবার টেস্ট করতে হবে। নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেলেন। দুপুরে এসে একজন স্বাস্থ্যকর্মী ইসিজি করলেন। সন্ধ্যায় রুমেই অক্সিজেন নিতে হলো। একজন কনিষ্ঠ চিকিৎসক এসে নেব্যুলাইজ করার কথা বললেও ডা. রুবিনা ব্যবহার না করতে বললেন।

আগেই বলেছি, আমার পরিবারে একাধিক চিকিৎসক আছেন। ডা. আবু কায়সার যোগাযোগ করলেন যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করছেন এমন একজন বাংলাদেশি চিকিৎসকের সঙ্গে। সেই চিকিৎসক ফোন করলেন ডা. রুবিনা ইয়াসমিনকে। ডা. রুবিনা আমাকে ফোন করে বললেন, তিনি স্টেরয়েড ব্যবহারের পরামর্শ পেয়েছেন। তবে এটা অবশ্যই পরীক্ষামূলক। এ জন্য আমার সম্মতি প্রয়োজন। তিনি নিজেও বিষয়টি নিয়ে তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরনের মতামতই আছে। আমি যেন চিন্তা করে জানাই।

সেই রাতে আমার জ্বর উঠল ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। পরের দিন ২৬ এপ্রিল, রোববার। আবার এক্স-রে করতে যেতে হলো হুইল চেয়ারে করে। সকালে প্রথমবার গিয়ে ফিরে আসতে হলো, কারণ লোক নেই। পরেরবারও বসে থাকতে হলো বেশ কিছুটা সময়। নতুন করে আবার রক্ত পরীক্ষাও করতে হলো।

এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ওই দিনই ডা. রুবিনা জানালেন তাঁরা স্টেরয়েড প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফুসফুসে সংক্রমণ ও রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ ছিল। আর স্টেরয়েডের সঙ্গে নিতে হবে নাভির চারপাশে সাতটি ইনজেকশন। এ ছাড়া ছিল অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন। কেবল স্টেরয়েড আমাকে কিনে এনে দিতে হবে। দেরি না করে ওই দিন বিকেল থেকেই নতুন ওষুধ প্রয়োগ শুরু হয়।

ফিরে আসা পর্ব
বলা চলে ২৭ এপ্রিল, সোমবার থেকেই নতুন জীবনের পথে যাত্রা শুরু। ওই দিনই প্রথম জ্বর ছাড়া দিন শুরু করেছিলাম। কাশি ছিল, তবে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছিল পেটের। স্যালাইন এর পথ্য। এরপর জ্বর আর আসেনি। পেটের সমস্যা অবশ্য ভুগিয়েছে আরও তিন দিন। নিয়ম করে দুই বেলা ইনজেকশন নিতে হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে, আর রাত ১০টার পরে।

কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত এক চিকিৎসকের জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ২৯ এপ্রিল বুধবার অধ্যাপক ডা. রুবিনা ইয়াসমিন বললেন, আমার চিকিৎসা নিয়েও মেডিকেল বোর্ডে কথা বলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড আমাকে দেওয়া নতুন ওষুধ প্রয়োগকে সমর্থন করেছে বলেও পরে জানিয়েছিলেন ডা. রুবিনা।

নিয়ম হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পরপর দুটি টেস্টের ফল নেগেটিভ এলে তবেই মনে করা হবে কোভিড-১৯ মুক্ত। সমস্যা হচ্ছে, ২৫ এপ্রিল আইইডিসিআর টেস্ট করলেও তখনো ফল পাওয়া যায়নি। তবে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর আমার তখন ১৫ দিন হয়ে গেছে। টানা ৩ দিন জ্বর নেই। চিকিৎসকেরা মনে করছেন দুটো পরীক্ষাতেই নেগেটিভ আসার কথা। এখন পরীক্ষা করে দেখবেন। নেগেটিভ এলে বাসায় চলে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে।

১ মে, শুক্রবার সকালে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে টেস্ট করে গেলেন। কিছু পরে আমার সহকর্মী লাজ্জাত এনাব মহসি ফোন করে জানান যে ২৫ তারিখের করা পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’। তথ্যটা ডা. রুবিনা ইয়াসমিনকে জানাতে বললেন, নতুন টেস্টের ফল সন্ধ্যায় পাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিকেলে ফোনে সম্পাদক মতি ভাইকে জানাতেই টেস্টের ফল পেয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ দেন। রাত ৯টার দিকে ডা. রুবিনা ইয়াসমিন জানান যে তাঁদের পরীক্ষায়ও ‘নেগেটিভ’ এসেছে। পরের দিনদুপুরে বাসায় ফিরতে পারব বলেও জানিয়ে দিয়েছিলেন। অফিসকে জানাতে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থাও করা হয়।

মনের জোর ও ভালোবাসার শক্তি
কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কথা না বললে পুরো লেখাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তা হচ্ছে মনের জোর আর ভালোবাসার শক্তি। কোনো ভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না, রাখতে হবে মনের জোর। আতঙ্ক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, আর মনের জোর রোগ ঠেকিয়ে রাখার কাজটি করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তো সংকটে ম্রিয়মাণ না হয়ে আপনা-মাঝে শক্তি ধরে নিজেরে জয় করতে বলেছেন সেই কবেই। তবে এটা ঠিক, রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে নিজে ‘পজিটিভ’ থাকা বা মনের জোর ধরে রাখাটা জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজের একটি।

রবীন্দ্রনাথের গানে আছে ‘একটুকু ছোঁয়া লাগে/ একটুকু কথা শুনি/ তাই দিয়ে মনে মনে/ রচি মম ফাল্গুনি’। অথচ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত মানেই আমাকে কেউ স্পর্শ করবে না, কেউ ছুঁয়ে দেখবে না, কেউ কাছে আসবে না, থাকতে হবে একদম একা, আর সামনে আছে জীবন অথবা মৃত্যু। তীব্র জ্বরে কেউ কপাল ছুঁয়েও দেখবে না। এ রকম এক পরিস্থিতিতে মনের জোর ধরে রাখাটা সহজ নয় মোটেই। মনে আছে, হাসপাতালে যাওয়ার আগে আমি ব্যাংকের চেক বই বের করে তাতে স্বাক্ষর করে রেখে যাব কি না, এ নিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভেবেছিলাম। তবে ক্ষণিকের সেই দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে মনে জোর এনে নিজেকেই বলেছিলাম, আমি তো ফিরে আসব।

আমার দুটো বৃহত্তর পরিবার আছে। আমার স্ত্রী, কন্যা-পুত্রসহ সব আত্মীয়স্বজন নিয়ে আমার এক বৃহত্তর পরিবার। অন্য বৃহত্তর পরিবার আমার কাজের জায়গা—প্রথম আলো। আমাকে একা থাকতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার সঙ্গে সব সময় ছিল আমার পরিবার, স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং আমার কাজের জায়গা প্রথম আলোর সহকর্মীরা। তাঁরা প্রতিনিয়ত আমাকে সাহস জুগিয়েছেন, চাঙা রেখেছেন, ভেঙে পড়া থেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছেন। একা একা থেকেও আমার মনে হয়েছে সবাই তো আমার সঙ্গে আছেন। আর এই বোধটাই আসলে মনের জোর সবচেয়ে বেশি বাড়ায়।

নিজের পরিবার থেকেই শুরু করি। বড় দুশ্চিন্তা ছিল বাসার অন্য সদস্যদের নিয়ে। অনেক চেষ্টার পরে ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার আইইডিসিআরের স্বাস্থ্যকর্মীরা এসেছিলেন পরীক্ষা করতে। পরে আমি যখন আইসিইউতে, ঠিক সেদিন রাতে জানতে পেরেছিলাম যে আমার বাসার কেউ আক্রান্ত হয়নি, সবাই ‘নেগেটিভ’। সেই প্রথম আমার মনে হয়েছিল মনের জোর আমি অনেকটাই ফিরে পেয়েছি। এখন আমাকে নিজের জন্য যুদ্ধ করতে হবে, তাদের কাছে ফিরে আসতে হবে।

যদি বলি আমার অফিস জাদু দেখিয়েছে, তাহলে মোটেই ভুল হবে না। মুগদা হাসপাতাল আমার বাসা থেকে যথেষ্ট দূরে। পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ ফল এলেও স্ত্রী ও পুত্র নানা শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। সংক্রমণের ভয়ে হাসপাতালের কেউ কাছে আসেন না। আবার আমাকে দেখাশোনা করার জন্য বাইরের কাউকে পাওয়া যাবে না। ডা. রুবিনা ইয়াসমিন একবার তো বলেই ফেললেন যে কোনো একজনকে দরকার পড়বে। আমি জোর গলায় বলেছিলাম, ‘কী লাগবে বলেন, এক ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবে।’ আমার এই ভরসার জায়গা ছিল আমার কাজের জায়গা, প্রথম আলো।

ওয়ার্ডে থাকার সময়ই মনে হয়েছিল টিকে থাকতে হলে নিজে থেকেই কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। গরম পানি ছাড়া কোভিড-১৯-এর সঙ্গে যুদ্ধ করা যায় না। হাসপাতালের খাবারও খাওয়া যাচ্ছিল না। তখনই মনে হয়েছিল প্রথম আলো সব সময়ই তার কর্মীদের সঙ্গে থাকে, সব ধরনের সহায়তা করে। ফোন দিয়েছিলাম প্রথম আলোর প্রশাসন বিভাগের প্রধান উৎপল চক্রবর্তীকে। ফোন পেয়েই জানালেন সব চলে আসবে। তবে সমস্যা আমার কাছে পৌঁছানোর। কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে সে ব্যবস্থাও করা হয়। ঠিক পরের দিন অফিস থেকে পাঠানো কার্টন খুলে দেখি, যা যা দরকার সবই পাঠানো হয়েছে।

উদাহরণ আরও আছে। হঠাৎ করে কাশি অনেক বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক একটা ওষুধের নাম লিখে দিলেন। তখন রাত ৯টা। অফিসকে জানাতেই সেই ওষুধ হাজির। স্টেরয়েড দেওয়ার কারণে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়। নিয়ন্ত্রণে সকালে নাশতার ২০ মিনিট আগে একটা ওষুধ খেতে হবে, সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে তা-ও হাজির। খাবারের সমস্যারও সমাধান হয়। আমার বোন, খালাতো ভাই, বন্ধু মাইনুল, অফিসের সহকর্মী শরিফুজ্জামান, উৎপল চক্রবর্তী—সবাই যেন প্রতিযোগিতা করে খাবার পাঠিয়েছেন। আমার সঙ্গে আমার অফিস আছে, এই ভাবনাই তো মনের জোর বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকটাই।

সম্পাদক মতি ভাই আমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করার নির্দেশ তো দিয়েছেনই, এমনকি কথা বলেছেন আমার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে। একদিন বাসায় কার্টনভর্তি ফলসহ নানা খাবার পাঠালেন। আমাকেও ফোন করে বলতেন, আমার খারাপ কিছু হবে না, সুস্থ হয়ে যাব দ্রুত, কখনোই মনে হয়নি আমার খারাপ কিছু হবে। তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বাসের কথা তিনি বারবার বলতেন, আমাকে চাঙা রাখতেন। আর এভাবেই ভালো হয়ে যাব, আমার নিজের মধ্যে এই বিশ্বাসটুকু ছড়িয়ে দিতেন প্রতিবারই।

এবার বৃহত্তর প্রথম আলো পরিবারের অন্যদের কথাও বলতে হয়। ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ওষুধ কোম্পানি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল যাচ্ছি, মতি ভাইয়ের কাছ থেকে এই খবর পেয়ে ২০ এপ্রিলই ফোন করেন এসকেএফের পরিচালক (মার্কেটিং ও সেলস) ডা. মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম ও আরেক কর্মকর্তা ডা. মুরাদ। তাঁরা দ্রুততার সঙ্গে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাকে ফোন নম্বর দেন। হাসপাতালের তিনিই মূল চিকিৎসক। এরপর থেকে ডা. রুবিনা ইয়াসমিন সার্বক্ষণিক লেগে ছিলেন এই রোগীর সঙ্গে।

স্থানীয় সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী খবর পেয়ে নিজে থেকেই ফোন করেছিলেন ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনেই। তিনিও প্রতিদিন খবর নিয়েছেন। আমি থাকতেই মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. গোলাম নবী বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হয়েছেন। তিনি সব সময় খোঁজখবর নিয়েছেন, এসে দেখেও গেছেন। আমি অর্থনীতির সাংবাদিকতা করি। পেশাগত কারণে পরিচয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের সঙ্গে। নিজ থেকে তিনি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার ফোন করেছেন। সব মিলিয়ে আমি ছিলাম মুগদা হাসপাতালের ভালো চিকিৎসা সেবা পাওয়া একজন ভাগ্যবান রোগী।

বাড়ি ফেরা
দিনটি ছিল শনিবার, ২ মে। আমার বাড়ি ফেরার দিন। সকালে শেষ ইনজেকশনটা দিয়ে দুপর ১২টা পরে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। ছবি তোলেন ফটো সাংবাদিকেরা। সাংবাদিক হয়েও আমি নিজেই তখন খবরের অংশ। সুস্থ হওয়া নিয়ে কথা বলতে হয়। সবাইকে বিদায় জানিয়ে যখন গাড়িতে উঠেছিলাম তখন দুপুর।

সম্পাদক মতি ভাই বারবার বলে দিয়েছেন বাসায় এসেই যেন সবাইকে ধরে কান্নাকাটি না করি। অবশ্য সে উপায়ও নেই। হাসপাতাল থেকে ১৪ দিন আলাদা বা আইসোলেশনে থাকার জন্য একটি নির্দেশনা বা গাইডলাইন তৈরি করে দিয়েছে। যেমন পর্যাপ্ত আলো-বাতাসসম্পন্ন ও জীবাণুমুক্ত আলাদা কক্ষে থাকা; শিশু, বৃদ্ধ ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধের ক্ষসতাসম্পন্নদের কাছ থেকে দূরে থাকা; রোগী ও বাড়ির সব সদস্যের মাস্ক ব্যবহার ও সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া; হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা; ধূমপান থেকে বিরত থাকা; স্বাভাবিক পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। যাঁরা সুস্থ হয়েছেন সবারই এটা মেনে চলা প্রয়োজন।

সেই থেকে আমি আলাদা রুমে থেকেছি ১৪ দিন। মাঝেমধ্যে দরজা খুলে দূর থেকে সবাইকে দেখতাম, কথা বলতাম। আমার হাসপাতালে থাকার সময়ে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনতাম। সেও আরেক গল্প। ওদের কেউ হয়তো কখনো লেখবে।

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এলেও যোগাযোগ রেখেছি অধ্যাপক ডা. গোলাম নবীর সঙ্গে। আমার স্ত্রীর বড় বোন আক্রান্ত হলে অধ্যাপক ডা. রুবিনা ইয়াসমিন তাঁকেও নিয়মিত চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দিয়েছেন। অধ্যক্ষ ডা. গোলাম নবী বারবার বলতেন, আমি ভর্তি থাকতে যে সমস্যাগুলো দেখে এসেছি, তা অনেকটাই তাঁরা দূর করেছেন। এখন আরও ভালোভাবে সবকিছু সমন্বয় করা হচ্ছে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে অধ্যাপক গোলাম নবীসহ মুগদা হাসপাতালের চারজনকে বদলি করা হয়, যা নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা।

এবং প্লাজমা দান
বাসায় ফেরার পর সিআইডির এক পুলিশ কর্মকর্তার ফোন পেয়ে অবাকই হয়েছিলাম। তিনি ফোন করেছিলেন ৪ মে। আর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠাতে শুরু করেন পরের দিন থেকে। সব বার্তাই প্লাজমা থেরাপি নিয়ে, যার মাধ্যমে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীরা সুস্থ হতে পারেন। প্লাজমা দেওয়া নিয়ে নিজের মধ্যে দ্বিধা ছিল। তবে চিন্তা করার যথেষ্ট সময় ছিল আমার হাতে। কারণ, সুস্থ হওয়ার ১৪ দিন পার হলে তবেই প্লাজমা দেওয়া যায়। তাতে অবশ্য প্লাজমা থেরাপি নিয়ে নানা সংবাদ ও গবেষণা পাঠানো বন্ধ করেননি এস এম রফিকুল ইসলাম নামের ওই পুলিশ কর্মকর্তা। প্লাজমা থেরাপি নিয়ে কাজ করেন একজন চিকিৎসকের ফোন নম্বরও দেন তিনি।

ঘরবন্দী জীবন শেষে স্বাধীনতা উপভোগ করতেই কেটে যায় কিছুটা সময়। এর মধ্যে প্লাজমা দেওয়া নিতে কথা বলতে সেই চিকিৎসককে ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ কথা জানালে ২২ মে পুলিশ কর্মকর্তাটি শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে কর্মরত চিকিৎসক আশরাফুলের ফোন নম্বর দেন। ঈদের ঠিক আগের দিন, ২৪ মে নিজে থেকেই ফোন করি আমি। তারপর গিয়ে প্লাজমা দিয়ে আসি।
এখন আমি অন্তত জানি নতুন জীবন পাওয়ার, সবার মধ্যে ফিরে আসার অর্থ। আর আমার দেওয়া প্লাজমায় অন্তত দুজন যদি আবার নতুন জীবন ফিরে পান, সেটাই হবে আমার নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
বিশ্বজুড়ে মহামারির একদিন অবসান হবে। তবে এর ছাপ থেকে যাবে। অনেক কিছুই বদলে যাবে, অনেক কিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে। দেশ, অর্থনীতি, সম্পর্ক, জীবনযাত্রা—অনেক কিছুই আগের মতো থাকবে না। কিন্তু যেকোনো পরিস্থিতিতেই নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে সবার ভালোবাসায় নতুন করে ফিরে আসার যে আকাঙ্ক্ষা, তা চিরন্তন। এটা বদলাবে না কখনোই।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন