default-image

তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, প্রিয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে বলতে গিয়ে কখনো তিনি বুকভরে গর্বের শ্বাস নিচ্ছিলেন। কখনো আবার অকালে হারিয়ে যাওয়া কোনো শিক্ষার্থীর কথা বলতে গিয়ে মুছছিলেন চোখ। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের বাসায় বসে এক ফাঁকে এ–ও বললেন, ‘আমার কিন্তু হাজারো সন্তান। নিজের সন্তান তিনটা বটে। কিন্তু ৩৬ বছর ধরে যাদের পড়িয়েছি, তারাও তো আমার সন্তানসম।’

মানুষ গড়ার এই কারিগরের নাম সফিক উল্ল্যা, শিক্ষার্থীদের কাছে ‘সফিক স্যার’ নামেই যিনি পরিচিত। তাঁর বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের জাউডুগি গ্রামে। গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল না বলে তাঁকে পড়তে যেতে হতো প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের হাজিল ব্যাপারীর হাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর আরও বিপত্তি। তখন যে আশপাশের কয়েক গ্রামেও উচ্চবিদ্যালয় ছিল না। তাই তাঁকে যেতে হয় ৯ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্মীপুর সদরের দীঘলী উচ্চবিদ্যালয়ে। তবে সেখানে বেশি দিন থাকা হয়নি তাঁর। পরে চলে যান হাজীর হাট মিল্লাত মাল্টিল্যাটারল উচ্চবিদ্যালয়ে, তারও পর কুমিল্লা উচ্চবিদ্যালয়ে। এসএসসির পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হন কুমিল্লা কলেজে। সেখান থেকে আইএসসি (বর্তমান এইচএসসি) পাস করে চলে আসেন চট্টগ্রামের স্যার আশুতোষ কলেজে। ঐতিহ্যবাহী এ কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন তিনি।

কৈশোরে আশপাশে স্কুল না থাকার অভাব তাঁকে পোড়াত সব সময়। তাই পড়াশোনা শেষ করেই ১৯৭৬ সালে ফিরে যান গ্রামে। মায়ের দেওয়া জায়গায় এক মামাতো ভাইকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি বিদ্যালয়, যেন আশপাশের শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়াশোনা করতে পারে। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের প্রথম চাকরিতে যোগ দেন কক্সবাজারে। কিন্তু তাঁর বাবার কথায় সেই চাকরি ছেড়ে ১৯৭৯ সালে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আগ্রাবাদ সরকারি কলোনি উচ্চবিদ্যালয়ে। ২০১৫ সালের ২ মে এই বিদ্যালয় থেকেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসরে যান তিনি।

শিক্ষার্থীদের গণিত পড়াতেন সফিক উল্ল্যা। শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের আলাদা করে পড়াতেন প্রায় প্রতিদিন। যারা বিষয়টিতে দুর্বল ছিল, তাদের নিতেন বাড়তি যত্ন-আত্তি। এ জন্য কখনো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সম্মানী দাবি করেননি তিনি। সামর্থ্যবান শিক্ষার্থীরা যা সম্মানী দিত, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন।

প্রায় এক যুগ আগের কথা। একদিন পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন সময় সফিক উল্ল্যার এক প্রাক্তন ছাত্র ঢুকলেন সেখানে। কথা হলো অনেক। যাওয়ার সময় সফিক উল্ল্যার হাতে একটি খাম দিয়ে বললেন, ‘স্যার এটি রাখুন। দয়া করে আমি চলে গেলে খুলবেন।’ শিক্ষার্থীর কথা রাখতে হলো তাঁকে। পরে খুলে দেখেন, তিন হাজার টাকা এবং একটি নাতিদীর্ঘ চিঠি। সেই চিঠিতে শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘স্যার, আপনি আমাকে বাড়তি সময়ে পড়াতেন। কিন্তু কখনো আপনার সম্মানী দিতে পারিনি। এখন একটি চাকরি করি। তাই কিছু সম্মানী আপনার হাতে তুলে দিতে এলাম।’

অবসরজীবন মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল সফিক উল্ল্যার। নিজেকে বলতেন, কেন এত তাড়াতাড়ি সময়টা ফুরিয়ে গেল! তবে সেই দুঃখ ভুলে যান শিক্ষার্থীদের ফোনে। প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা তাঁকে ফোন করে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘স্যার, কেমন আছেন?’ আনন্দে বুক ভরে ওঠে। তাই তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে ভোলেনি। এটাই তো একজীবনের পাওয়া।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন