তারুণ্যের বাজেট ভাবনা

বিজ্ঞাপন
default-image
সম্প্রতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর ২৪ জুন প্রথম আলো কার্যালয়ে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে। সঙ্গে ছিলেন উদ্যোক্তা, সফল পেশাজীবী, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা। তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দেশের বাজেট প্রসঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা হয়েছে। তরুণেরা উপস্থাপন করেছেন তাঁদের বাজেট ভাবনা আর বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন সম্ভাবনা ও উদ্বেগের দিকগুলো। আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো সংক্ষেপে আজ তুলে ধরা হলো।

গবেষণা

গবেষণা খাতে যদি আরও বেশি টাকা খরচ করা যেত, তা দেশের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারত বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল পান না। গবেষণা সহযোগী হিসেবে যেসব শিক্ষার্থী কাজ করেন, তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো সুযোগ শিক্ষকদের থাকে না। ফলে পড়ালেখার পাশাপাশি আয়ের জন্য টিউশনি বা অন্যান্য কাজের দিকে ঝুঁকলেও গবেষণায় আগ্রহী হন না শিক্ষার্থীরা। যন্ত্রপাতি কেনার পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক গবেষণা করতে পারে না। শিক্ষা খাতে বাজেটের যেই অংশ বরাদ্দ থাকে, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে বিভাগ অনুযায়ী ভাগ হওয়ার পর তার পরিমাণ হয় একেবারেই অপর্যাপ্ত। আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪.২ শতাংশ তারা গবেষণা খাতে ব্যবহার করে। তরুণেরা মনে করেন, যে দেশ গবেষণার জন্য যত বেশি বিনিয়োগ করবে, সামনের দিনগুলোতে তারা হবে তত উন্নত।

শিক্ষা

শিক্ষা খাতে সংখ্যার দিক দিয়ে আমরা যতটা এগিয়েছি, মানের দিকে ততটা অগ্রসর হয়েছি কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তরুণেরা। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে। এমডিজিতে বলা হয়েছিল, ছেলেমেয়েদের স্কুলের আওতায় আনতে হবে, ঝরে পড়ার হার রোধ করতে হবে। সংখ্যার বিচারে এসব দিক দিয়ে সফলতা পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমানে বলা হচ্ছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) কথা, যেখানে সংখ্যার পাশাপাশি মানও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসডিজি অর্জন করতে হলে শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে বাজেটে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন আলোচকেরা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত ও জীবনমুখী নয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষা ছেলেমেয়েরা কর্মজীবনে প্রয়োগ করতে পারে না। তাই তরুণেরা মনে করেন, সংখ্যা নয়, মান উন্নয়নের ব্যাপারে আমাদের শোরগোল তোলা উচিত। কারিগরি ও পলিটেকনিক্যাল স্কুলগুলোর উন্নয়নের দিকে আরও নজর দেওয়া উচিত।

উদ্যোগ ও উদ্ভাবন

উদ্যোগ ও উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিতে সরকারের আগ্রহকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞরা। তবে তরুণেরা মনে করেন, বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হলে উদ্ভাবনকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং এই খাতে নির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ দিয়ে আরও উদারভাবে খরচ করা উচিত। সরকার যেহেতু উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিতে চেষ্টা করছে, তাই ই-কমার্সের ওপর ভ্যাটের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত আলোচকেরা। বরং উদ্যোক্তাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নতি হবে। এখন অনেক তরুণ পড়ালেখার পাশাপাশি ফেসবুকের মাধ্যমে আয় করছেন, রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমেও আয় করছেন অনেকে। অনলাইন মাধ্যম বা অ্যাপ ব্যবহারের একটা চর্চা গড়ে উঠছে। এই চর্চাকে আরও বিকশিত হতে সময় ও সুযোগ দেওয়া উচিত বলে অনেকে মন্তব্য করেন। উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকা যথেষ্ট কি না, সে প্রসঙ্গেও আলোচনা হয় এই গোলটেবিল বৈঠকে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব

বাজেটে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটিকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন তরুণেরা। বাংলাদেশের শিল্প খাত এখনো অনেকটাই শ্রমিকনির্ভর। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কথা ভেবে আমরা যদি এখন থেকেই দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারি এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না এগোই, তবে ভবিষ্যতে একটা বড়সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে যাবে। উপস্থিত আলোচকেরা বলেন, উন্নত প্রযুক্তির জন্য আমাদের অন্য দেশের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, বরং এই প্রযুক্তিগুলোর মালিক হতে হবে। নিজেদের জন্য নিজেরাই প্রযুক্তি ও সেই প্রযুক্তি পরিচালনার মতো দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারলে আমরা উপকৃত হব।

কর্মসংস্থান

বাজেটে আগামী পাঁচ বছরে দেড় কোটি মানুষকে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অনেকখানি অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা। বর্তমানে দেশে কতজন বেকার আছেন, বাজেটে তার উল্লেখ নেই। সে ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর বেকারের সংখ্যা কতখানি কমল, কতজন লোকের কর্মসংস্থান হলো, সেই হিসাব আমরা কীভাবে করব? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগের চেয়েও অনেক বেশি স্নাতক বেরোচ্ছেন, সেই তুলনায় কাজের সুযোগ বাড়েনি। তাই কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রত্যাশা করছেন তরুণেরা।

দক্ষতা উন্নয়ন

আলোচনায় ঘুরেফিরে বারবার এসেছে প্রশিক্ষণের কথা, দক্ষতা উন্নয়নের কথা। তবে চাকরিদাতারা মনে করেন, প্রশিক্ষণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার মানোন্নয়ন। কারণ, ১০-১২ বছর পড়ালেখা করে যদি শিক্ষার্থীরা পেশাজীবনের জন্য যথার্থভাবে প্রস্তুত না হন, তাহলে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের যোগ্য করে তোলা কঠিন। ভারতের বেঙ্গালুরুতে একটা বড় অংশের তরুণ আয় করেন কল সেন্টারে চাকরি করে। সেই বাজার আমরা ধরতে পারছি না, আমাদের তরুণদের যোগাযোগের দক্ষতায় ঘাটতি আছে বলে। সরকার বাজেটে প্রশিক্ষণের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে ঠিকই। তবে এই খাতে আরও বেশি নজর দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত আলোচকেরা।

গ্রন্থনা: মো. সাইফুল্লাহ

আলোচনায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন

মালিহা কাদির

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ ডট কম

এ কে এম ফাহিম মাসরুর

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, আজকের ডিল

জিয়া আশরাফ

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চালডাল

আশিকুল ইসলাম

সদস্য, ই-কমার্স বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, বেসিস

প্রীতি ওয়ারেসা

পরিচালক, চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব

শওকত হোসেন

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিডিভেঞ্চার

কাজী মাহবুব মুর্শেদ

ডিরেক্টর মার্কেটিং, ইউনিকম বাংলাদেশ

কাজী হাসান রবিন

প্রধান, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি

ইবরাহিম মুদ্দাসসের

শিক্ষা গবেষক

জুবেলী খানম

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তাবাসসুম ইসলাম

শিক্ষার্থী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

মাহামুদুল হাসান

উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থী, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

রিদওয়ানুল আরেফিন

বিতার্কিক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

সঞ্চালক: মুনির হাসান

প্রধান, যুব কার্যক্রম, প্রথম আলো

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন