>দেশে এমবিবিএস সম্পন্ন করে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন তাসনিম জারা। করোনাকালে সম্মুখসারির যোদ্ধা তিনি। হাসপাতালে কাজের অভিজ্ঞতা আর স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা মেনে সহজ, প্রাঞ্জল বাংলায় করোনাবিষয়ক ভিডিও বার্তা প্রচার করেন তাসনিম, তাঁর ভিডিও দেখেছে লাখো মানুষ।
default-image

দেশে তখন কোভিড-১৯ ঘিরে ভুল তথ্য আর গুজব ছড়িয়ে পড়ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ঘুরছিল সেসব। ঘরবন্দী কেউ কেউ মানসিক অবসাদের কথাও লিখছিল ফেসবুকে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) জুনিয়র চিকিৎসক তাসনিম জারা ভাবলেন, এসব নিয়ে তাঁর কিছু করা উচিত। তাই এগিয়ে এলেন সচেতনতার বার্তা নিয়ে।

তাসনিম স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও বানিয়ে দিলেন নিজের ফেসবুক পেজে। দিন দিন তাসনিমের ঝরঝরে বাংলা ভাষার ভিডিও জনপ্রিয় হয়ে উঠল। করোনাকালে মৌলিক তথ্যসহ মানসিক স্বাস্থ্যের নানা বিষয়ে তিনি কথা বলে চলেছেন। করোনাকালীন সময়ে যেন নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস বাংলাদেশি এই তরুণ চিকিৎসক। তাই তো তাঁর ভিডিও প্রচার হয়েছে রবি টেন মিনিটস স্কুলেও। ‘করোনার যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন’ নামে যে ভিডিওটি তিনি ৬ জুন দিয়েছিলেন, সেটা দেখেছে ৩৮ লাখের বেশি ফেসবুক ব্যবহারকারী।

তাসনিম জারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। স্নাতকোত্তরে তাঁর পড়ার বিষয় ‘এভিডেন্স বেজড মেডিসিন’। তাসনিম জারা বলছিলেন, এই বিষয়টির অন্যতম লক্ষ্য, একজন চিকিৎসক যেন রোগীকে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে চিকিৎসা পরামর্শ দেন এবং অতিরিক্ত ওষুধ প্রদান না করেন। শেখানো হয় অসংখ্য গবেষণার মধ্যে সেরা গবেষণাটি চিহ্নিত করার পদ্ধতি।

সম্মুখসারিতে তাসনিম

করোনা মহামারির শুরু থেকেই ইংল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তাসনিম জারা। চিকিৎসক হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা হচ্ছে তাঁর। অন্য সময়ের চেয়ে কাজের ক্ষেত্রে বেশি মানসিক চাপও নিতে হচ্ছে।

তাসনিম বলেন, ‘মুমূর্ষ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে আমার। রোগীর আত্নীয়স্বজনেরা থাকতেন বলে তখন এতটা আবেগপ্রবণ হতে হয়নি। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত রোগীর আপনজনের ভূমিকায় এখন চিকিৎসককেই থাকতে হচ্ছে।’

করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগীর মৃত্যু দেখতে হয়েছে তাঁকে। সহকর্মীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরও পাচ্ছেন। নিজেরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আছে। তাসনিম জারা বলেন, ‘এখন তো কমবেশি করোনা–আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবারই রয়েছে। যখন দায়িত্ব পালন করি, তখন আসলে এই চিন্তাগুলো খুব বেশি কাজ করে না। তারপরও যথাসম্ভব নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে দায়িত্বপালনের চেষ্টা করছি।’

ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে বড় প্রাপ্তি স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা। তাসনিম বলেন, ‘প্রতিদিনই আমরা এখানকার মানুষদের কাছ থেকে শুভেচ্ছা কার্ডসহ বিভিন্ন উপহার পাই। পথেও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে তাঁরা নানা রকম ধন্যবাদজ্ঞাপক বার্তা লাগিয়ে রেখেছেন। এই সময় মানুষের সেবা করার সুযোগ না পেলে হয়তো বুঝতামই না, ইংল্যান্ডের মানুষ এনএইচএসকে কতটা ভালোবাসে।’

বিষয় নির্বাচনেও গবেষণা

দায়িত্ব পালন শেষে ঘরে ফিরেই পড়াশোনার ব্যস্ততা সামলে ভিডিও তৈরি করেন তাসনিম। ভিডিওর বিষয় বাছাইয়ে তাঁকে সাহায্য করেন ছোট বোন এশায়া বিনতে হাসান এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের তাসনিমের দুই অনুজ ইমা ইসলাম ও সায়মুল রেজা। ভিডিও চিত্রধারণ, ভিডিও সম্পাদনার কাজ করেন তাসনিমের স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ।

প্রতিটি ভিডিওর জন্য তথ্য যাচাইবাছাই ও গবেষণার করতে হয় তাসনিম জারাকে। তাই বলছিলেন, ‘বিজ্ঞান মানেই তো প্রমাণ আর যুক্তি। প্রতিটি ভিডিওতে যেসব তথ্য উপস্থাপন করি, সব কটিরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখা রয়েছে।’

তাঁর এসব ব্যাখা, বিশ্লেষণ ও প্রমাণের যথাযথ সূত্র ভিডিওতে জুড়ে দেন তাসনিম জারা। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সহজ, প্রাঞ্জল বাংলায় কথা বলেন বলেই মানুষও সাদরে শুনছে তাঁর কথা।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন