দশে মিলে বাঁধ মেরামত

বিজ্ঞাপন
গত মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারে ভেঙে গিয়েছিল বেড়িবাঁধ। সে বাঁধ মেরামতের কাজেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তরুণ দল। তাঁদের পাশে দাঁড়ান এলাকার প্রবীণেরাও। স্বেচ্ছাশ্রমে রাতদিন খেটে অস্থায়ীভাবে মেরামত করেন বাঁধগুলো। খুলনার কয়রা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় দশে মিলে বাঁধ মেরামতের কথা থাকছে এখানে।
default-image

২০ মে, বুধবার। ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটা রাত আটটা ছুঁই ছুঁই। কপোতাক্ষ নদে তখন জোয়ার উঠেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে বেড়েছে বাতাসের গতি। খুলনার কয়রা উপজেলার হরিণখোলা গ্রামের কয়েকজন যুবক তখনো মাটি ভরা বস্তা দিয়ে কপোতাক্ষের বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করে চলেছেন। ঝড়ের আভাস পেয়ে দিনের বেলায় যে পরিত্যক্ত বস্তা সংগ্রহ করেছিল তরুণদের দলটি, সে বস্তায় মাটি ভর্তি করে আম্পানের প্রাথমিক ধাক্কা প্রায় সামলানো গিয়েছিল। কিন্তু রাত নয়টা নাগাদ সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হলো। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানির উচ্চতা বেড়ে গেল কয়েক ফুট। ভেঙে পড়ল কয়রা বাঁধ। শুধু এই একটি বাঁধ নয়, উপজেলা সদরের ৪টি ইউনিয়নের ২৫টি স্থানের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হলো ৪৭টি গ্রাম। ধসে পড়ল কাঁচা ঘরবাড়ি, ভেসে গেল মাছের ঘের।

এক হলো সবাই

চোখের সামনে নোনাপানি বাড়তে থাকল। এদিকে ঘূর্ণিঝড়ে সব লন্ডভন্ড। সবাই অপেক্ষা করছিল ভোরের। যে করেই হোক, থামাতে হবে পানির প্রবাহ। সকাল হতেই কয়রার বিভিন্ন এলাকার তরুণেরা নিজ নিজ এলাকায় এককাট্টা হলেন। মসজিদের মাইকে ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে বেড়িবাঁধে আসার আহ্বান জানালেন তাঁরা। নিজেদের রক্ষার তাগিদে ভাঙা বাঁধের কাছে একের পর এক কোদাল হাতে জড়ো হতে শুরু করলেন হাজার হাজার মানুষ, যাঁদের অনেকের পরিবার তখনো হয়তো আশ্রয়কেন্দ্রে। নদীতে ভাটার টান পড়তেই হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু হলো কাজ। দুপুরে নদীতে জোয়ার আসার আগপর্যন্ত একটানা চলল মাটি কেটে বাঁধ উঁচু করার চেষ্টা।

আম্পানের ভয়াবহতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন। স্বাধীন সমাজকল্যাণ সংস্থা নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইউনিয়নটির জোড়সিং, খাশিটানা, আংটিহারা স্লুইসগেট, গোলখালী, ছোট আংটিহারা বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্পন্ন হয়েছে। স্বেচ্ছায় কাজ করেছেন কয়েক হাজার মানুষ। পুরুষের পাশাপাশি হাঁটুসমান কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে নারীরাও বাঁধ মেরামতে কাজ করেছেন।

স্বাধীন সমাজকল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আবু সাঈদ খান বললেন, ‘প্রথমে আমরা এলাকার যুবক ও তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নিই। এরপর কাজে নামেন প্রবীণেরাও।’

সংগঠনটির সদস্য মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের মতো কয়রা উপজেলার যেখানে বাঁধ ভেঙেছে, সেখানেই তরুণেরা নেতৃত্ব দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে তা মেরামত করেছে।’

হাঁটুপানিতে ঈদের জামাত

২৫ মে ছিল ঈদুল ফিতর। কিন্তু কয়রাবাসীর মনে নোনাজলের দুঃখ। ভেঙে গেছে নদীর বাঁধ। তলিয়ে গেছে এলাকা। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এই পানির মধ্যেই দাঁড়িয়ে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন খুলনার কয়রা উপজেলার ২ নম্বর কয়রা গ্রামের লোকজন। নামাজ আদায়ের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দুর্দশার কথা জানতে পারে সারা দেশের মানুষ।

২৬ মে কয়রা সদরের ২ নম্বর কয়রা স্লুইসগেট-সংলগ্ন বাঁধের কাজ মোটামুটি শেষ হয়। ছয় দিনের চেষ্টায় রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হন এলাকাবাসী। তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন স্বেচ্ছাসেবীরা। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, উপজেলার ২৫টি স্থানের ভেঙে যাওয়া বাঁধের ২০টি স্থান অস্থায়ীভাবে মেরামত করে ফেলেছেন ওই সব এলাকার তরুণেরা।

ভাঙা-গড়ার কষ্ট

বাঁধ মেরামত করেও নিশ্চিন্ত হতে পারেননি কয়রার অনেক এলাকার মানুষ। প্রবল জোয়ারে প্রায়ই ভেঙে যাচ্ছে বাঁধের কোনো কোনো অংশ। এই যেমন গত ৩০ মে ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কয়রা সদর ইউনিয়নের প্রায় সাত হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে ঘাটাখালী গ্রামের কপোতাক্ষ নদের প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ শেষ করেন। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ শেষে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই প্রবল জোয়ারে সেটি ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। একই ঘটনা মহারাজপুর ইউনিয়নের দশহালিয়া গ্রামের বাঁধেও। এই দুই এলাকার মানুষও স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাঁধ পুনর্নির্মাণ করে বাড়ি ফিরতে না ফিরতে দুটি বাঁধই ভেঙে বাড়িঘরে পানি ঢুকে যায়।

ঘাটাখালী গ্রামের তৈয়েব আলী বলেন, ‘এলাকার মধ্যে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গ্রামের সাত-আট হাজার মানুষ গিয়ে ছয় ঘণ্টা কাজ করে বাঁধ দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তিন জায়গায় ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। কতবার ভাঙবে আর আমরা কতবার ঠিক করব, তা বুঝতে পারছি না।’

তবু নিজেদের রক্ষার প্রয়োজনে সবাই একজোট তাঁরা। যখনই ভেঙে যাচ্ছে, ছুটে যাচ্ছেন মেরামত করতে। অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে আটকে দিচ্ছেন জোয়ারের পানি।

default-image

বাঁধগুলো শক্ত হোক

প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম উপকূলবাসীর। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামত করলেও ভাঙার শঙ্কায় কাটে তাঁদের দিন। হরিণখোলা এলাকায় বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন ওই এলাকার তরুণ হাসানুল বান্না। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে এখনো বাঁধ রক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বাঁধ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে কত দিন পারা যায়?’

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কেটে গেছে দুই সপ্তাহের বেশি সময়। বাঁধ ভেঙে এলাকার সঙ্গে একাকার নদীর পানি। বাধ্য হয়ে এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজ করে চলেছেন কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো খোঁজ নেই। দেখতেও আসে না, আমাদের কাজে সাহায্য পর্যন্ত করে না। বাঁধগুলো দ্রুত সংস্কার চাই আমরা।’

বাঁধ সংস্কারের আশ্বাস মিলল কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিমুল কুমার সাহার কথায়। তিনি জানান, এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য এসেছেন। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের হিসাব-নিকাশ করছেন। এরপরই মেরামতের কাজ শুরু হবে।

ঝড়ের মধ্যে রাত জেগে গ্রাম পাহারা
শেখ আল-এহসান, খুলনা

বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি, বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে সবাই চান নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু গ্রামের মানুষকে নিরাপদ রাখতে নির্ঘুম রাত কাটে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়নের কুমখালী গ্রামের একদল যুবকের। ঝড়ের কারণে গ্রামের কেউ সমস্যায় পড়লেই ছুটে যান তাঁরা। নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রামের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকটিও খেয়াল রাখতে হয় তাঁদের। কুমখালী গ্রামটি প্রমত্তা শিবসা নদীর পাড়ে অবস্থিত। যেকোনো ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঁচ লাগে ওই গ্রামে। কিন্তু ওই গ্রামে কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই। এ কারণে এলাকার মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টাতেই যুবকদের ওই উদ্যোগ।
কোনো দল বা সংগঠনের ব্যানারে নয়, নিজেদের তাগিদেই এসব করে থাকেন তাঁরা। ২০ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আম্পানের রাতও নির্ঘুম কেটেছে ওই যুবকদের। ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ছুটে বেড়িয়েছেন গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ঝড়ের মধ্যেও ভেঙে পড়তে থাকা কয়েকটি ঘর সবাই মিলে ধরাধরি করে তুলে দিয়েছেন।
আম্পান যখন ওই এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন রাত ১২টার দিকে বাতাসের তোড়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় ওই গ্রামের উত্তরপাড়ার নিরাপদ মণ্ডলের ঘর। নিরাপদ মণ্ডল বলেন, ওই যুবকেরা না থাকলে ঘরটি হয়তো রক্ষা করা সম্ভব হতো না। দলের সদস্য ১০ থেকে ১৫ জন। দলেরই একজন শান্ত কুমার মণ্ডল। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। শান্ত বলেন, ‘এলাকায় কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় মানুষ ঝড়ের সময় বাড়িতেই থাকে। ঝড়ে অনেকের গরু-ছাগলের সমস্যা হয়, ঘর ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে খবর পেলেই সবাই মিলে সেখানে ছুটে গিয়ে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করি।’
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন