আসছে বসন্ত। আসছে ফুলের দিন। প্রাচীন যে ফুলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, ধারণা করা হয় তার বয়স ১৩ কোটি বছর! আর পৃথিবীর বুকে আধুনিক মানুষের পদচারণ শুরু হয়েছিল মাত্র ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল ফুলের পৃথিবীতে, ফুলেল অভ্যর্থনায়। সেই থেকে আজ অবধি মানুষের ফুল নিয়ে বিস্ময় কাটেনি; আজও ফুলের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ অনুভব করে মানুষ। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে মানুষের বয়স যত বেড়েছে, জীবনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফুলের ব্যবহারও তত বেড়েছে। শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, প্রেমে, বন্ধুত্বে ফুল হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। আমাদের দেশে তো বটেই, প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার মানুষ ফুলকে দেখেছে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

প্রাচীন গ্রিকদের পুষ্পপ্রীতি 

ফুলের রং এবং সৌন্দর্যের জন্য গ্রিসের পৌরাণিক কাহিনিতে ফুলের কথা বিশেষ স্থান পেয়েছে। কিছু কিছু ফুলের নামকরণেও সেসব কাহিনির চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গ্রিক ঐতিহ্যে ফুলের গুরুত্ব কেবল যে কল্পকাহিনিতেই স্থান পেয়েছে, তা-ই নয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে তাদের সমাজে ফুল উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল এবং আজও তা গ্রিকদের সংস্কৃতির একটি জনপ্রিয় ও প্রচলিত প্রথা। প্রাচীনকালে তারা দেব-দেবীর উদ্দেশে পবিত্রতা এবং পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ফুল উৎসর্গ করত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিকদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা বদলে গেছে। বর্তমানে সুন্দরের বন্দনায়, অনুভূতি প্রকাশে ফুল উপহার এক বাঙ্​ময় ব্যঞ্জনায় উন্নীত হয়েছে। অপার্থিব দেব-দেবীর স্থান চলে গেছে পার্থিব দেব-দেবী, প্রিয়জন-পরিজনদের দখলে। বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ফুল উপহার দেওয়া বর্তমান গ্রিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য প্রথা। 

প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় ফুল 

প্রাচীন মিসরীয়রাও তাদের বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যে ফুলকে বিশেষ মর্যাদায় উপস্থাপন করেছিল। নীল নদের অববাহিকায় যেসব বাহারি রঙের ও সুঘ্রাণের ফুল ফুটত, সাধারণ লোকজন তাদের প্রিয়জনদের বিভিন্ন পালাপর্বে তা উপহার দিত। যুদ্ধে যাওয়ার আগে ফেরাউনরা তাদের রথগুলোকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিত। যুদ্ধ থেকে বিজয়ী সেনা, সেনাপতিরা যখন ফেরত আসে, তখনো তাদের ফুল দিয়ে সাদরে বরণ করা হতো, যেমন করা হতো গ্রিক যোদ্ধাদের। 

মিসরের পৌরাণিক কাহিনি ঘাঁটলে দেখা যায় যে আনন্দ অনুষ্ঠানে প্রাচীন মিসরীয়রা পদ্ম ফুলের গান গাইত এবং এই ফুলের আরাধনার জন্য উৎসবের আয়োজন করত। পদ্ম ফুল ভোরে ফোটে এবং রাতে এই ফুলের পাপড়ি আবারও গুটিয়ে কুঁড়ির মতো হয়ে যায় বলে মিসরীয়রা এই চমৎকার ফুলটিকে পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করত। নীল পদ্মের খুব সুন্দর এবং তীব্র ঘ্রাণ রয়েছে। তাই প্রাচীন মিসরীয় শিল্পীরা নীল পদ্মে ঘেরা মৃত ব্যক্তির ছবি আঁকত, উপহার দিত। ফুল ছিল আধুনিক মিসরীয়দের মতো প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতিতে অপরিহার্য বস্তু। 

অটোমান সাম্রাজ্য 

অভিব্যক্তি, অনুভূতি প্রকাশে ফুল উপহারের প্রচলন অটোমান সাম্রাজ্যে। ফুলপ্রেমীরা ফুল উপহার দিয়ে প্রিয়জনকে পৌঁছাত বিশেষ বার্তা। ফুলগ্রহীতা নির্দিষ্ট ফুল, ফুলের সংখ্যা এবং সেই ফুল সাজানোর ধরন দেখে বার্তাটি বুঝতে পারত। সে সময়টি ছিল ১৬০০ সালের দিকে। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতিতেও ফুল উপহার দেওয়ার মাধ্যমে বিশেষ বার্তা পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। 

ভিক্টোরীয় সময়কাল 

১৮ শতকের প্রথম দিকে পত্রপত্রিকার প্রচার-প্রসার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তুর্কিদের ফুলের মাধ্যমে সাংকেতিক বার্তা প্রদানের ধারণা ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার উদ্ভিদপ্রেমীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সে সময়টা ছিল ভিক্টোরীয় যুগ। ইউরোপে এ সময় মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা, বাসনার শিল্পসম্মত প্রকাশের উপায় হিসেবে ফুল উপহার দেওয়া হতো। এটা ছিল স্বীকৃত এবং প্রথাসিদ্ধ উপায়। আবেদন, নিবেদন যা মুখে বা লিখে প্রকাশ করলে মাধুর্য হারায়, তার জন্য ফুল উপহার দিলে রুচি, শিল্পবোধ আলাদা মাত্রায় উজ্জ্বল হয়, মর্মার্থ মর্মে পৌঁছে। ফুলের রূপ, বিন্যাসশৈলী, গড়ন, রং এবং মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে একেকটি ফুলকে আলাদা করে সাজিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বা বার্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন তাদের সংস্কৃতিতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। 

বাংলাদেশ

আমাদের সমাজে ফুলকে দেখা হয় পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে। পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতির মতো আমাদের দেশেও ফুল উপহার দেওয়া হয় শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য। 

আমাদের দেশে ফুলের প্রাচুর্য থাকলেও ব্যবহারের বৈচিত্র্য তেমন নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ফুল উপহার দেওয়ার চর্চা সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন একটা দেখা যায় না। তবে বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি অনুষ্ঠানের প্রসারের ফলে ফুল উপহার দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। 

একসময় আমাদের দেশে শুধু গোলাপ ফুল উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। এই প্রথা সম্ভবত গড়ে উঠেছিল মোগলদের কারণে। উপহার হিসেবে গোলাপের সেই আবেদন এখনো আছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, জারবেরা, দোলনচাঁপা। বসন্তদিনে এসব ফুল দিয়ে সাজানো ফুলের একটি তোড়া প্রিয়জনের হৃদয়ে দোলা দেবে বৈকি!

লেখক: অনুজীববিজ্ঞানী, বর্তমানে ফ্রান্সের বিচার বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন