আগুনে ভিটে থাকে কিন্তু ভাঙন দুঃসহ স্মৃতি ছাড়া কিছু রাখে না। করোনা অতিমারির এই দুঃসময়ে দ্বিতীয় দফা বন্যায় বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের মানুষ। উজানের সেই বানের জল, স্রোতের তোড় নিম্নমুখী হয়ে আসছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে। ভরে উঠছে পদ্মা ও শাখা নদীগুলো। বন্যার পরই শুরু হবে ভাঙন। বহু ভাঙনের পরও তবু নদীর কাছেই ফিরতে চায় নারী। ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতির সঙ্গে শুধু বোঝাপড়া নয়, নদীর পাড়ের নারীদের আছে ভাঙনে ভয় না পাওয়ার সাহস।

ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেলে গোলডাঙ্গীর ৬০ বছর বয়সী হাফেজা বেগম। ৪০ বছরের সংসারে পাঁচবার বসতবাড়ি হারিয়েছেন পদ্মায়। বর্তমান ভিটের বয়সকাল বছর ছয়। ডিঙিতে পদ্মা দিয়ে যেতে যেতে হাফেজা বেগমের বাড়িটা দেখতে বিচ্ছিন্ন এক টুকরো দ্বীপ বলে মনে হয়। নদীর ভেতর উজিয়ে আছে কয়েক শতাংশ জমি। এক পরিবারের বসতি। উঠানজুড়ে নানা রকম বাড়ন্ত গাছগাছালি। সে উঠানে নৌকা থেকে নামতে গেলে পা দেবে যায় মাটিতে। এত ভাঙনের পরও আবার কেন নদীর পাড়েই ঘর করলেন? জানতে চাইলে হাফেজা বলেন, ‘একসময় আমারও ফসলের খেতি ছিল। কাপড়ের কোছে বীজ নিয়ে জমিতে ছিটাইছি। ফসল তুলে ঘরে আনছি কিন্তু সেসব এখন কল্পনা মনে হয়। ৪০ বছর ধরে বারবার ভাঙনে সংসারের সদস্যরা দিনমজুরে পরিণত হয়েছে। অত টাকা কোথায় যে শহরে জমি কিনব? এখন তো তাও ঘর তুলে জমির ওপর আছি। শহর মানে তো রেললাইনে থাকা!’

default-image

এতটুকু উঠানের মাঝখানে বসে বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার ছোট ছোট চাঁই বানানোর কাজ চলছে। এসব চাঁইয়ে ধরা পড়ে গুঁড়া মাছ। হাফেজার ভাষায়, ‘ইচা মাছের চাঁই। চোখের সামনে নিজের ঘর পানিতে ডুবে যাওয়া দেখার কষ্ট অন্য কেউ বুঝবে না।’ বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হলেন তিনি। বললেন, ‘চর জাগলে যে দামে যতটুকু থাকার জায়গা পাই, তা অন্য কোথাও তো সম্ভব না। আমরা নদীটারেই চিনি তাই তার কাছেই প্রাণের শান্তি। পানি বাড়া দেখলে ভয় হয়। কতবার চোখের সামনে ফলসহ গাছ আর নতুন টিনের চালের ঘর একটানে নিয়ে গেল ভাঙন। আবার অল্প দামে ঘর তোলার জমিটুকু তো সে নদীই দেয়। তাই চর জাগলে আবার সাহস বাড়ে। আমরা নতুন চরের জন্য অপেক্ষা করি।’

কয়েকবারের ভাঙনে সরতে সরতে হাফেজা হাত দিয়ে নির্দিষ্ট করে দেখালেন তাঁর আগের ঘর ঠিক কোথায় ছিল। যে জায়গা দেখালেন, তা সমুদ্রের মতো উত্তাল পদ্মার ভেতর অনির্দিষ্ট একটি জায়গা। এ বাড়ির উঠানে পদ্মার স্রোত কুলকুল করে আসছে। পানির টান শুরু হলে এটুকু না থাকার আশঙ্কাই বেশি।

default-image

ডিক্রির চরের জেসমিনের দুই সন্তান। ১৪ বছরের সংসার। পদ্মায় দুবার ভেঙেছে তাঁর বসতি। ২০১১ সালে প্রথম সন্তানের জন্মের সময় চারপাশে বন্যার পানি। এখান থেকে সদরের হাসপাতাল যথেষ্টই দূর। জেসমিন বললেন, সন্তান প্রসবের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান। কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে যখন তাঁকে নৌকার পাটাতনে তুলেছিল, স্রোত দেখে ভেবেছিলেন হাসপাতাল দুরস্ত, এত তীব্র স্রোতে অনাগত সন্তানসহ নৌকা নিয়েই ডুবে মারা যাবেন। জেসমিনের ভাষায়, ‘সে কী ঢেউ! সে কেমন তুফান!’ আবারও কেন নদীর পাড়েই ঘর করলেন? জানতে চাইলে বললেন, জন্ম থেকে নদীর কাছে যাদের ভিটেমাটি, তারা শেষ পর্যন্ত ঠিকানাটুকু এখানেই রাখতে চায়। নদী থেকে সরে যাওয়া মানেই শহরের বহু মানুষের ভেতর হারিয়ে যাওয়া।

 ভাঙনের গল্প শুনিয়ে জেসমিন বললেন, পানি বাড়ার চেয়ে ভয়টা বেশি টানের সময়। তলার দিকে কূপ হয়, স্রোতে বালি সরে সরে ফাঁপা হয়ে যায় মাটির তলা। একটানে তখন চাপ ধরে দেবে যায় মাটি। তারপর সব নিয়ে বসে যায় নদীর ভেতর। নদীর এক পাড় ভাঙে তো আরেক পাড় গড়ে।

 গোলডাঙ্গীর আসমার সংসার ১০ বছরের। ৭-৮ বছর আগেও ছিল তাঁর ধান ফসল। এখন দিনমজুর স্বামী। দুটো গরুর দুধ বিক্রি করে আয় হয় কিছু। আসমা শোনালেন এক ভয়ংকর গল্প। ১৫ জুলাই আসমার সঙ্গে আলাপের দুদিন আগে নর্থ চ্যানেলের এক বাড়িতে মাঝরাতে ট্রলারে করে ডাকাত এসেছে। বাড়ির মালিকের ছয়টি গরু ছিল। গৃহকর্তাকে ট্রলারে গরু তুলে দিতে বলেছে ডাকাতেরা। বাধা দেওয়ায় কুপিয়ে জখম করে গরুগুলো তুলে নিয়ে চলে গেছে। সেই রাতে পদ্মা পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে গৃহকর্তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সদর হাসপাতালে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তিনি।

 আসমা বললেন, ‘যদি রাতে ট্রলারে করে ডাকাত আসে আর আমার বাচ্চার গলায় ছুরি ধরে, কী করব? আমিও নিজের হাতে ট্রলারে তুলে দেব এই দুটো গাই।’ তবে তার পরই আসমার কণ্ঠেও সেই একই সুর। বললেন, ‘নদীর ভাঙনের ভাবগতি তাও আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু শহরের জীবনের অনিশ্চয়তা আরও বেশি ভীত করে আমাদের। ওই ঝুঁকি না নিয়ে বরং নদীরে বোঝা আমাদের জন্য সহজ।’

default-image

নর্থ চ্যানেল ডিক্রির চর হয়ে সদরে ফেরার সময় ভরদুপুরে দেখা গেল, বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে মরে যাওয়া ভুট্টা গাছ থেকে অ্যালুমিনিয়ামের বড় গামলায় ভুট্টা তুলছেন দুই নারী। জানালেন, আগাম বন্যায় অধিকাংশ ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। এই ভিজে যাওয়া অপরিণত ভুট্টা শুকিয়ে অন্তত গরু-বাছুরকে খাওয়াতে পারবেন।

আধপাকা মূল সড়কের এক অংশ ডুবে আছে পানিতে। যেটুকু শুকনো জায়গা সেখানে, দুধার দিয়ে বসে আছেন নারীরা। হাতে-মুখে, গায়ে কাদা মাখা। পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছেন ৯ জন। বললেন, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পাট তুলে ফেলতে হয়েছে। এ পাট বিক্রি করে চাষের দামটুকুও হয়তো উঠবে না এবার। এসব নারীরই ঘর পদ্মার কোনো না কোনো চরে।

বাংলাদেশে বন্যা ও ভাঙনে সংসারের শেষ সম্বলটুকু রক্ষার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাচ্ছেন নারীরা। ভিজে যাওয়া বীজ শুকিয়ে আবারও ফসলের স্বপ্ন দেখে নারী। কলার ভেলা বা ডিঙি টেনে আশ্রয়ের দিকে যাওয়া নারী তাঁর অপুষ্ট বাহুর অসীম শক্তির ভেতর ধরে রাখেন ঘুমন্ত শিশুকে। এই নারীরা সংগ্রামী আর জীবনযোদ্ধা।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন