নারীর কাজে ফেরায় অনিশ্চয়তা

বিজ্ঞাপন
default-image

বছর পাঁচেক আগে ঢাকায় আসেন শানু বেগম। রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের সঞ্চয়হীন শানুর বয়স তখন মাত্র ২৫। স্বামীকে বহু কষ্টে রাজি করিয়ে শহরে এসেছিলেন তিনি। পোশাকশিল্প কারখানায় কাজ পান। সংসার ভালোই চলছিল। গ্রামে থাকা দুই সন্তান ও শাশুড়ির জন্য টাকা পাঠাতেন। চলতি বছরে সব ওলটপালট হয়ে গেল। করোনাভাইরাসের বিস্তারে গত ২৬ মে থেকে সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর বন্ধ হয়ে যায় শানুর কারখানা। গ্রামে ফিরতে হয় তাঁকে।

শানুর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলে তিনি জানান, তিনি আর ঢাকায় আসবেন না বা পোশাকশিল্প কারখানায় কাজও করবেন না। গ্রামে কী করবেন, তা–ও চিন্তা করেননি। শানুর স্বামী অন্যের জমিতে কাজ করছেন।

সারা বিশ্বের মতো করোনায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিও। চাকরি হারাচ্ছেন মানুষ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদাহরণ বলছে, পুরুষের তুলনায় নারীর চাকরি হারানোর হার অনেক বেশি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সতর্ক করেছে, করোনায় নারীদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি অনেক বেড়েছে, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোয় কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার বিষয়ে যে ‘পরিমিত অগ্রগতি’ অর্জিত হয়েছিল, তা মুছে ফেলতে পারে। নারীর কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, কাজ হারানো নারীদের আবার কাজে ফিরিয়ে আনা খুব সহজ হবে না।

পোশাক খাত, হোটেল, রেস্তোরাঁসহ সেবা খাত, আবাসন ও কৃষি খাত এবং গৃহকর্মে দেশের নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। করোনায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে নারীরা চাকরি হারানো শুরু করেছেন। পুঁজিসংকটে পড়ে সরে যাচ্ছেন ছোট উদ্যোক্তারাও। আবার বিদেশে কর্মরত অনেক নারীই দেশে ফিরে এসেছেন। বিভিন্ন চাকরি থেকেও নারীদের ছাঁটাই করা হচ্ছে বা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী জানান, বেসরকারি একটি গণমাধ্যমের চাকরি ছেড়ে দিলেন করোনায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। তাঁর স্বামীও মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের যত্নের জন্যও অন্তত একজনের ঘরে থাকা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন খাতে চাকরিজীবী নারীর ৪০ শতাংশ অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় ৫১ কোটি নারী এই করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আইএলও বলছে, পূর্ববর্তী সংকটের চেয়ে এবার নারীদের কর্মসংস্থান পুরুষদের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে সেবা খাতে মন্দা প্রভাবের কারণে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী কর্মঘণ্টা ১৪ শতাংশ কমে গেছে, যার অর্থ হচ্ছে, প্রায় ৪০ কোটি নতুন বেকারের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আগের অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমন অবস্থায় আইএলও সতর্ক করেছে যে কোভিড-১৯ কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমতার যে জায়গা তৈরি হয়েছিল, তা মুছে ফেলতে পারে।

সমীক্ষার তথ্য

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের বিস্তারে প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশের সব জেলা ও বিভাগের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ওপর জরিপ পরিচালনা করে জুনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

মে মাসে প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণা বলছে, অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে কমবেশি প্রভাব আছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক লকডাউনের কারণে আয়ের ক্ষতি পুরুষ নেতৃত্বাধীন পরিবারগুলোর (৭৫ শতাংশ) তুলনায় নারী নেতৃত্বাধীন পরিবারগুলোয় (৮০ শতাংশ) বেশি। লকডাউনে নারী নেতৃত্বাধীন ৫৭ শতাংশ পরিবারের আয় শূন্য হয়ে যায়, পুরুষ নেতৃত্বাধীন পরিবারের ক্ষেত্রে যা ছিল ৪৯ শতাংশ।

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন স্টেপস টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (স্টেপস) এবং জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যালায়েন্সের (গ্যাড অ্যালায়েন্স) তথ্য অনুযায়ী করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য ঘোষিত সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের সময় থেকে ৮০ শতাংশ গ্রামীণ ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা তাঁদের চলমান ব্যবসা বা উদ্যোগ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।

আইএলওর এক বিশ্লেষণে বলা হয়, যে কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক মেলে না, সে রকম কাজের তিন–চতুর্থাংশ নারীদের করতে হচ্ছে। সংকটের সময় কাজ পাওয়া খুব কঠিন, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষেরাই কাজগুলো পান। ৩৪টি দেশে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক দেশে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি খুব জোরালো যে কাজ পাওয়ার বেলায় নারীদের চেয়ে পুরুষদেরই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

তবে নারীদের আবার কাজে ফেরার বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে নারী যে খাতে চাকরি করতেন, সেই খাতের চাহিদার ওপর, এমনটা মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, চাকরির বাজার থেকে নারীরা বের হয়ে যাচ্ছেন, তবে সেই কাজের চাহিদা আবার ফিরে আসবে কি না, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন রিকশাচালকদের চাহিদা আবার বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরতদের চাহিদা এখনো তেমনভাবে ফিরে আসেনি। অর্থাৎ বিষয়টা হলো, যেই কাজে নারীরা নিয়োজিত ছিলেন, সেই কাজটা ফিরে আসছে বা ফিরে পাচ্ছেন কি না। অনেকে বাধ্য হয়ে শহর ছেড়েছেন। শহরে যে কাজ করতেন, গ্রামে সেই কাজের সুযোগ নেই। শহরে আবার ফিরে আসার ক্ষেত্রেও নানা ঝক্কি সামলাতে হবে। অর্থনীতি কীভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, নীতিনির্ধারকেরা কোন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, অর্থনৈতিক জায়গায় চলনশক্তি পুরুষ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীর ভূমিকা কিছুটা সাইডে বা পাশে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষ আয়কেন্দ্রিক পরিবার বেশি, রক্ষণাবেক্ষণের জায়গায় তাঁর ভূমিকা বেশি। এখন অস্বাভাবিক সময়ে বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছে। নারী আরও বেশি ঘরে ঢুকে গেছেন। পরিবারের সদস্যদের দেখভালের বিষয়টি পুরোপুরি এখন পড়ছে নারীর ওপর। করোনাভাইরাসের বিস্তারে অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীরা ব্যাপক হারে চাকরি হারিয়েছেন। মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণই বেশি।

অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, নারীরা শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতায় পুরুষের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন। এমনকি ডিজিটাল দক্ষতায়ও নারী পিছিয়ে। অথচ নতুন যে স্বাভাবিকের সঙ্গে সবাইকে অভ্যস্ত হতে হলে এবং কর্মক্ষেত্রে থাকতে হলে এসব দক্ষতা অপরিহার্য। গ্রামীণ নারীদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতার বিষয়টি রপ্ত করা আরও ভয়াবহ। নারীরা কর্মক্ষেত্রে আবার কতটুকু ফিরতে পারবেন, তা–ই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার ও নারীদের আবারও কর্মমুখী করতে ব্যাপক প্রশিক্ষণের জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন