default-image

মাধ্যমিক পরীক্ষায় মো. ফরিদ হোসেনের চতুর্থ বিষয় ছিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এই তরুণ স্কুলের আইসিটির পাঠ্যবই পড়ে প্রথম রোবট সম্পর্কে জানতে পারেন। বইতে লেখা ছিল, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বড় ভূমিকা রাখবে রোবট। ফরিদ হোসেনের মনে তখনই স্বপ্নটা উঁকিঝুঁকি দিয়েছিল—যদি আমিও একটা রোবট তৈরি করতে পারতাম। সেই স্বপ্ন নিয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। 

স্বপ্নপূরণের পথে তিনি যে অনেকখানি এগিয়েছেন, সেটাই চোখে পড়ল ১৫ অক্টোবর। ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইনোভেশন এক্সপো ২০১৯’-এ ফরিদ আর তাঁর দুই বন্ধু হাজির হয়েছিলেন তাঁদের তৈরি রোবট টিভেটকে নিয়ে। 

তিন বন্ধুর এই ছোট্ট দলটির দলনেতা মো. ফরিদ হোসেন। সঙ্গে আছেন রাহাত উদ্দিন ও আবদুল্লা আল আরাফ। ফরিদের মতো বাকি দুজনেরও ইলেকট্রনিকসের প্রতি আগ্রহ। রাহাত বলছিলেন, ‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমি প্রকৌশলী হব। তাই সব সময় তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন।’ উদ্যমী তিন তরুণ এক হয়েছেন ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ার সুবাদে। ফরিদ ও রাহাত এখন ঢাকার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে বিএসসি করছেন, আর আরাফ পড়ছেন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগে।

ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইনোভেশন এক্সপো ২০১৯-এ এসেছিলেন অনেক তরুণ। তাঁদের মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এই তিনজন একটু অন্য রকম। শুধু রোবট প্রদর্শন নয়, মেলায় হাজির হওয়ার পেছনে তাঁদের আরও একটা উদ্দেশ্য আছে। সে কথা পরে বলছি। আগে টিভেট কীভাবে তৈরি হলো, সেই গল্প শোনা যাক।

টিভেটের জন্ম

‘২০১৪ সালের কথা। তখন আমার কম্পিউটার ছিল না। খাতায় লিখে লিখে কোডিংয়ের চর্চা করতাম।’ বলতে গিয়ে ফরিদ হোসেন বোধ হয় খানিকটা স্মৃতিকাতর হলেন। জানালেন, কলেজের একটা প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রথমে ব্যাংরো নামে একটি সাধারণ রোবট তৈরি করেছিলেন ফরিদ হোসেন ও রাহাত উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন আরও কয়েকজন বন্ধু। ফরিদ বলছিলেন, ‘আমরা ৮ বন্ধু জমানো টাকা এক করে পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী ঘুরে ঘুরে রোবটের জন্য যন্ত্রপাতি কিনেছি। একটা রোবট বানানো হবে, সে কী রোমাঞ্চ!’ 

পরে ফরিদদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)। আইডিইবি আইসিটি এবং ইনোভেশনের সেলের তত্ত্বাবধানে তৈরি হয় ব্যাংরোর দ্বিতীয় সংস্করণ—টিভেট।

আইডিইবি আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন ডিভিশনের পরিচালক মো. জুলফিকার হোসেন বলেন,‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে, তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মেধা ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছি আমরা। ভবিষ্যতের সমস্যা সমাধানের জন্য যেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তারা কাজ করতে পারেন, সে জন্যই সহায়তা করছে পেশাজীবীদের সংগঠন আইডিইবি। মিস্টার টিভেটের মতো এ রকম আরও কিছু প্রকল্পের উন্নয়নে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’ 

২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আইডিইবির ২২তম জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানায় টিভেট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোবটটিকে প্রশ্ন করেন, ‘হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?’ রোবট উত্তর দেয়, ‘মাই নেম ইজ মিস্টার টিভেট।’ শেখ হাসিনা রোবটটিকে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করেন। সবাইকে চমকে দিয়ে ঠিকঠাক উত্তর দেয় মিস্টার টিভেট। ফরিদ বলছিলেন, ‘২০১৮ সালে বেসিসের ইয়ুথফেস্টে বেস্ট ইনোভেশন চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম আমরা। 

টিভেটের চমক

টিভেটের সঙ্গে দেখা হলে সে আপনাকে স্যালুট দেবে। প্রশ্নের উত্তর দেবে। হাত বাড়ালে আপনার সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করবে সাহেবি কায়দায়! আর কী কী করতে পারে, এই রোবট। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত রোবটের কারিগর ফরিদ হোসেন ও তাঁর বন্ধুরা খুব আগ্রহ নিয়ে উত্তর দিলেন। ‘টিভেট মানুষের নির্দেশ শুনে কাজ করতে পারে। ২৫ রকম শারীরিক অঙ্গভঙ্গি করার ক্ষমতা ওর আছে। কথা বলার সময় মানুষের মতোই টিভেটের মুখ নড়ে। চাকার মাধ্যমে চলাফেরা করে। ওর সঙ্গে একটা উন্নত প্রযুক্তির থ্রিডি ক্যামেরা যুক্ত আছে। তাই সামনে থাকা কোনো মানুষ বা বস্তুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনসম্পন্ন কোনো বস্তু বহন করতে পারে।’ 

আইডিইবির আইওটি অ্যান্ড রোবটিকস রিসার্চ ল্যাবে টানা দুই বছর গবেষণার পর এই পর্যায়ে এসেছে টিভেট। ফরিদ, রাহাত ও আরাফের স্বপ্ন—সামনের দিনগুলোতে রোবটটিকে তাঁরা আরও উন্নত করবেন। রাহাত বললেন, ‘ঠিকঠাকমতো ডেভেলপ করতে পারলে এই রোবট হাসপাতালে রোগীর দেখাশোনা করা, রাতে পাহারা দেওয়া, রেস্তোরাঁয় বেয়াড়ার কাজ কিংবা বাড়িতে মানুষের সহকারী হিসেবে কাজ করতে পারবে।’ শুধু তা–ই নয়, টিভেটের মধ্যে কবিতা বা বই পড়ার সক্ষমতাও ঢুকিয়ে দিতে চান এই তিন উদ্ভাবক। 

বলছিলাম, শুধু প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে মিস্টার টিভেটকে নিয়ে মেলায় হাজির হননি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা তিন বন্ধু। এর পেছনে আরও বড় পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনা প্রকাশ পায় রোবটটির নামকরণের মাধ্যমে। টেকনিক্যাল ভকেশনাল এডুকেশন ট্রেইনিংয়ের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো টিভেট। 

সাধারণের কাছে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চান রোবটটির উদ্ভাবকেরা। কারিগরি শিক্ষাসংক্রান্ত সচেতনতা গড়ে তোলা এই রোবট তৈরির অন্যতম লক্ষ্য। ফরিদ বলেন, ‘রোবটটি তৈরির সময় পলিটেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষকেরা আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আইডিইবি আমাদের সব রকম সহায়তা করেছে। যেহেতু আমরা তিনজনই ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়েছি, তাই আমরা মনে করি, এই শিক্ষার কথা মানুষকে জানানো আমাদের দায়িত্ব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0