default-image

সুখবালা, রসনা রানী, মিনতি, মালতী, সরলাদের পেশা কৃষি। বীজ বপন, রোপণ, নিড়ানিসহ ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত সবকিছুই করেন তাঁরা। জীবনের চাকা সচল রাখতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছেন তাঁরা। সারা বছর কাজের নিশ্চয়তা পেলেই তাঁরা খুশি।

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার ভাউলারহাট-রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ সড়কের পাশের গ্রামগুলোর কয়েকজন নারী কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। হঠাৎ কালো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। এরপর শুরু হয় বজ্রের সঙ্গে বৃষ্টি । তবে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পলিথিন মুড়িয়ে হাঁটুপানি মাড়িয়ে আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত আটজন শ্রমিকের সাতজনই নারী। কাজের ফাঁকে তাঁদের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়।

 সুখবালার বয়স ৪৪ বছর। সুখবালা প্রথমে বললেন, ‘হামার নামেই তো সুখবালা। সুখীর কাছত দুঃখ আসিবে ক্যামন করিয়া?’ তবে কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে গেলেন তিনি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জানালেন, তাঁর আট বছর বয়সের একটি মেয়ে আছে। মেয়ের জন্মের আগেই স্বামী মারা গেছেন। এরপর কখনো ভাইয়ের সংসারে, কখনো বোনের সংসারে বোঝা হয়ে দিন কাটে তাঁর। একসময় শুরু করেন কৃষিশ্রমিকের কাজ। সকালবেলা কাজে এসে বাড়ি ফেরেন বিকেল পাঁচটায়। মাঝে থাকে খাওয়ার বিরতি। দৈনিক মজুরি মেলে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

কিছুদূর এগিয়ে সদর-রানীশংকৈল ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমানার মিলনস্থল। যদুয়ার গ্রামে তখন চলছে আমন চাষের কর্মযজ্ঞ। বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলে আনছিলেন জনা চারেক কৃষিশ্রমিক। তাঁদের মধ্যে দুজন নারী। সে সময় কথা হয় রসনা রানীর (৪৮) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পুরুষেরা যেসব কাজ করে, হামরাও (নারীরা) সেই কাজ করু। পুরুষেরা কাজ ফেলে পান, চা-বিড়ি খাবার নাম করে বিশ্রাম নেয়। কিন্তু হামরা কাজ করেই যাও। এর পরও পুরুষরা হামার থাকি বেশি হাজিরা পায়।’ এটাই তাঁকে কষ্ট দেয়।

ছোটবেলা থেকেই কাজ করে বড় হওয়া কেরিয়া কলন্দা গ্রামের মিনতি রায় (৪২) নারীরা একটু কম মজুরি পান, তা জেনেই বড় হয়েছেন। এটাকে নিয়ম বলেই মেনে নিয়েছেন তিনি। পুরুষকে ৩৫০ টাক মজুরি দেওয়া হলেও তিনি পান ২৫০ টাকা। মিনতি বললেন, ‘আইজ হঠাৎ করে হাজিরার দাম বেশি চাইলে কেউ কাজই দিবে না।’ এরপর বলতে লাগলেন, ‘তোমরা এলা যানতো। হাতত অনেকলা কাজ আছে। কাজ না করিলে মহাজন কথা শোনাবে।’

একমনে বীজতলা থেকে চারা তুলে চলছিলেন মালতী রানী (৩৯)। হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, করোনায় গ্রামের অনেক মানুষ ত্রাণের জন্য চেয়ারম্যান-মেম্বারের পেছনে ঘুরে ঘুরে সময় নষ্ট করেছেন। তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, সারা বছর কাজ পেলেই তাঁরা খুশি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) নারী উন্নয়ন ও সমতা নিয়ে কাজ করেন রুবি আকতার। তিনি বলেন, কৃষি খাতের ২১টি কাজের ধাপের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ১৭টিতে। তবু তাঁরা মজুরিবৈষম্যসহ নানা বঞ্চনা আর নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আফতাব হোসেন জানান, জেলার মোট নারী কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই । কৃষিকাজের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজই হয় তাঁদের হাতের ছোঁয়ায়। কৃষি খাতে নারীদের অবদান কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বৈষম্য দূর করতে বর্তমান সরকার সরাসরি নারী কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারেও নারীদের আলাদা ক্যাটাগরি রাখা হয়েছে।

 সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অরুণাংশু দত্ত বলেন, বীজ বপন থেকে শুরু করে ঘরে ফসল তোলা পর্যন্ত কৃষিতে নারীদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান সরকার তাঁদের মর্যাদা দিতে নানা পদক্ষেপ নিলেও সমাজে এখনো অনেক বাধা রয়েই গেছে। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে এসব বাধা দূর করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন