default-image

১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান। চার বছর আগের এই দিনেই হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন তাঁর নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন। লতিফুর রহমান ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি, নৈতিকতা, সুনাম ও সততার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে পেয়েছিলেন অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতের নোবেল হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত একটি উদ্যোক্তা–উন্নয়নবিষয়ক অনুষ্ঠানে তরুণদের উদ্দেশে কথা বলেছিলেন তিনি। লতিফুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই বক্তৃতাটি আজ থাকল সফলদের স্বপ্নগাথায়।

প্রত্যেকেই উদ্যোক্তা
একজন উদ্যোক্তা হলেন তিনি, যিনি কিছু তৈরি করেন। আগে আমাদের একটা মানসিকতা ছিল, কাউকে যখন প্রশ্ন করা হতো আপনি কী করেন, বলত আমি সরকারি চাকরি করি। কিংবা বেসরকারি চাকরি করি। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানে আজ থেকে ৩০ বছর আগেও আমি সহকর্মীদের বলতাম, ভাই ‘বেসরকারি চাকরি’ কথাটা বলবেন না। আপনি একটা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। যিনি যেই ভূমিকাতেই থাকেন না কেন, আপনি একজন ব্যবসায়ী, একজন উদ্যোক্তার দায়িত্ব পালন করছেন। আপনার পদবি হতে পারে ব্যবস্থাপক বা অন্য কিছু, কিন্তু এই ভূমিকায় প্রতিদিন আপনি কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কিছু উদ্যোগ নিচ্ছেন। অতএব আপনি একজন উদ্যোক্তা। পুঁজি বা টাকা হয়তো আপনার নয়, হতে পারে এটা প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনা বা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বটা ব্যক্তির। অতএব যদি নিজেকে একজন উদ্যোক্তা বলে বিশ্বাস করেন, উদ্যোগী মনোভাব আপনার মধ্যে আসবে।

যদি ভাবেন আমি একজন নিছক কর্মচারী, বেসরকারি চাকরি করি, আমার দায়িত্ব হলো নয়টার সময় অফিসে যাওয়া আর পাঁচটার সময় বাড়ি ফেরা, তাহলে আপনি নিজে যেমন একদিকে সফল হতে পারবেন না, তেমনি আপনার সম্ভাবনার দিকগুলোও অজানা থেকে যাবে। আমরা যাঁরা ব্যবস্থাপক বা চাকরিদাতার ভূমিকায় আছি, এখানে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। কর্মীর উদ্যোগী মনোভাব কাজে লাগাতে আমরা তাঁকে কতটা কর্তৃত্ব বা স্বাধীনতা দিচ্ছি?

সুন্দর পিচাইয়ের কথা যদি বলি। তিনি তো গুগলের মালিক নন। তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এবং তিনিই গুগলের মুখপাত্র। তার মানে, তিনি গুগল পরিচালনা করছেন একজন উদ্যোক্তা হিসেবে, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। কারণ, তাঁকে সেই কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেকে বলে, আমার প্রতিষ্ঠানে এমন অনেক কর্মী আছেন, খুব ভালো পদ-পদবি, কিন্তু কর্তৃত্ব কতটুকু নেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের ব্যবসায়ী মহলেই অনেকে বলেন, ভাই, আমি তো লোক নিলাম, কিন্তু তাঁরা ঠিকমতো কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারছেন না। আমার অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন। হয়তো আমি সৌভাগ্যবান। আমার যাঁরা সহকর্মী আছেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, তাঁরা তাঁদের কাজ করে যান। কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে বলে টাকাপয়সা লুটপাট করে চলে গেছে, এমন অভিজ্ঞতা আমার কখনো হয়নি।

default-image

কাজের স্বাধীনতা

আমি বিশ্বাস করি, আমার সামনে বসে থাকা তরুণেরাসহ বাংলাদেশের সব মানুষেরই সর্বোচ্চ সম্ভাবনা, সক্ষমতা আছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সম্ভাবনাকে কতটুকু বেড়ে উঠতে দিয়েছি। সুযোগ কতখানি দিয়েছি। আমি গর্ব নিয়ে এ কথা বলি, আমার অনেক সহকর্মী ২৫-৩০-৪০ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছেন। তার মানে হয়তো তাঁরা এমন কিছু পেয়েছেন, যে সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, আমরা পদ অনেক সময় দিই, কিন্তু কর্তৃত্ব কতটুকু দিই, সেটা একটা প্রশ্ন। কেউ ব্যবস্থাপক, কেউ নির্বাহী—পদের সঙ্গে কর্তৃত্ব একটা সামঞ্জস্য রেখে চলে। কিন্তু কর্তৃত্ব বা স্বাধীনতা সত্যিই সেই ব্যক্তিকে দেওয়া হচ্ছে কি না।

যেকোনো পর্যায়ের কর্মীকে তাঁর কাজের প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। অর্থাৎ টাকা এবং অন্যান্য সুবিধা। ওই খাতের অন্যদের তুলনায় সেরাটাই আপনাকে দিতে হবে। যদি না দেন, আপনি কিন্তু ভালো লোক পাবেন না। প্রতিদান দেওয়ার পাশাপাশি আপনাকে অর্থবহ ক্ষমতায়নও করতে হবে। তাঁর কাজের গণ্ডির মধ্যে অবশ্যই তাঁর নিজের কর্তৃত্ব থাকতে হবে। অর্থনৈতিক চাহিদা মানুষের আছে, কিন্তু কাজের সন্তুষ্টি আসবে তখন, যখন সে সত্যিকার কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারবে। ওই পেশাগত সন্তুষ্টি দিতে হবে। আর অবশ্যই প্রত্যেককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন মানে এই নয়, তিনি তাঁর সম্মান সমর্পণ করেছেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কিন্তু অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার হার খুব কম, বিশেষ করে ওপরের দিকের পদে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে তরুণেরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে ঢোকে, তারা আরও ভালো সুযোগ খোঁজে, বিকল্প খোঁজে। সেটা দোষের কিছু নয়। আমি আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছি কি না, আরও বড় ভূমিকায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি কি না, এসব সে বিবেচনা করবে। যদি প্রতিষ্ঠান টাকাপয়সা ও কাজের দিক থেকে সেই পরিবেশ বজায় রাখতে পারে, তাহলে কর্মীর অন্য সুযোগ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা খুবই পেশাদার। পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্যরা আছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন পেশাদার সহকর্মীরা।

গত পরশু আমাদের জানানো হলো, পেপসিকোর এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্য-উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে আমাদের ট্রান্সকম বেভারেজেস এক নম্বর। এটা কিন্তু আমি পরিচালনা করি না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহব্যবস্থাপনা পরিচালক আছেন, তাঁদের একটা দল আছে, তাঁরাই সব দেখভাল করেন। তার মানে একটি বৈশ্বিক, বড় প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি ব্যবস্থাপনা বিশ্বের সেরা অবস্থানে আছে। আজকে গুগল বলেন, নেসলে বলেন, পেপসিকো বলেন, এগুলো সবই মাল্টিবিলিয়ন ডলারের করপোরেশন। এর জন্য মাল্টিবিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। অতএব পুঁজিটা এক বা দুজন ব্যক্তির নয়। কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা নেই। সবই করপোরেশনের। কিন্তু করপোরেশনের কাজ, ব্যবসা পরিচালনা করেন এর কর্মীরা। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁদের কাজ, মনোভাব, দায়িত্ব একজন উদ্যোক্তার মতোই। যেকোনো ভালো প্রতিষ্ঠানের একদম গোড়া থেকেই এই মনোভাব থাকা উচিত এবং একে উৎসাহ দেওয়া উচিত। কেউ যখন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, তখনই তাঁকে সেইভাবে গড়ে তুলতে হবে।

সাধারণের মধ্যে একটা ধারণা আছে, ব্যবসায়ী হলে শর্টকাট করতেই হবে, বা কিছু ফাঁকি দিতে হবে। তাহলে সে ব্যবসায়ী হতে পারবে। বাংলাদেশ কিন্তু এখনো একটা নতুন দেশ। নতুন পরিবেশ। ৪০-৫০ বছর একটা দেশের ইতিহাসে কিছুই না। অতএব আমরা এখনো শিখছি। একভাবে দেখলে ব্যবসা বিষয়টা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ছিল না। এটা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অসাধারণ পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে। গার্মেন্টস খাতটাই যদি দেখেন। গার্মেন্টস রপ্তানিতে বাংলাদেশ আজকে দ্বিতীয়। ১০-১৫ বছর আগেও হয়তো কথাটা অবিশ্বাস্য শোনাত। এই অর্জন এসেছে তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। আজকে হয়তো তাঁরা আর তরুণ নেই। কিন্তু একদিন ‘কিছু করব’, এই ভাবনা থেকে তাঁরা শুরু করেছিলেন। এখন একটা পর্যায়ে এসেছে।

আমার ব্যবসাজীবনের শুরু

আমি আমার পেশাজীবন শুরু করেছিলাম ডব্লিউ রহমান জুট মিলে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি তরুণ। আমি আমার নিজের চোখে সেই নৃশংসতা দেখেছি। ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ আছে। আমি পরিষ্কারভাবে বিশ্বাস করি, যদি বাংলাদেশের জন্ম না হতো, আমি এখানে বসে এই বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পেতাম না। আমার ছোট ভাই সবুরও (ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান) হয়তো এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারত না। স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে আমাদের অনেক ঋণ। এটা অনেক সময় আমরা ভুলে যাই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন অবকাঠামোসহ অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সরকার সবকিছু জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জুট মিল, টেক্সটাইল মিল, ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স, সব সরকারি হয়ে গেল। অতএব আমি যে আমাদের জুট মিলে কাজ করতাম, সেটা সরকারের সম্পত্তি হয়ে গেল। আমাদের শুধু কয়েকটা চা–বাগান ছিল। চা–বাগান তখন জাতীয়করণ হয়নি। তখন প্রতি পাউন্ড চায়ের উৎপাদন খরচ ছিল ৫ টাকা, আর বিক্রয়মূল্য ছিল ২-৩ টাকা। কারণ, চা যেত এখান থেকে পাকিস্তানে, স্বাভাবিকভাবেই সেই বাজারটা আমরা হারিয়েছিলাম। তোমরা নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক বিপর্যয়টা বুঝতে পারছ।

আমি মতিঝিলে যে অফিসে বসতাম, সেটাও সরকারি হয়ে গেল। আসবাবপত্রসহ সবকিছু নিয়ে গেল। অতএব আমার কাছে এটা ছিল টিকে থাকার প্রশ্ন। বাংলাদেশি পরিবারগুলোর মধ্যে আমরা একটু সৌভাগ্যবান ছিলাম, ছোটবেলা থেকে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালে খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। আমাদের গুলশানে বাড়ি ছিল, গাড়ি ছিল। আব্বার তখন হার্টের সমস্যা, তিনি পুরোপুরি অবসর নিয়েছেন। ছোট ভাইবোন তখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার কিছু করা প্রয়োজন ছিল। আমি নাটকীয়ভাবে বলতে চাই না, কিন্তু বললে অসত্য হবে না, কোনো কোনো দিন হাতে ১০০-২০০ টাকাও ছিল না। আসবাবপত্রগুলো চলে যাওয়ার পর পুরোনো জজকোর্টের পেছনে তখন আসবাবপত্র ভাড়া পাওয়া যেত। ওখান থেকে ভাড়া করে এনে অফিসটা আবার চালু করি।

আমাকে টিকে থাকার জন্য একটা কিছু খুঁজে নিতে হয়েছে। তোমরা সবাই শুনেছ, একটা কথা আছে, ‘টাকা আজ আছে, কাল নেই।’ আমারও সেই অবস্থা হয়েছিল। সারা জীবন অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়েছি, হঠাৎ দেখি নেই। সামনে দুটো বিকল্প ছিল। হাল ছেড়ে দেব, না চেষ্টা করব? সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা, আমি দ্বিতীয়টাই বেছে নিয়েছিলাম।

‘মালিক’ শব্দে আপত্তি

একজন শিক্ষার্থী বলল, আমি প্রথম আলোসহ আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক, এটা সে জানত না। বিনয় করে বলছি না, ‘মালিক’ শব্দটা আমি পছন্দ করি না। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, এসব প্রতিষ্ঠানে কিন্তু আমার কোনো অফিস নেই। কোনো রুম নেই। আমি এগুলো পরিচালনা করি না। পত্রিকাগুলো পরিচালনা করেন আমার শ্রদ্ধেয় সহকর্মী মতিউর রহমান এবং মাহ্‌ফুজ আনাম। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, ‘মালিক’ শব্দটা আধুনিক ব্যবসার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। আমি শেয়ারহোল্ডার হতে পারি। কিন্তু তুমি যদি ‘মালিক’ শব্দটা ব্যবহার করো, তাহলে তুমি বাকি সবাইকে উল্টো দিকে ঠেলে দিচ্ছ।

সে জন্যই আমি ক্ষমতায়নের কথা বলছিলাম। মালিক, শ্রমিক বা কর্মচারী, এভাবে ভাবলে চলবে না। আমার শেয়ার আছে, মালিকানা আছে, কিন্তু যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা সবাই আমার সহকর্মী। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, উপাচার্য বা অধ্যাপক, যে-ই হন না কেন, সবাই মিলেই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি গড়েছেন। সবাই সবার সহকর্মী। প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজের কাজ করেন। যখনই তুমি ‘মালিক’ শব্দটা ব্যবহার করবে, তখন তুমি আর ‘টিমওয়ার্ক’ পাবে না।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন