default-image
>সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত চরের একজন গৃহিণী ফুলেআরা ইমাম। স্বামী আর এলাকাবাসীর সহায়তায় তিনি গড়ে তুলেছেন একটি হাসপাতাল। এক দশক আগে গড়া ফুলেআরার সেই মানবসেবা হাসপাতাল এখনো যমুনা নদীবেষ্টিত পাঁচটি ইউনিয়নের হাজারো অসুস্থ মানুষের ঠিকানা।

ঘণ্টাখানেক যমুনা নদীর ঢেউ ভেঙে আমাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি পৌঁছাল নাটুয়ারপাড়া নদীবন্দরে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়ায় এসে দুই ধরনের বাহনের দেখা মিলল—মোটরবাইক আর দুই চাকার ঘোড়ার গাড়ি। ইচ্ছে করছিল দুই চাকার ঘোড়ার গাড়িতেই সওয়ার হব। কিন্তু বেলা গড়িয়েছে বলে বেছে নিতে হলো ভাড়ায় চালিত মোটরবাইক। 

চালককে বললাম ‘মানবসেবা হাসপাতালে যাব’। ভটভট শব্দ তুলে তিনি ছুটলেন বাইক হাঁকিয়ে। দুর্গম এই চরে বছর কয়েক আগেও মাটির রাস্তা ছিল। মাটির রাস্তাটি এখন পাকা। এবার বন্যার পানিতে ডুবে গেলেও সড়কের তেমন ক্ষতি হয়নি। সেই সড়ক ধরে মুহূর্তেই পৌঁছে গেলাম রেহাইশুড়ীবেড় গ্রামে। আরও কিছুটা সময় পর মানবসেবা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে।

এই প্রত্যন্ত জনপদের প্রথম বেসরকারি হাসপাতাল এটি। এলাকায় ১০ শয্যার সরকারি একটি হাসপাতাল মাত্র হাঁটাহাঁটি পা পা করছে। সেখানে আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ফুলেআরার স্বপ্নের মানবসেবা হাসপাতালটির যাত্রা শুরু করেছিল। ফুলেআরা দেশের আর দশজন গৃহবধূর মতোই একজন।

অপেক্ষমাণ ব্যক্তিদের ভিড় আর সাইনবোর্ড দেখে সহজেই বোঝা গেল টিনে ও কাঠের তৈরি বাড়িটিই হাসপাতাল ভবন। সামনে এগোতেই বুঝলাম যার মূল অংশ নিচতলায়। সেখানে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আছে সৌরবিদ্যুতের একটি প্যানেল। এসবের পাশেই একটি ফার্মেসি। 

খোঁজ করি ফুলেআরার। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই কথা হয় আগত সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে। তাঁদেরই একজন আছিয়া বেগম। প্রায় ৬০ বছর বয়সী এই নারী এসেছেন চরগিরিশ ইউনিয়নের সিন্দরহাটা গ্রাম থেকে। মেয়ে আশা খাতুনের হঠাৎ পেটব্যথা দুই রাত আগে থেকেই। আছিয়া বেগম বলছিলেন, ‘আমরা চর এলাকার মানুষ। যেকোনো অসুস্থতায় এক-দেড় ঘণ্টা নৌকায় যেতে হয় উপজেলা সদর হাসপাতালে। রাত হলে তো নদীপথে বিপদের শেষ নাই।’ আছিয়ার মতো এই হাসপাতালের মাধ্যমে যমুনার চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, মনসুরনগর ও তেকানী  ইউনিয়নের মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে।

হাসপাতালে তখন ‘তিল ঠাঁই আর নাহি রে...’। অনেকে এসেছেন ঠান্ডা-জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে, অনেক নারী এসেছেন নিজেদের নানা রোগের পরামর্শ নিতে। ভেতরে রোগী দেখছেন একজন নারী। পরিচয় দিতেই বললেন, ‘আমি তাঁর (ফুলেআরার) ছোট বোন রেনুকা।’ তিনিই এই হাসপাতালের সার্বক্ষণিক চিকিৎসক। পল্লি চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখানে রোগী দেখেন। প্রাথমিক সেবা দেন। তিনিই জানালেন, হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক ফুলেআরার স্বামী ইমাম হোসেন। 


ততক্ষণে ফুলেআরার সাক্ষাৎ পাওয়া গেছে। তিনি ব্যবস্থাপত্র দেখে সাধ্যমতো বিনে পয়সায় ওষুধ বিতরণ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই পাশে এসে বসলেন ইমাম হোসেন। পাশাপাশি বসা দুজন। ফুলেআরা বলে গেলেন তাঁর শুরুর কথা, স্বপ্নের কথা।

কষ্ট থেকে স্বপ্ন 

১৯৮২ সালের কথা। ফুলেআরাদের বাড়ি তখন নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামে। হঠাৎ তাঁর ছোট ভাই সুজনের ভীষণ ঠান্ডা লেগে যায়। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কবিরাজ দেখিয়ে যখন কোনো লাভ হলো না, তখন সুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা চলল। ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। ঘাটে নৌকা চলাচল বন্ধ। অগত্যা আবার বাড়ি ফেরা।

বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে নিতেই সুজনের হৃৎস্পন্দন থেমে যায়। কিশোরী ফুলেআরা হারান কোলেপিঠে করে বড় করা ছোট ভাই সুজনকে। ফুলেআরা বলছিলেন, ‘তখন থেকেই ভাবতাম,  বিনা চিকিৎসায় এভাবেই কি চরের মানুষকে মরে যেতে হবে? কিছুই কি করতে পারব না।’

গোড়াপত্তনের গল্প

ছোট ভাইকে হারানোর এক বছর পরই বিয়ে হয় ফুলেআরার। স্বামী ইমাম হোসেন তখন ছাত্র। এইচএসসি পাস করে সিরাজগঞ্জে ডিএমএফ (ডিপ্লোমা অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) কোর্স করেছেন। তিন বছরের কোর্স শেষ করে দুই বছর বেকার জীবন শেষ হয় ১৯৮৬ সালে। ওই বছরই যোগ দেন উপসহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে। স্বামীর চাকরি পাওয়ার পরই ফুলেআরার স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকে। 

ফুলেআরা বলে যান, ‘১৯৯০ সালের দিকে আমার স্বপ্নের কথা তাকে (ইমাম হোসেন) খুলে বলি। সে আমার কথা শুনে খুশি হয়।’ খুশি হলেও ইমাম হোসেন ভাবলেন, অর্থ পাবেন কোথায়?

তখন উপায় বের করেন ফুলেআরাই। দামি শাড়ি, অলংকার কেনার ইচ্ছা থেকে নিজের সব শখ-আহ্লাদ ভুলে অর্থ জমানো শুরু করেন। এরই মধ্যে ফুলেআরার বাবার গ্রাম জোড়গাছা বিলীন হয়ে যায় যমুনার গর্ভে। সবাই এসে ঠাঁই নেয় রেহাইশুড়ীবেড় গ্রামে। চলতে থাকে চরের জীবন, বড় হতে থাকে ফুলেআরার স্বপ্ন। মাস শেষে জমানো টাকার বাক্সটাও ভারী হতে থাকে। 

২০০৫ সালে ফুলেআরা সঞ্চয়ের এক লাখ টাকা তুলে দেন স্বামীর হাতে। ইমাম হোসেন বলছিলেন, ‘ফুলেআরার টাকা পেয়ে কাজে নেমে পড়ি। বাজারের ঠিক কাছেই সবার জন্য চালু করি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেন্দ্র। একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকও রাখি। প্রায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতাম আমরা।’

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ইমাম হোসেন সরকারি হাসপাতালের চাকুরে হয়েও কেন হোমিওপ্যাথি ফার্মেসি খুললেন? খানিকটা পেছনে ফিরে গিয়ে উত্তর দেন ফুলেআরা, ‘চরের মানুষের মধ্যে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ওপর আস্থা বেশি। তাই হোমিওপ্যাথি দিয়েই যাত্রা শুরু করি।’ হোমিও চিকিৎসা দিয়ে আপাতত সেবা দিতে থাকে ফুলেআরার চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। কিন্তু আবারও বাদ সাধে ওই যমুনাই। ২০০৭ সালে স্থায়ীভাবে করা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেন্দ্রটি চলে যায় যমুনার পেটে। আবারও ফুলেআরার স্বপ্নভঙ্গ। নিজেদের বেশ কিছু জমিজমা নদীগর্ভে চলে যায়। আবারও চর জাগে। ঘর ওঠে। জীবন শুরু হয়। কিন্তু মানুষের জন্য কি কিছু করা সম্ভব হবে আর? 

এবার ফুলেআরা নিজের জমানো আরও কিছু টাকা স্বামীর হাতে দিয়ে আবারও হাসপাতাল তৈরির কথা বলেন। কিন্তু ফুলেআরার অর্থে তো বড় কিছু করা সম্ভব নয়। এগিয়ে আসে চরের সাধারণ মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, যাদের অভাব আর সমস্যা নিত্যসঙ্গী, তারাই পাশে এসে দাঁড়ায়। একটি টিন, এক টুকরো কাঠ, এক কেজি পেরেক; যার কিছু নেই, তার একবেলার শ্রম নিয়ে পাশে দাঁড়ায় ইমাম হোসেন ও ফুলেআরার। সবমিলিয়ে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো যাত্রা শুরু করে আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতাল। ফুলেআরা তাঁর শাশুড়ি ও শ্বশুরের নামে রেখেছেন হাসপাতালের নাম।    

সেই থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে হাসপাতালে। সচ্ছল ব্যক্তিদের কাছে নামমাত্র ফি নেওয়া হলেও দরিদ্র–হতদরিদ্রদের জন্য তা বিনা মূল্যে। দেওয়া হয় স্বল্পমূল্যে জরুরি ওষুধ। ইমাম হোসেন বলছিলেন, ‘হাসপাতালটি চালাতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। মানুষের কাছ থেকে নানাভাবে সহায়তা পাচ্ছি, কিন্তু তা দিয়ে ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে একটি জেনারেটর ও অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি ইজি বাইক বা এ–জাতীয় গাড়ি দরকার। কিন্তু কত দিনে সম্ভব হবে, বুঝতে পারছি না।’ 

তবে ফুলেআরা আশাবাদী। তাঁর হাসপাতালটি আরও বড় হবে, চরের অসুস্থ মানুষের কাছে হয়ে থাকবে আশার আশ্রয়। ফুলেআরার এমন স্বপ্নই তো আমিনা-দৌলতজামান মানবসেবা হাসপাতালের প্রাণ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0