default-image

পাল্টেছে সময়, পাল্টেছে অভ্যাস। মনে হতে পারে, বইয়ের চেয়ে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে ফেসবুকের দিকে তাকিয়ে থাকাটাই তরুণদের অভ্যাস এখন। ভুল ধারণা। বইমেলায় গিয়ে দেখুন, নতুন বইয়ের দিকে এ যুগের তরুণদের কী তৃষ্ণার্ত চোখ! কিন্তু এটাও তো সত্য, প্রযুক্তির সঙ্গে নিবিড় বসবাস কেড়ে নেয় মানুষের অনেকটা সময়। কত দিন হলো পোস্ট অফিসের দিকে পা বাড়াই না আমরা! কত দিন হলুদ খামে চিঠি দেয়নি কাছের কোনো মানুষ। এখন তো প্রয়োজনে ছোট্ট একটা এসএমএস—ব্যাস! দুরু দুরু বুকে চিঠির জন্য অপেক্ষার দিন শেষ! 

default-image

তাই বলে বইও কি থাকবে না? কার জন্য থাকবে? অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে ধ্রুপদি সাহিত্য তো ল্যাপটপের মনিটরেই পড়ে নেওয়া যায়! তাহলে?
এ কথায় পড়ুয়া অনেকেই হাসেন। দুই মলাটের মাঝে লুকানো কাগজের বই আর মনিটরে দেখা বইয়ের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। ছাপানো বইটি যেখানে-সেখানে, যখন-তখন, যেভাবে ইচ্ছা পড়া যায়। মনিটরটাকে নিশ্চয়ই সেভাবে ব্যবহার করা যায় না! তাই বইয়ের পাঠক হারিয়ে যাবে, এ রকম ভাবার সময় এখনো আসেনি।
প্রযুক্তি এনেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ—আরও কত কী! সেই প্রযুক্তিই বই প্রকাশের কাজটিকে সহজ করে দিয়েছে। বইকে করেছে মনকাড়া! প্রকাশকেরাও বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশ করছেন। আর হ্যাঁ, বই পড়ছে মানুষ। এখন জন্মদিন বা বিয়ের অনুষ্ঠানে শিশুসাহিত্য বা ধ্রুপদি রচনাবলি উপহার দেওয়ার চল হয়েছে। অনেকেই পছন্দ করছেন এটা।
কথাশিল্পী শাহনাজ মুন্নী ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে তাঁর জীবনে বইয়ের প্রভাব নিয়ে কথা বললেন। সেই বয়সে জন্মদিনে বাবা-মা-মামা-খালা সবাই উপহার দিতেন বই। সেই বই গড়ে দিত মনের জগৎটা। তিনি বললেন, ‘বইয়ের মতো ভালো উপহার আর কী হতে পারে? আমি একেবারে শিশুকাল থেকে বলি। প্রতিবছরই তো নতুন ক্লাসে উঠছে শিশু। তার রুচি গঠনের জন্য ভালো ভালো বই দিতে অসুবিধা কোথায়? শিশুটি বড় হলো, প্রেমে পড়ল, কাছের মানুষটিকে কোনো উপলক্ষে দেওয়া উপহারটি তো হতে পারে প্রেমের কবিতার বই। এটা তো বন্ধুত্ব প্রকাশেরও ভালো মাধ্যম। তারপর বিয়ে। আমরা তো বিয়েতে অনেক টাকা খরচ করে থালাবাটি দিই। সেই একই টাকায় ধ্রুপদি রচনাবলি দিতে দোষ কোথায়? এটা তো সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। বন্ধু দিবস, মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস, নববর্ষ—একালের সব উৎসবেই তো বই উপহার দেওয়া যায়। বই হলো মনের খাদ্য। কাউকে বই উপহার দেওয়ার মানে তাঁর উপকার করা হচ্ছে।’

default-image

ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাইম মনে করিয়ে দিলেন, এ যুগের তরুণদের বুঝতে হলে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে। এখন তো বেশির ভাগ তরুণই অনলাইননির্ভর। তাই প্রকাশকেরা অনলাইনেও দিচ্ছেন বইয়ের বিজ্ঞাপন। সেখানে বই থেকে তুলে দিচ্ছেন বইয়েরই কিছু অংশ; যদি ভালো লাগে, তাহলে এই ছেলে বা মেয়েটিই হবে বইটির ক্রেতা। ‘আমি ১০ বছর আগে দেখেছি, পাঠকের মূল আকর্ষণ ছিল গল্প-উপন্যাস-কবিতার বই। এখন দেখছি ইতিহাস, প্রবন্ধ-গবেষণার বই দেদার বিক্রি হচ্ছে। আমরা রবীন্দ্রনাথসহ দেশের ধ্রুপদি লেখকদের রচনাবলি বের করেছি। মানুষ কিনছে। উপহার দিচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক।’
শিশুদের বই নির্বাচন করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, বিভূতিভূষণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ, মোহাম্মদ নাসির আলী, সাজেদুল করিম, শাহরিয়ার কবীর, মুহম্মদ জাফর ইকবালদের বই কি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে? ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কু নিয়ে যে রাজত্ব তৈরি করেছেন সত্যজিৎ রায়, সেই রাজ্য ভ্রমণ করতে হবে না? একটু বড় হলে জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি হাতে তুলে না দিলে তারুণ্যের দিকে পা বাড়ানো মানুষটি কীভাবে বুঝবে একাত্তরকে?
তেমনি চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন, ভিক্তর উগো, আলেকজান্ডার দ্যুমা, রোয়াল্ড ডালও তো দূরে থাকতে পারেন না। একালে জে কে রাউলিং, জন গ্রিন, খালেদ হোসেইনি, ভেরোনিকা রথকেও তো পড়তে হবে। কাদের লেখা পড়া যায়, সেটাও কিন্তু অনলাইনে খোঁজা সম্ভব।
বহু আগে শোনা কথা, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। হ্যাঁ, দেউলিয়া তো হয়ই না, বরং রুচির জায়গাটা কর্ষণ করার জন্য বইই বইয়ের একমাত্র বিকল্প।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন