>

আশির দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ফরিদপুরের মোহাম্মদ ইদ্রিস বৃত্তি নিয়ে লেখাপড়া করতে গিয়ে তিনি শিকার হন বর্ণবাদের এরই মধ্যে প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ একপর্যায়ে তিনি হন সফল আন্দোলনের নেতা

পনেরো শতকের শেষ থেকে এই একুশ শতক পর্যন্ত বর্ণবাদের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করা লাখ লাখ হতভাগ্য মানুষের মধ্যে জর্জ ফ্লয়েড একজন। তাঁর মৃত্যুর প্রতিবাদে আমেরিকাজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছে, তাতে সাদা-কালোনির্বিশেষে মানুষ কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্লোগান তুলেছেন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’।

বিশ শতকের আশির দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরেও এমনই স্লোগান উঠেছিল, ‘মোহাম্মদ মাস্ট স্টে’। সেই স্লোগানেও গলা মিলিয়েছিলেন সাদা-কালোনির্বিশেষে যুক্তরাজ্যের হাজার হাজার মানুষ। ব্যানার, প্ল্যাকার্ডে ভরে উঠেছিল বার্মিংহাম, লন্ডন, ম্যানচেস্টারসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তা। সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই ঘটনা কভার করার পাশাপাশি একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করেছিল।

এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র মোহাম্মদ ইদ্রিস ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। প্রতিবছরের মতো এ বছরও তিনি ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে এসেছিলেন। সংবাদ পেয়েছিলাম, করোনার কারণে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়া স্থগিত করে তিনি ফরিদপুরে নিজের বাড়িতে আছেন। যোগাযোগ করে ঠিক হলো একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়ার। স্থির হলো জুনের ২ তারিখ মধ্যরাতে আমরা কথা বলব ভিডিও কনফারেন্সে। কারণ, মধ্যরাতে নেটওয়ার্ক বেশ ভালো থাকে। করোনা সংক্রমণে মানুষের মৃত্যু আর জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে সরব মানুষের বিক্ষোভে তপ্ত হয়ে উঠেছে তখন লকডাউনের সময়গুলো। সেই রাতে এক ঘণ্টার বেশি সময় মোহাম্মদ ইদ্রিসের সঙ্গে। সে এক শিহরণজাগানো মুহূর্ত! ভিডিও ক্যামেরার ওপারে নিজের জীবনের গল্প বলে চলেছেন যুক্তরাজ্যের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এক কিংবদন্তি বাঙালি!

default-image

গল্পটা ছিল বঞ্চনার, সাদাদের দুনিয়ায় কালোদের বঞ্চনার। এসব গল্পে যেমনটা হয়ে থাকে, কালোরা শেষ পর্যন্ত গল্প থেকে হারিয়ে যায়। মোহাম্মদ ইদ্রিসের গল্পটা তেমন ছিল না। আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের একজন ‘কালো মানুষ’ মোহাম্মদ ইদ্রিস খোদ যুক্তরাজ্যের বুকে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘আমি আমার ব্যাগ গোছাব না। প্রয়োজন হলে তোমরা আমাকে গ্রেপ্তার করে দেশে পাঠাতে পারো।’ সময়ের প্রেক্ষাপটে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এ এক অনন্য ঘটনাই বটে।

এরপর প্রায় তিন বছরের আইনি প্রক্রিয়া পার হয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি লাভ করেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। তারও পরে প্রায় দুই দশক প্রত্যক্ষভাবে সাদাদের দেশে কালোদের অধিকার আদায়ের আক্ষরিক অর্থে শত শত আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবন মোহাম্মদ ইদ্রিসের। যে সংগ্রামের সুফল এখন ভোগ করছেন যুক্তরাজ্যে বসবাস করা আফ্রো-এশিয়ান বিভিন্ন গোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ। শুধু তা–ই নয়, সাদাদের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ ক্রমে কিছুটা হলেও ভয় পেতে শুরু করেছে একতাবদ্ধ মানুষের সম্মিলিত স্লোগানকে। ব্যক্তিগত সংগ্রামের সেই গল্প তাই আর ব্যক্তিগত থাকেনি।

কিন্তু কেন তেড়েফুঁড়ে উঠেছিলেন ১৯৭৬ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস? এ গল্পের মূলে রয়েছে প্রেম, বিয়ে এবং বিচ্ছেদের ঘটনা। সেই গল্প শোনার আগে তাঁর বাংলাদেশ পর্বের কথা শুনে নিই, চলুন।

ফরিদপুর থেকে ঢাকা, তারপর যুক্তরাজ্য

১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। বাবার নাম মোহাম্মদ মোসলেম শেখ, মায়ের নাম জোবেদা বেগম। ফরিদপুর মিশনারি প্রাইমারি স্কুলে হাতেখড়ি। ফরিদপুরেই স্কুল–কলেজের লেখাপড়ার পাট চুকিয়েছেন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে মোহাম্মদ ইদ্রিস ১৯৭০ সালে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে এমএসসি করতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৪ সালে এমএসসি পাস করেন তিনি। এরপর কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে অপটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট টেকনোলজি বিষয়ে পড়তে যান ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৭৬ সালে।

‘ব্রিটিশদের সঙ্গে আমার গন্ডগোলের শুরু হলো এখান থেকেই। আমাকে একটা ফান্ডামেন্টাল কোর্সে ভর্তি করানো হলো। দেশে পড়ে যাওয়া লেখাপড়া আবার করতে হচ্ছিল বলে বিরক্ত হলাম। আমার প্রফেসরকে বললাম, একটা গরিব দেশের সরকার আমাকে পড়তে পাঠিয়েছে। আমার সময় নষ্ট করছেন কেন? প্রফেসর জানালেন, সেটাই নিয়ম। তোমাদের ওখানকার লেখাপড়া ভালো নয়, শিক্ষকেরা ভালো নয়। তাই শেষ করতে হবে ফান্ডামেন্টাল কোর্স।’

এরপর প্রফেসরের সঙ্গে মোহাম্মদ ইদ্রিসের বাগ্‌বিতণ্ডা হয় বিস্তর। নিজ দেশের শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্রিটিশদের সেই অবজ্ঞার প্রতিবাদ করেছেন বিভিন্নভাবে। কিন্তু তিনি পড়ালেখা শেষ করেন যথাসময়ে। ১৯৭৮ সালে শেষ হয় তাঁর কোর্স।

প্রেম ও বিয়ে

পড়ালেখা চলাকালেই মোহাম্মদ ইদ্রিসের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে ব্রিটিশ নারী ক্যারল স্কটের সঙ্গে। সময়টি ১৯৭৬ সালের শেষার্ধ। স্মৃতিচারণা করে মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, সে সময় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে প্রচুর আউটিং হতো। স্থানীয় ক্লাব-রেস্টুরেন্টে আড্ডা হতো। সে রকম পরিস্থিতিতেই ক্যারলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়লে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন একসঙ্গে থাকার। সে বছরেরই ডিসেম্বর মাস থেকে তাঁরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

এই একসঙ্গে থাকাটা খুব সহজ কোনো কাজ ছিল না সত্তর-আশির দশকের যুক্তরাজ্যে। খোদ যুক্তরাজ্যের বুকে একজন কালো মানুষের সঙ্গে এক ব্রিটিশ নারী একসঙ্গে বসবাস করছেন, সেটা দেখতে খুব একটা ইচ্ছুক ছিল না গত শতকের সত্তরের দশকের ব্রিটিশ সমাজ। বিভিন্নভাবে বিরক্ত করা হতো তাঁদের। ইদ্রিস-ক্যারল জুটিকে রাস্তায় একসঙ্গে হাঁটতে দেখলে গালাগালি কিংবা ঢিল ছোড়ার মতো ঘটনা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। আপত্তিকর ভাষায় লেখা চিঠি পাঠিয়ে দেওয়া হতো বাসায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতে যুদ্ধ করা এক ব্রিটিশ সৈনিক ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া কিছু ভারতীয় মুদ্রা একবার মোহাম্মদ ইদ্রিসের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, গো ব্যাক। তোমার প্লেনের টিকিটের জন্য এটা আমার দান! পানশালা কিংবা মুদিদোকানের মানুষেরা শুধু কালো হওয়ার জন্য ইদ্রিসের মতো মানুষদের কাছে বিক্রি করতে চাইতেন না কোনো কিছু। এ রকম ছোট ছোট অনেক ঘটনা স্মৃতি হাতড়ে আমাদের শোনান মোহাম্মদ ইদ্রিস।

তিন বছর একত্রবাসের পর ১৯৭৯ সালে মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং ক্যারল স্কট বিয়ে করেন। ক্যারল স্কটের চাওয়া অনুসারে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল চার্চে এবং বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের আইন মেনে।

default-image

পৃথক জীবনযাপন

ব্রিস্টল ছিল মূলত ক্যারল স্কটের হোম টাউন। ১৯৮০ সালে মোহাম্মদ ইদ্রিস প্রথম চাকরি পান বার্মিংহাম শহরে। সেটা ছিল ব্রিস্টল থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে। ক্যারল হোম টাউন ছেড়ে বার্মিংহামে যেতে রাজি ছিলেন না। সে বছরই মোহাম্মদ ইদ্রিস হোম অফিসে আবেদন করেন যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য। কিন্তু তাঁকে এক বছরের জন্য অনুমতি দেওয়া হয় সেখানে থাকার। এক বছর পর ১৯৮১ সালে তিনি পুনরায় আবেদন করেন যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য। কিন্তু হোম অফিস এবার সিদ্ধান্ত জানাতে নীরবতার রাজনীতি গ্রহণ করে। এই সময়ে ১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং ক্যারল স্কটের দাম্পত্য সমস্যা শুরু হলে তাঁরা পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

যুক্তরাজ্যের আইন বলে, দুই বছর পৃথকভাবে বসবাসের পর যেকোনো দম্পতি যেকোনো সময় আইনি প্রক্রিয়ায় বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং ক্যারল স্কট বিবাহবিচ্ছেদের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে তাই পৃথক থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

সমস্যার শুরু

দ্বিতীয়বার স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদন করার পর যুক্তরাজ্যের হোম অফিস দীর্ঘ নীরবতা পালন করলেও, মোহাম্মদ ইদ্রিস ও ক্যারল স্কট পৃথকভাবে বসবাস শুরুর পর খুব দ্রুত সময়ে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এক সপ্তাহের মাথায় হোম অফিস মোহাম্মদ ইদ্রিসের স্থায়ী নাগরিকত্বের আবেদন স্থগিত করে এবং ১৯৭১ সালের যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইনের আওতায় তিন সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে যুক্তরাজ্য ত্যাগ করতে বলে। মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, কীভাবে কর্তৃপক্ষ তাঁদের পৃথক থাকার সংবাদ পেয়েছিল, তা তিনি নিশ্চিত নন।

এখানেই আপত্তির আঙুল তুলে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন অভিবাসন আইনকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাজ্যে সংঘটিত বর্ণবাদবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ততা ছিল তাঁর। সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন লন্ডনের এডলার স্ট্রিটে বাঙালি আলতাব আলী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সংঘটিত হওয়া টাওয়ার হ্যামলেট এন্টি রেসিস্ট মুভমেন্টে, ১৯৭৮ সালে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আফ্রো-এশিয়ানদের ওপর ঘটা প্রকাশ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের ভয়ংকর চেহারা দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যুক্তরাজ্যের অভিবাসন আইনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর।

কেন তাঁরা পৃথক থাকছেন, কে তার জন্য দায়ী—এসব প্রশ্ন না করে হোম অফিস একতরফা সিদ্ধান্ত নেয় মোহাম্মদ ইদ্রিস আর যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন না। কিন্তু যেহেতু তাঁরা পৃথক থাকছেন এবং বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেননি, তাই তাঁদের বিয়ে আইনত বহাল আছে বলেই বিশ্বাস করেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। কারণ, যুক্তরাজ্যের আইন হলো, বিবাহবিচ্ছেদের জন্য যেকোনো দম্পতিকে দুই বছর পৃথক থাকতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁদের পৃথক থাকার বয়স ছিল মাত্র এক সপ্তাহ। ফলে মোহাম্মদ ইদ্রিস যুক্তরাজ্য না ছাড়ার ব্যাপারে অনড় থাকেন। তিনি হোম অফিসকে জানিয়ে দেন, প্রয়োজনে সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে দেশে পাঠিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তিনি সরকারের ভয়ে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাবেন না।

তত দিনে চাকরির সুবাদে নালগো (বর্তমান নাম ইউনিসন) নামের একটি ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করেছেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। নালগোর সভায় তিনি নিজের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। নালগোর সভ্যরা তাঁকে জানিয়ে দেন, যদি তিনি সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চান, করতে পারেন। নালগো তাঁর সঙ্গে থাকবে।

আপিল এবং পাঁচ মিনিটের সুযোগ

মোহাম্মদ ইদ্রিসের প্রতিবাদের মুখে হোম অফিস জানায়, চাইলে তিনি আপিল করতে পারেন। তিনি আপিল করেন। কিন্তু একাধিকবার আপিল করেও প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। এ সময় ট্রেড ইউনিয়ন নালগোর বিভিন্ন শাখায়, প্রতিনিধি সম্মেলনে মোহাম্মদ ইদ্রিসকে নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।

১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় তিন হাজার মানুষের উপস্থিতিতে হওয়া নালগোর একটি জাতীয় সম্মেলনে মোহাম্মদ ইদ্রিস পাঁচ মিনিট সুযোগ পেলেন তাঁর কথা তুলে ধরার। নালগোর সদস্যরা সমর্থন করলেন তাঁকে। একটি জাতীয় পর্যায়ের ট্রেড ইউনিয়ন যখন ইদ্রিসের পক্ষে কথা বলা শুরু করল, তখন আর ব্যক্তিগত থাকল না ইদ্রিসের সংগ্রাম।

default-image

মোহাম্মদ ইদ্রিস সুরক্ষা আন্দোলন

মোহাম্মদ ইদ্রিসের সব আইনি প্রক্রিয়ায় নিজেদের সম্পৃক্ত থাকা এবং সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নালগো একটি রেজল্যুশন পাস করে। এরপর শুরু হয় মোহাম্মদ ইদ্রিস সুরক্ষা আন্দোলন (ডিফেন্স ক্যাম্পেইন), যার স্লোগান ছিল, ‘মোহাম্মদ ইদ্রিস মাস্ট স্টে, ডিপোর্টেশন নো ওয়ে’।

মিছিলে-স্লোগানে ক্রমশ উত্তাল হতে থাকে রাজপথের পরিস্থিতি। বার্মিংহাম, ব্রিস্টল, লন্ডনেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে প্রতিবাদের আগুন। দলে দলে মানুষ মোহাম্মদ ইদ্রিসের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে যেমন ছিলেন কালোরা, তেমনি ছিলেন খোদ যুক্তরাজ্যের সাদারাও। সরকারের ওপর চাপ তৈরি হতে থাকে অভিবাসন আইন সংশোধনের।

সে সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কট্টর দক্ষিণপন্থী হিসেবে পরিচিত মার্গারেট থ্যাচার। তিনি ট্রেড ইউনিয়নের বিপক্ষের নেত্রী বলে পরিচিত ছিলেন। ফলে মোহাম্মদ ইদ্রিস ডিফেন্স ক্যাম্পেইন কৌশলগতভাবে কিছুটা কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। কারণ, ট্রেড ইউনিয়ন সে সময় অভিবাসন আইনের জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে মার্গারেট থ্যাচার সরকারকে। সরকারও সংগত কারণে কঠোর অবস্থানে চলে যায়। মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, সে সময় কাছের মানুষদের অনেকেই তাঁকে সরকারের বিপক্ষে আন্দোলন করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না বলে নিরুৎসাহিত করতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অনড়।

নালগো সে সময় যুক্তরাজ্যের অন্যতম সেরা ব্যারিস্টার ইয়ান ম্যাকডোনালকে কাজে লাগায় মোহাম্মদ ইদ্রিসের পক্ষে। ইয়ানের পরামর্শে হাইকোর্টে ওঠে মোহাম্মদ ইদ্রিসের মামলা। ইদ্রিস তত দিনে বার্মিংহামে বসবাস করা বাঙালি এবং এশিয়ান সমাজে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সেই মামলায় তাঁর সামাজিক প্রভাবকেও বিবেচনায় নেন ইয়ান।

মোহাম্মদ ইদ্রিসের মামলা চলাকালেই, ১৯৮৫ সালের ৯-১১ সেপ্টেম্বর বার্মিংহামের হ্যান্ডসওর্থ জেলায় সংঘটিত হয় এক রক্তক্ষয়ী বর্ণবাদী দাঙ্গা। সে সময়ে হ্যান্ডসওর্থের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের মতো ছিলেন অভিবাসী এবং তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন এশিয়ান। রক্তক্ষয়ী সেই দাঙ্গার প্রভাব পড়ে মোহাম্মদ ইদ্রিসের মামলার ওপর।

মোট আটবার আদালতে যেতে হয়েছিল মোহাম্মদ ইদ্রিসকে। প্রতিবারই আদালতের সামনে অপেক্ষমাণ মানুষ তাঁর পক্ষে মিছিল করেছেন। নালগোর তত্ত্বাবধানে বার্মিংহাম, ব্রিস্টল, লন্ডন, ম্যানচেস্টার ইত্যাদি শহরে হয়েছে জাতীয় ক্যাম্পেইন এবং ১০টি বড় মিছিল। সেসব মিছিলের একেকটিতে অংশ নিয়েছিলেন তিন হাজার থেকে চার হাজার করে মানুষ। হ্যান্ডসওর্থ দাঙ্গার অল্প কিছুদিন আগে স্থানীয় সাংসদ হাউস অব কমন্সে মোহাম্মদ ইদ্রিসের স্থায়ী নাগরিকত্বের পক্ষে একটি আবেদন করেন, যেখানে ১৮৭ জন সাংসদ স্বাক্ষর করেছিলেন।

বিজয় এবং তারপর

আশির দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে খুব দ্রুত বেশ কয়েকটি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ঘটে যায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে। তার মধ্যে হ্যান্ডসওর্থের বর্ণবাদী দাঙ্গা ছিল রক্তক্ষয়ী। সম্ভবত ক্রমবর্ধমান আন্দোলনে যুক্তরাজ্য সরকারের ভেতরেও কিছুটা নমনীয়তা কাজ করতে থাকে সে সময়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সেক্রেটারি, হোম ডিপার্টমেন্ট, যুক্তরাজ্য বনাম মোহাম্মদ ইদ্রিসের মধ্যে চলমান বিচারের শেষ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এরও এক মাস পর, অক্টোবরের মাঝামাঝিতে বিচারের রায় দেওয়া হয়। এ বিচারে মোহাম্মদ ইদ্রিস জয়লাভ করেন এবং যুক্তরাজ্যের স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেন।

এশিয়ান রিসোর্স সেন্টারের পরিচালক পদ লাভ

বিজয়ের পর সবকিছু থেমে যায়নি; বরং এরপরের পথচলাটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মোহাম্মদ ইদ্রিসের। জয়লাভের কিছুদিন পরই, ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে মোহাম্মদ ইদ্রিসকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অভিবাসীদের দ্বারা পরিচালিত এশিয়ান রিসোর্স সেন্টারের পরিচালক হিসেবে মনোনীত করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ।

প্রায় তিন বছর রাজপথে আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে এরপরে এই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে গড়ে ওঠে ‘পশ্চিম মিডল্যান্ড ডিপোর্টেশন বিরোধী আন্দোলন’। এরপর তৈরি হয় এই আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের একটি জোট (ন্যাশনাল কোয়ালিশন অব অ্যান্টি ডিপোর্টেশন ক্যাম্পেইন)। পশ্চিম মিডল্যান্ড ডিপোর্টেশন বিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে এশিয়া ও আফ্রিকার কালো অভিবাসীদের বিভিন্ন দাবিতে ৫০টির বেশি আন্দোলন হয় পরবর্তীকালে এবং প্রতিটিতেই এশিয়ান রিসোর্স সেন্টার জয়লাভ করে। এই আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ের জোটের পক্ষ থেকেও পরবর্তীকালে চার শতাধিক সফল আন্দোলন হয়। প্রতিটি আন্দোলনের সুফল ভোগ করেন আফ্রিকা ও এশিয়ার কালো অভিবাসীরা।

এশিয়ান রিসোর্স সেন্টার কাজ করে মূলত অভিবাসীদের আইনি সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ–সুবিধা আদায়ের জন্য। আশি ও নব্বইয়ের দশকের বিভিন্ন বর্ণবাদী আন্দোলন বার্মিংহামে চলতে থাকে এশিয়ান রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে, মোহাম্মদ ইদ্রিসের নেতৃত্বে। এশিয়ান নারীদের বেকার ভাতা আদায়, গৃহহীন অভিবাসীদের জন্য সরকারি বাসস্থানের ব্যবস্থা, ২৫ বছরের জ্যামাইকান তরুণ স্টিফেন লরেন্স হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ভারতীয় নাগরিক সাতপাল রাম মুক্তি আন্দোলন, কার্ডিফ-৩ আন্দোলন, পাকিস্তানি নারী ইকবাল বেগম মুক্তি আন্দোলনসহ অনেক আন্দোলন গুরুত্ব ও সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেন মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে এশিয়ান রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে এবং মোহাম্মদ ইদ্রিসের নেতৃত্বে যেসব ক্যাম্পেইন বা আন্দোলন শুরু হয় আফ্রো-এশিয়ান অভিবাসীদের দাবি আদায়ের জন্য, তার ফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী।

‘অন্তত এখন ইংল্যান্ডের সরকার এটা বোঝে, এই কালো মানুষগুলো এখন প্রশ্ন করতে পারে। আইনে যা আছে, সেটা না দিলে এরা যেকোনো সময় ক্যাম্পেইন শুরু করবে। আগের মতো এরা আর হাসতে হাসতে জেলখানায় যায় না।…’ প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের প্রতিষ্ঠানের অর্জন নিয়ে সংক্ষেপে এটাই ছিল মোহাম্মদ ইদ্রিসের উত্তর।

অবসর এবং…

এশিয়ান রিসোর্স সেন্টারের পরিচালক পদ থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অবসর নেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। তবে এখনো তিনি প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে চলেছেন। প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফেরেন তিনি। বিয়ে করেছেন যুক্তরাজ্যেরই হেদার রজার্সকে, ১৯৮৪ সালে। মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং হেদার রজার্স দম্পতি বর্তমানে বার্মিংহামে বসবাস করছেন।

কৌতূহল জাগে মনে। কেন ফিরলেন না দেশে? প্রশ্ন করে বসি। উত্তরে কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। তারপর শোনান ১৯৮৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শেষ শুনানিতে আদালতে সরকারি কৌঁসুলির সঙ্গে তাঁর একটি নাটকীয় প্রশ্নোত্তর পর্বের কথা।

চলচ্চিত্রের কোনো দৃশ্যের মতো মনে হয় ঘটনাটি। সরকারি কৌঁসুলি একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছেন মোহাম্মদ ইদ্রিসকে। একপর্যায়ে সরকারি কৌঁসুলি প্রশ্ন করে বসলেন,

‘একটি গরিব দেশের সরকার তোমাকে পড়তে পাঠিয়েছিল। দেশে ফেরোনি। তোমার দুঃখ হয় না?’

ইদ্রিস উত্তর দিলেন, ‘হয়।’

‘তাহলে দেশে ফিরলে না কেন?’

‘ফিরিনি; কারণ, আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম।’

‘সে তো চলে গেছে। আবার বিয়ে করেছ। সেও যদি একই ঘটনা ঘটায়?’

‘আবার একই কাজ করব।’

লকডাউনের রাতে দীর্ঘ সময় নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া গল্প করতে করতে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন মোহাম্মদ ইদ্রিস। তারপর বলেন, ‘আমার স্ত্রী আমার সঙ্গে ফিরতে চাননি বাংলাদেশে। ফলে আমিও থেকে যাই। হয়তো ব্যাপারটা প্রেমই!’ উল্লেখ্য, প্রায় এক দশক পর, ১৯৯৩ সালের দিকে মোহাম্মদ ইদ্রিস এবং ক্যারল স্কটের আইনগতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

রাষ্ট্রের শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাতের শুরু হয়েছিল একটি সম্পর্কের বিচ্ছেদ থেকে। পরবর্তীকালে জীবনে এসেছিলেন আরও এক নারী। আইনকে মোকাবিলা করে এসেছিল সাফল্য। হয়তো সে সাফল্যই মোহাম্মদ ইদ্রিসকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল সংগ্রামের কঠিন রাস্তায়। সে জন্য এখনো, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু তাঁকে ভাবায়। ভাবায় ভবিষ্যতের পৃথিবী, অতীতে যার স্বরূপ তিনি নিজেই দেখেছেন কিছুটা।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন