default-image

এখন বসন্ত। প্রকৃতিতে এখন শুধুই ফুলের মেলা। শীতের শেষের এই ঋতুসন্ধিতে পরিবর্তন আসছে সবকিছুতেই। যেমন বাতাসের তাপমাত্রা, আদ্রর্তা ইত্যাদি। ঋতুবৈচিত্র্যের এ দিনগুলোতে মনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখের রোগবালাইয়েও পরিবর্তন আসে।
এ সময় ফুলের রেণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আর কারণ হয়ে দাঁড়ায় চোখের অ্যালার্জির। আমাদের ভোগায়। অ্যালার্জিক কনজাঙ্কাইভাইটিসে চোখ লাল হয়ে যায়। পানি পড়ে। থাকে অসহ্য চুলকানি। সবচেয়ে বেশি ভোগে তাঁরা, যাঁদের পারিবারিক অ্যালার্জির ইতিহাস থাকে। যেমন হাঁপানি ইত্যাদি রোগীকে আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলি অ্যাটোপিক রোগী।
লক্ষণ: মনে হয় চোখে কোনো ময়লা পড়েছে। চোখে কচকচ করে, চুলকায়। চোখের সাদা অংশটা লাল হয়ে যায়। অনেক সময় চোখের পাতাগুলো ফুলে ওঠে আর পানি পড়ে।
চিকিৎসা: যা আপনি নিজেই শুরু করতে পারেন—পরিষ্কার পানি দিয়ে ঘন ঘন চোখ ধুয়ে ফেলুন। তাতে যে বস্তুগুলো অ্যালার্জির কারণ, সেগুলো কমে যায়।
কিটোটোফেন: অলোপ্যাটাডাইন ইত্যাদি ড্রপ দিনে দু-তিনবার ব্যবহার করুন। তাতে ভালো না হলে চক্ষুচিকিৎসকের কাছে যান। তবে জেনে রাখুন, এ ধরনের অ্যালার্জি চোখের বড় ধরনের কোনো ক্ষতি করে না এবং অনেক সময় নিজে নিজে বিদেয় হয়।
প্রতিকার: ধুলোবালির জায়গা, ফুলের বাগান, পার্ক ইত্যাদি স্থানে কম যাতায়াত করুন। অবশ্য আমাদের তিলোত্তমা ঢাকার সর্বত্রই তো ধুলোবালু। তাই ঘরে ফিরে ভালোভাবে চোখ ধুয়ে নিন।
বিশেষ সতর্ক থাকুন অ্যাটোপিক ব্যক্তিরা, অর্থাৎ যাঁরা হাঁপানি, একজিমা ইত্যাদি রোগে ভোগেন। যদি আপনাদের অ্যালার্জির প্রবণতা এই ঋতুতে বেশি হয়। তবে শীতের শেষ থেকেই কিটোটোফেন বা মন্টিলুকাস্ট বড়ি খেতে শুরু করে দিন। ভালো থাকবেন। আর যদি অগত্যা আপনাকে অ্যালার্জি পেয়ে বসলে ডাক্তার দেখান।
এই ঋতুতে আরেকটা রোগের প্রবণতা বেশি বলতে পারেন প্রাদুর্ভাব আকারে হয়। এটা হচ্ছে ভাইরাল কনজাঙ্কাইভাইটিস। একে কেতাবের ভাষায় বলে এপিডিমিক কনজাঙ্কাইভাইটিস। অ্যাডেনো নামক ভাইরাস দিয়ে হয়। আমরা বলি চোখ ওঠা। এর লক্ষণ আপনাদের সবার কাছে কমবেশি পরিচিত। চোখে কচকচ করে, লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে, পাতা ফুলে যায়, ব্যথা করে। সারাক্ষণ ময়লা দিয়ে চোখ ঢেকে যায়। সকালবেলা চোখের পাতা একটির সঙ্গে আরেকটি ময়লা দিয়ে আটকে থাকে। এ রোগটি কিন্তু ভীষণ ছোঁয়াচে। সাবধান, বিশেষ কোনো চিকিৎসা ছাড়াই অনেক ক্ষেত্রে ভালো হয়ে যায়। যেকোনো একটি অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপেই চলে। যেন কোনো ইনফেকশন না বাড়ে। আজকাল গ্যানসাইক্লোভির নামে একটা ওষুধ পাওয়া যায়, যেটাতে এ রোগ সারে। আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে সৈয়দ সাহেবের সেই উক্তিটিই প্রযোজ্য—ওষুধ খেলে সারবে এক সপ্তাহে আর না খেলে সারতে সময় নেবে সাত দিন।
তবে ঘন ঘন হালকা গরম পানিতে চোখ পরিষ্কার রাখা, একটা অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করা আর প্রয়োজনে একটি অ্যান্টি হিস্টামিন বড়ি খাওয়া।
এ রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে একমাত্র উপায় রোগীর ব্যবহার্য জিনিস থেকে দূরে থাকা। রোগীর স্পর্শ থেকে দূরে থাকা। রোগীর সংস্পর্শে এসে গেলে আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা উত্তম।
বাতাসের বিভিন্ন রকমের ধূলিকণা আমাদের চোখে এসে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলি ফরেন বডি। এ রকম ফরেন বডি চোখে পড়লেও তৎক্ষণাৎ পানির ঝাপটা দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন। বস্তুটি সের না গেলে চোখ কচলাবেন না। ডাক্তারের কাছে চলে যান। এ রকম পরিস্থিতিতে যেন পড়তে না হয়। ঝড় উঠলে ঘরের জানালা বন্ধ রাখুন। রাস্তায় থাকলে চোখ বন্ধ করে রাখুন যথাসম্ভব।
সামনে গরম আসছে। তখন বাতাসের শুষ্কতা টেনে নেয় শরীরের সবটুকু জল। চোখেও দেখা দিতে পারে শুষ্কতা অর্থাৎ ড্রাই আই সিনড্রোম। যাঁরা এ রোগে আগে থেকেই ভুগছেন, তাঁরা একটি ন্যাচারাল টিয়ার ড্রপ বা অশ্রুফোঁটা ব্যবহার করতে শুরু করে দিন। আর যাঁরা দীর্ঘ সময় কমপিউটারে চোখ রাখেন, তাঁদেরও ড্রাই আই সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। ফলে তাঁরাও বাজারের টিয়ার ড্রপ ব্যবহার করতে পারেন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, চক্ষু বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন