ঢাকায় ‘আনা ফ্রাঙ্ক: আ হিস্ট্রি ফর টুডে’ শিরোনামের প্রদর্শনী আবারও ফিরিয়ে নিয়ে এল কিশোরী আনা ফ্রাঙ্কের স্মৃতি। দুনিয়া ঘুরে কীভাবে বাংলাদেশে এল এই প্রদর্শনী?

default-image

লাখো মানুষের যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারি। তবু যখন আকাশের দিকে তাকাই, কেন যেন মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। মনে হয়, এই নির্মম নিষ্ঠুরতারও অবসান হবে। আবারও ফিরে আসবে শান্তি...
আনা ফ্রাঙ্ক
১৫ জুলাই, ১৯৪৪
মৃত্যুর প্রায় ৭০ বছর পরও আনা ফ্রাঙ্ক কী আশ্চর্য প্রাসঙ্গিক! এখন দুনিয়াজুড়ে ডায়েরি আর আনা ফ্রাঙ্ক যেন সমার্থক। আনা ফ্রাঙ্ক নামের দূর ইউরোপের এক কিশোরী পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশজুড়েও। এমনকি স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরাও জানে আনার কথা। গোপন আস্তানায় পালিয়ে থাকার সময় আনার একমাত্র বন্ধু হয়ে উঠেছিল তার প্রিয় ডায়েরিটি। যার নাম সে দিয়েছিল ‘কিটি’। ডায়েরিটি সে উপহার পেয়েছিল তার জন্মদিনে। আনার ইচ্ছে ছিল ডায়েরিটি থেকে বই করার। আনা হতে চেয়েছিল সাংবাদিক অথবা লেখক। আনার সেই স্বপ্ন এমন বিপুলভাবে পূরণ হবে আনা নিজেও হয়তো কল্পনা করতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ২৫ জুন প্রকাশিত হয় আনার ডায়েরির প্রথম সংস্করণ। বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দেয় ১৩ বছর বয়সী এই মেয়েটির বিস্ময়কর পরিণত লেখনী।
বহু ভাষায় অনূদিত হয় বইটি। আনার ডায়েরি অবলম্বনে তৈরি হয় ছায়াছবি ডায়েরি অব আনা ফ্রাঙ্ক। আনা অবশ্য এসবের কিছুই দেখে যেতে পারেনি। আনার জীবনের এই করুণ পরিণতিই হয়তো তাকে নিয়ে আসে সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি। আনা হয়ে ওঠে এমনকি বাংলাদেশেরও চেনা একজন। দিনের পর দিন গোপন কুঠুরিতে থেকে বিপর্যস্ত সেই কিশোরীর স্মৃতি ফিরে এল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে। আমস্টারডামের আনা ফ্রাঙ্ক হাউস ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহায়তায় জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে চলছে ‘আনা ফ্রাঙ্ক: এ হিস্ট্রি ফর টুডে’ শিরোনামের প্রদর্শনী। পৃথিবীর নানা প্রান্ত ঘুরে কীভাবে বাংলাদেশে এল এই প্রদর্শনী?
ঘটনা গত বছরের অক্টোবর মাসের। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর গিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডসে এশিয়া ও ইউরোপের সংস্কৃতিমন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। তাঁর বহুদিনের ইচ্ছে ছিল আমস্টারডামে আনা ফ্রাঙ্কের জাদুঘর দেখার। সেখানে গিয়ে জানলেন আনা ফ্রাঙ্কের একটি প্রদর্শনী নেদারল্যান্ডসের বাইরেও যাচ্ছে। প্রদর্শনী নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে গেল, যখন শুনলেন সেটি ভারত আর শ্রীলঙ্কাতেও যাবে। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেই আমস্টারডামের আনা ফ্রাঙ্ক হাউস কর্তৃপক্ষ হয়তো দোনামনা করছিল খানিকটা। আসাদুজ্জামান নূর তাদের বোঝালেন। সঙ্গে যোগ দিলেন প্রবাসী ব্যাংকার হাসিব হক। আয়োজন সফল করতে এগিয়ে এল জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও।
হাসিব হক সাত বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসে। সে বয়সেই বাবার মুখে শুনেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গল্প। হাসিবের জানা ছিল আনা ফ্রাঙ্কের কথাও।

default-image

‘সেই শুরু থেকে আর সবার মতো আনা ফ্রাঙ্কের প্রতি অদ্ভুত একটা মমতা ছিল। আনা ফ্রাঙ্ক মিউজিয়ামের আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক পরিচালক ইয়ান এরিখকে আমরা প্রথম প্রস্তাবটা পাঠাই। বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে আমরা যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছি।’ বলছিলেন হাসিব।

default-image

প্রদর্শনী নিয়ে সামনের পরিকল্পনা কী? আসাদুজ্জামান নূর বলছিলেন, ‘নাৎসিদের চালানো হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে একাত্তরে পাকিস্তানিদের বর্বরতার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে, যে বর্বরতা থেকে এমনকি শিশুরাও রেহাই পায়নি। সে কারণেই এই প্রদর্শনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে যুক্ত করার কথা ভেবেছি। আনা ফ্রাঙ্ক হাউস কতৃপক্ষ ঢাকার প্রদর্শনীতে এত মানুষ আসতে দেখে অবাক হয়েছে। এখন তারা প্রদর্শনীটি নিয়মিত করতে চায়। ইচ্ছে আছে আগামীবার এই প্রদর্শনীকে ঢাকার বাইরেও নিয়ে যাওয়ার।’
হাসিব হক জানালেন, সামনের বার প্রদর্শনীটি পুরোপুরি বাংলা ভাষায় করার ইচ্ছে তাদের। যেখানে শর্ট লাইফ অব আনা তথ্যচিত্রটিও বাংলায় ডাব করা হবে। এতে এটি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে বলে আশাবাদী হাসিব।

default-image

আনা ফ্রাঙ্কের দুনিয়ায়
জাদুঘরের নিচতলায় নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে আনা ফ্রাঙ্কের মুখচ্ছবি। ছবিটা এমন এক সময়ে তোলা, যখন আনার জীবনে বিভীষিকা নেমে আসেনি। প্রদর্শনীজুড়ে আছে আনা ফ্রাঙ্কের পুরো জীবন। ১৯২৯ সালের ১২ জুন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে জন্ম, নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে আসা, গোপন কুঠুরির জীবন, তার লেখক হওয়ার বাসনা—সবকিছু।
নানা বয়সী মানুষ ঘুরে দেখছিলেন প্রদর্শনী। সেখানে তরুণ আর কিশোরদের সংখ্যাই বেশি। পাশেই চলছিল শর্ট লাইফ অব আনা শিরোনামের তথ্যচিত্রের প্রদর্শনী। সেখানেও দেখা গেল বেশকিছু আগ্রহী দর্শক। তন্ময় হয়ে তাঁরা দেখছেন আনার ছোট্ট কিন্তু অসামান্য অর্থবহ জীবনের গল্প।
আনা নামের এক কিশোরীর জন্য বাংলাদেশের মানুষের মমতার নজির ্মিলবে প্রদর্শনীর মন্তব্য খাতায়। ঢাকার বাসাবো থেকে আসা আবদুর রহমান যেমনটি লিখেছেন, ‘পৃথিবীর মানুষ অনন্তকাল অানাকে ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করবে। অানার জন্য অনেক ভালোবাসা।’

default-image

তথ্য কণিকা
১. ১৯৪২ সালের ১২ জুন জন্মদিনে আনা ফ্রাঙ্ক লাল-সাদা চেকের একটা ডায়েরি উপহার পেয়েছিল। জন্মদিনের কিছুদিন পর জার্মানিতে তলব করা হলে আনার পুরো পরিবার একটা গোপন জায়গায় লুকাতে বাধ্য হয়। আনা সেই গোপন কুঠুরিতে (অ্যানেক্স) অনেক কিছুর সঙ্গে তার ডায়েরিটাও নিয়ে যায়।
২. গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকার সময় একটা প্রিয় বই পড়তে পড়তে আনা ভাবে সেও এই সময়টার কথা লিখে রাখবে। সে তার কাল্পনিক বন্ধু ‘কিটি’কে চিঠির মতো করে পুরো ঘটনা বলবে যে তার কল্পনার বাকি বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের।
৩. ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্টে যখন আনাদের গোপন আস্তানার সবাই গ্রেপ্তার হয়, তখন মৃত্যু যেন আগে থেকে নির্ধারিতই ছিল। তারও এক বছর পর যখন শুধু আনার বাবা ওটো ফ্রাঙ্ক বাদে বাকিদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত, তখন ওটো ফ্রাঙ্ক তাঁর মেয়ের ডায়েরিটি পান। ওটো ফ্রাঙ্কের হাত ধরেই আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি প্রথম বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৫ জুন।
৪. আনা ফ্রাঙ্ক তার ডায়েরিতে সে সময়ের ঘটনাগুলো এত চমৎকার আর নির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে বইটি একটি ১৩ বছরের বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে শুরু হয়েছিল এটা বিশ্বাস করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
৫. নেদারল্যান্ডসে প্রকাশের পাঁচ বছর পর ১৯৫২ সালে আমেরিকাতে প্রথমবার যখন আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি প্রকাশিত হয়, তখন বইটি প্রথম মুদ্রণে পাঁচ হাজার কপি, দ্বিতীয় মুদ্রণে ১৫ হাজার কপি আর তৃতীয় মুদ্রণে ৪৫ হাজার কপি প্রকাশিত হয়। এরপর লাখ লাখ লোক বইটি পড়তে শুরু করে।
৬. দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ রোবেন দ্বীপে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ত। বইটি একই সঙ্গে আমাদের যেমন উৎসাহ দিয়েছে, উদ্দীপনা জাগিয়ে রেখেছে, ঠিক সেভাবেই আমাদের শক্তি দিয়েছে এটা বিশ্বাস করতে, স্বাধীনতা আসবেই।’
সূত্র: আনাফ্রাঙ্ক ডট ওআরজি
গ্রন্থনা: দিলরুবা শারমিন

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন