বাবা যাঁদের প্রেরণা

বিজ্ঞাপন
>জুন মাসের তৃতীয় রোববার পালন করা হয় বাবা দিবস। এবারের বাবা দিবসে আজ পড়ুন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তিন ব্যাটসম্যানের বাবাদের গল্প।
default-image

জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা
শচীন টেন্ডুলকার

default-image

১৯৯৯ বিশ্বকাপ খেলতে আমি তখন ইংল্যান্ডে। স্ত্রী অঞ্জলি যখন বাবার মৃত্যুর খবরটা পেল, আমি তখনো কিছু জানতাম না। অঞ্জলি চেয়েছিল, খবরটা সে নিজেই আমাকে দেবে। আমার দুই সতীর্থ রবিন সিং ও অজয় জাদেজাকে ফোন করে সে বলেছিল, ওরা যেন দরজার বাইরে অপেক্ষা করে। গভীর রাতে লেইসিস্টারে টিম হোটেলে এসে হাজির হলো অঞ্জলি। পরদিন জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আমাদের ম্যাচ। মাঝরাতে দরজা খুলে অজয় আর রবিনের সঙ্গে অঞ্জলিকে দেখেই বুঝতে পারলাম, গুরুতর একটা কিছু ঘটেছে। কিন্তু অঞ্জলির কথা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। কয়েক মিনিটের জন্য অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম। মুখে কোনো কথা আসছিল না। বাবা সব সময় আমার পাশে ছিলেন। অঞ্জলিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। বড্ড অসহায় লাগছিল।

প্রথমেই মাথায় এল, যত দ্রুত সম্ভব ভারতে ফিরতে হবে। মায়ের সঙ্গে এবং শেষবারের মতো বাবার সঙ্গে দেখা করতে হবে। ফেরার সময় সারাটা পথ আমি বাবার কথা ভাবছিলাম। বিশ্বকাপের জন্য বাড়ি ছাড়ার আগেও বাবাকে সুস্থ দেখে গেছি। এমনকি আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না বাবা বেঁচে নেই, মনে হচ্ছিল, ভারতে ফিরেই দেখব তিনি আবার চোখ খুলেছেন। কয়েক মাস আগেই বাবার এনজিওপ্লাস্টি করা হয়েছে। বাবা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, যেন অঞ্জলি তাঁর সেবা করতে পারে। আমি যখন বিশ্বকাপের জন্য বাড়ি থেকে বিদায় নিই, তখন তাঁর শরীর যথেষ্ট ভালো ছিল। এমনকি তিনি সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতে পারছিলেন। আর কোনো দিন তাঁকে দেখব না, খবরটা কিছুতেই হজম হচ্ছিল না।

আমার ভাই ও বন্ধুরা মুম্বাই বিমানবন্দরে এসেছিল আমাকে নিতে। সাধারণ সময়ের চেয়ে এই ফেরাটা ছিল একেবারেই অন্য রকম। বাড়ি ফিরে মাকে দেখে মনে হলো, এর মধ্যেই তাঁর বয়স অনেক বেড়ে গেছে। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে ছিলেন তিনি। প্রায় কারও সঙ্গেই কথা বলছিলেন না। মাকে এভাবে দেখে আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। দাদির মুখোমুখি দাঁড়ানো আমার জন্য আরও কঠিন ছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ছেলের সঙ্গে তিনি কিছুটা একাকী সময় কাটাতে চান। সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘরের সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম। বাবার মৃতদেহের সঙ্গে ছিলাম কেবল আমি আর দাদি। মনে আছে, আমি দাদির কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, যেন তিনি ছেলের সঙ্গে শোক করতে পারেন।

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাকে হারিয়ে অনেকগুলো রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। বাবাকে হারানোর পর জীবনটা কখনো আর আগের মতো হওয়ার সুযোগ ছিল না।

ভারতে চার দিন কাটিয়ে কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রাক্কালে আমি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে দলের সঙ্গে যোগ দিলাম। মনে হচ্ছিল, বাবা হয়তো এটাই চাইতেন। তাই বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো খেলতে লন্ডনের ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করিনি। মানসিকভাবে, টুর্নামেন্টজুড়ে আমি আমার সেরাটা দিতে পারছিলাম না। অনুশীলনের সময় কালো সানগ্লাস পরে থাকতাম। কারণ হঠাৎ হঠাৎ আমার চোখে পানি চলে আসত। যদিও কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আমি সেঞ্চুরি করেছিলাম, যেটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরিগুলোর মধ্যে একটি, যেটা আমি আমার বাবাকে উৎসর্গ করেছিলাম।

সূত্র: শচীন টেন্ডুলকারের আত্মজীবনী: প্লেয়িংইটমাইওয়ে

default-image

আমি যা, পুরোটাই বাবার অবদান
ব্রায়ান লারা

default-image

ছেলেবেলায় ক্রিকেট ভীষণ ভালোবাসতাম। ফুটবলও খেলতাম। এমনকি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর ছোটদের ফুটবল দলেও খেলেছি। বাবা ক্রিকেটপাগল ছিলেন। তিনি কখনোই তাঁর ইচ্ছা আমার ওপর চাপিয়ে দেননি। তবে মনে আছে, একবার সরাসরি না বলেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আমার কাছে তিনি কী চান। ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল দল একবার ভেনেজুয়েলায় যাচ্ছিল। অন্যদিকে হার্ভার্ড কোচিং ক্লিনিক (যেখানে আমি ক্রিকেট খেলা শিখতাম) তখন বারবাডোজে যাচ্ছিল ক্রিকেট খেলতে। বাবা বললেন, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই ভেনেজুয়েলায়।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছে। তা খেলার সব সরঞ্জাম তোমার আছে?’ বললাম, ‘না।’ বাবা বললেন, ‘যদি তোমার একটা ক্রিকেট ব্যাট দরকার হয় তো বোলো। এ ছাড়া আর কিছু শুনতে চাই না।’ সুতরাং, একটা ব্যাটের লোভে আমাকে বারবাডোজেই যেতে হলো। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানো হয়নি। বুড়ো লোকটা বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর বাকি ছয় ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না (হাসি)। তা ছাড়া মেয়েদের ক্রিকেট তখন এতটা জনপ্রিয় ছিল না। একজন তরুণ ক্রিকেটার তৈরি করার সুযোগ বাবা হাতছাড়া করতে চাননি।

প্রথম যেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলার...না ভুল বললাম, খেলার সুযোগ তখনো হয়নি, তবে প্রথম যেবার আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের একজন ক্রিকেটারের মর্যাদা পেলাম, সেই দিনটার কথা মনে আছে। ১৯৮৯ সাল। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনূর্ধ্ব-২৩ টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে বেশ ভালো খেললাম। আমার বয়স তখন মাত্র ১৯। খেলার পাশাপাশি একটা দোকানে কাজ করতাম। একদিন আমার এক সহকর্মী ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার বাবা কথা বলতে চান।’ ফোনের ওপাশে বাবা চিৎকার করে কী যে বলছিলেন, প্রথমে বুঝতেই পারিনি। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি কি দলের খবর শুনেছ?’ আমি বললাম, ‘কোন দল! কিসের দল!’ তিনি আবারও বললেন, ‘তুমি দলের কথা শোনোনি?’ আবারও বললাম, ‘কিসের দল?’ বাবা বললেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল।’ বললাম, ‘না, শুনিনি তো।’ বাবা বললেন, ‘তুমি দলে আছ!’

বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমার বুড়ো বাবার স্বপ্নপূরণ হয়েছে। সান্তা ক্রুজে ফিরে দেখি, বাবা তাঁর বন্ধুদের নিয়ে পার্টি শুরু করেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরের টেস্ট ম্যাচ ছিল ত্রিনিদাদে, ভারতের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে চূড়ান্ত একাদশে আমার জায়গা হয়নি। এদিকে বাবা এসেছিলেন কয়েকটা টিকিটের আশায়। ম্যানেজার ক্লাইভ লয়েডকে বলে বাবার বন্ধুদের জন্য কয়েকটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দিলাম। ‘কাল দেখা হবে,’ বলে বাবার কাছে বিদায় নিয়ে টিম হোটেলে উঠলাম।

দুর্ভাগ্যক্রমে সে রাতেই হার্ট অ্যাটাকে আমার বাবা মারা যান। তখনকার দিনে টেস্ট ক্রিকেটে ‘রেস্ট ডে’ বলে একটা দিন ছিল। আমার পরিবার ঠিক করল, সেদিনই বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠান হবে। যে মানুষটা তাঁর জীবনের সবটুকু দিয়ে ১১ ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছেন, তাঁকে শেষশ্রদ্ধা জানাতে সেদিন সান্তা ক্রুজের ছোট্ট গ্রামটাতে হাজির হয়েছিল পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। স্যার ভিভ রিচার্ডসসহ পুরো দল যেই ব্লেজার পরে ছিল, সেই একই ব্লেজার ছিল আমার গায়ে। আজ আমি যা, পুরোটাই বাবার অবদান।

সূত্র: ২০১৭ সালে এমসিসি স্পিরিট অব ক্রিকেট কাউড্রে লেকচারে ব্রায়ান লারার বক্তৃতা

default-image

যে সেঞ্চুরি বাবার জন্য
এবি ডি ভিলিয়ার্স

default-image

ভাই, বন্ধু ও স্কুলের বাইরে আমার জীবনে যাঁদের প্রভাব সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, তাঁরা অবশ্যই আমার মা-বাবা। যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে আমাকে ভালোবেসেছেন, আর কেবল দিয়েই গেছেন। বাবা এবি আর মা মিলি বিয়ে করেছিলেন তুলনামূলক কম বয়সে। বিবাহিত জীবনে তাঁরা খানিকটা থিতু হন বাবা ওয়ার্মবাথে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করার পর।

বাবা সব সময় ব্যস্ত ছিলেন। একজন ডাক্তার হিসেবে বাবার কাছে সব সময় রোগী আসত। অতএব অধিকাংশ সময় আমার খেলা দেখার সুযোগ বাবার হতো না। যখন তিনি খেলা দেখতে আসতেন, অন্য মা-বাবাদের সঙ্গে সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এই বিরল মুহূর্তগুলোতে আমি তাঁকে গর্বিত করার সুযোগ হারাতে চাইতাম না।

হাইস্কুল পেরোনোর পর আমি ক্রীড়াবিজ্ঞান পড়ার জন্য লিনউড রোডের ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়ায় ভর্তি হলাম। মানবদেহের গঠনতন্ত্রও ছিল আমার কোর্সের অংশ। এই অংশটা আমার কাছে বেশ লাগত, কারণ শিক্ষক ক্লাসে যা শেখাতেন, বাড়ি ফিরে আমি আমার চিকিৎসক বাবার সঙ্গে সে ব্যাপারে আলোচনা করতে পারতাম। মনে আছে তখন আমার খুব গর্ব হতো।

২১ মার্চ, ২০০৯। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তখন আমাদের টেস্ট ম্যাচ চলছে। আগের দিন ৩৯ রানে অপরাজিত আমি সেদিন বাড়তি প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম, কারণ আমি জানতাম, গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে বসে বাবা খেলা দেখছেন। তখন ক্রিকেট দেখার সময় তাঁর একেবারেই হতো না। এই একটা দিন কীভাবে যেন সময় বের করেছিলেন। আমি খুব চাইছিলাম, যেন তাঁর মাঠে আসাটা সার্থক করতে পারি।

আমাদের দুটি উইকেট পড়ে গেল দ্রুত, আমি তখনো টিকে আছি। কভারের দিকে একটা বল ঠেলে দিয়ে সেঞ্চুরি করলাম, এরপর স্ট্রোক খেলতে শুরু করলাম। বন্ধু অ্যালবি মরকেলের সঙ্গে ব্যাটিংটা তখন উপভোগ করছিলাম।

অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড যখন মিডিয়াম পেস নিয়ে হাজির হলো, আমার রান তখন ১১৭। আত্মবিশ্বাস প্রবল। ওভারের প্রথম বলেই পুল করে ছক্কা হাঁকালাম। দ্বিতীয় বলটাও উড়ে গিয়ে পড়ল সীমানার ওপারে। তৃতীয় বলে ছয় হলো লং অন দিয়ে। মাঝ-পিচে অ্যালবির সঙ্গে যখন হাত মেলালাম, ওর চোখ তখন চকচক করছে। বলল, ‘শোনো, তোমার ছয় বলে ছয়টা ছয় মারার চেষ্টা করা উচিত।’

‘থামো অ্যালবস।’ আমি বললাম, ‘আমরা টেস্ট ক্রিকেট খেলছি, টি–টোয়েন্টি নয়।’

চতুর্থ বলটাও আমি দর্শকের মাঝখানে নিয়ে ফেললাম। চার বলে চার ছয়। দর্শক তখন চিৎকার করে আমাকে ছয়টি ছয় পেটাতে উৎসাহ দিচ্ছিল, কিন্তু সেটা হওয়ার ছিল না। পঞ্চম বলে আমি এগিয়ে এসে সোজা ড্রাইভ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অ্যান্ড্রু সেটা বুঝতে পেরে পায়ের কাছে একটা ইয়র্কার ছুড়ল। কোনোমতে কভারের দিকে বল ঠেলে দিয়ে ১ রান নিয়েছিলাম আমি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি ১৫০ পেরোলাম। আমাদের রান গিয়ে দাঁড়াল ৬২৩-এ, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ রান। শেষ পর্যন্ত ১৯৬ বলে ৭টি ছয় ও ১২টা চারের মারসহ ১৬৩ রান করে আমি আউট হই। প্যাভিলিয়নে ফেরার সময় দর্শক আমাকে সাধুবাদ জানাল ঠিকই, তবে আমি কেবল একজনের হাততালির শব্দই শুনতে পাচ্ছিলাম। সেই হাততালিটা আমার বাবার। টেস্টে এটা আমার নবম সেঞ্চুরি হতে পারে, তবে বাবার সামনে এটাই ছিল আমার প্রথম সেঞ্চুরি।

সূত্র: এবি ডি ভিলিয়ার্সের আত্মজীবনী: এবিদ্যঅটোবায়োগ্রাফি

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. সাইফুল্লাহ 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন