আজ ভালোবাসার দিন। সে উপলক্ষেই এই পাঠকের ভালোবাসার গল্পসংখ্যার আয়োজন। ডাকযোগে, ই-মেইলে এমনকি ফেসবুকে বেশ কিছু গল্প পেয়েছি আমরা। সেখান থেকে নির্বাচিত কিছু গল্প নিয়েই এবারের ছুটির দিনে।

default-image

যে করেই হোক আজ বিশটা টাকা বাঁচাতেই হবে। ভাগ্য আজ সহায়, বাজার করার কথা নয় শরিফ সাহেবের। সুযোগ যখন পেয়েছেন, এটা কাজে লাগাতেই হবে। প্রতিদিনের বাজার, সবটাই মোটামুটি হিসাব করা। টাকা বাঁচানো খুব কঠিন। প্রচুর দামাদামি করতে লাগলেন তিনি। বিক্রেতারা অবাক, এমন মানুষ তো নন শরিফ সাহেব। অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত পাঁচ টাকা বাঁচাতে পারলেন। দুঃখের মধ্যেও হাসি পেল তাঁর। একসময় পাঁচ-দশ টাকার কোনো মূল্য ছিল না তাঁর কাছে। আজ অনেক মূল্য। বাজার নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন শরিফ সাহেব। খুব দূর নয়, বিশ টাকা রিকশা ভাড়া তো বাঁচবে। হাঁটতে শুরু করলেন। ৬৫ বছরের শরীর চলতে চায় না। একটা দলা পাকানো কষ্ট উঠে আসে গলার কাছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কষ্টটা গিলে ফেলেন তিনি। প্রথম প্রথম অনেক কেঁদেছেন। যখন নিজের ছেলে, শরিফ সাহেব ও তাঁর স্ত্রী সহেলীকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে গেল তখন। স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদেছেন। ব্যাগটা হাতবদল করে পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে ঘাম মুছলেন শরিফ সাহেব। এই শীতেও ঘামছেন তিনি।
২.
সহেলী বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছেন। এতক্ষণে চলে আসার কথা। এত দেরি হচ্ছে কেন? অসুস্থ হয়ে গেল না তো মানুষটা? বাজার করার কথা ছিল না। বৃদ্ধাশ্রমের কেয়ারটেকারকে বলে কয়ে নিজেই আগ্রহ করে গেলেন। বাজার থেকে ফিরলে ওনার পাঞ্জাবিটা ধুয়ে দেবেন সহেলী। পরশু একমাত্র নাতনিটা দেখতে আসবে তাঁদের। গতবার এসে বড় বড় চোখ করে বলেছিল, ‘গ্র্যানি, তোমরা চলে এসো প্লিজ, আমার ঘরটা ছেড়ে দেব তোমাদের।’ এ কথা শুনে একটুও বিব্রত হয়নি ছেলে। বৃদ্ধাশ্রমে দেওয়ার জন্য আনা টাকাটা আবার গুনে নিয়েছিল শুধু। ফেলে আসা জীবনের কথা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা, ছেলেকে আদরে মানুষ করার কথা, কিছু মনে করতে চান না সহেলী। ইরেজার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলতে চান স্মৃতিগুলো। তবে ভাবেন বিয়ের আগের কথা। শরিফ তখন কি পাগলামিই না করতেন। একবার এক মাসের জন্য মামাবাড়ি গিয়েছিলেন সহেলী, সেখানে গিয়ে হাজির শরিফ। তা-ও ফেরিওয়ালার বেশে। এখনো মনে পড়লে বুকে কাঁপন জাগে। কিন্তু আজ এত দেরি হচ্ছে কেন?
৩.
শরিফ সাহেব হাঁটছেন। মনে হচ্ছে দশ মিনিটের পথ আধা ঘণ্টা লাগবে। মাঝে মাঝে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। পথ আর বেশি বাকি নেই। সামনের মোড়টা পার হয়ে একটা গলি পার হলেই গন্তব্য। মোড়েই ফুলের দোকান। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে দুটি লাল গোলাপ বেছে নিলেন শরিফ সাহেব। ছোকরা দোকানি ম্যাচের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘এক দাম ৬০ টাকা। ৩০ টাকা পিস।’

‘কেন? দশ টাকা করে না?’ দুর্বল গলায় বললেন শরিফ সাহেব।
‘আঙ্কেল জানেন না? আজকে ভালোবাসা দিবস। রেট বাইড়া গেছে। এক দাম, নিলে নিবেন না নিলে নাই।’
বাজার থেকে বাঁচানো ৫ টাকা, রিকশা ভাড়া বাঁচানো ২০ টাকা, হলো ২৫ টাকা। মনে মনে হিসাব কষে ম্রিয়মাণ গলায় বললেন শরিফ সাহেব, ‘একটা তাহলে ২৫ টাকা দিই?’
‘না, হবে না।’ নির্লিপ্ত উত্তর দোকানির।
আকাশের দিকে তাকালেন শরিফ সাহেব। বাজারের ব্যাগটা হাতবদল করলেন। না, কারও প্রতি আজ আর কোনো অভিযোগ নেই তাঁর।
‘আঙ্কেল নিয়ে যান।’ দুকদম পেরোতেই ডাক দিল ছেলেটা। কী জানি, ঘামে ভেজা শরীর দেখে মায়া হলো নাকি...। শরিফ সাহেব পাঞ্জাবির পকেটে পুরে নিলেন গোলাপটা, পরম যত্নে।

৪.
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন সহেলী। শরিফ সাহেব হাসিমুখে ঢুকলেন। পকেট থেকে গোলাপটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘শুভ বিবাহবার্ষিকী সোনা বউ।’
চোখে টলমল করতে থাকা জলটা টুপ করে পড়েই গেল সহেলীর। ঘামে ভেজা পাঞ্জাবিটা দেখেই বুঝে গেলেন সবটুকু। কপট রাগে বললেন, ‘তুমি, তুমি একটা পাগল।’ শরিফ সাহেব ফিরে গেলেন চল্লিশ বছর আগের এই দিনটিতে।
তনুশ্রী দেবনাথ
বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন