default-image
>

বিসিএসে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। চাকরিতে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। তবে যেতে হবে আরও বহু দূর।

বর্তমানে দেশের চাকরির বাজারে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) চাকরি প্রথম স্থান দখল করে আছে। আর এই বিসিএসে ভালো করছেন নারীরা। বিসিএসের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়ে সচিব, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় দায়িত্ব পাচ্ছেন নারীরা। বিসিএসেও প্রথম হচ্ছেন। ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসনে প্রথম স্থান অধিকার করেন মুনিয়া চৌধুরী। ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষার পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেন সুবর্ণা শামীম। ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে দেশসেরা হয়েছিলেন নীলিমা ইয়াসমিন। এই চিত্রই বলে দেয় বিসিএসে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। কেবল বিসিএসে প্রথম হওয়া নয়, বিসিএসে নারীদের অংশগ্রহণের হারও বাড়ছে দিন দিন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক নারী বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করেন। দিন দিন সেই সংখ্যা বেড়েই চলছে। ৩২তম বিসিএসে চাকরির সুপারিশ পাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ। সর্বশেষ ৩৯তম চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ বিসিএসে চাকরির সুপারিশ পাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া ৩৩তম বিসিএসে চাকরির সুপারিশ পাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ শতাংশ। ৩৪তম বিসিএসে চাকরি পাওয়া নারীর সংখ্যা ছিল ৩৬ শতাংশ। অথচ আগের বিসিএসগুলোয় ২২ থেকে ২৮ শতাংশ নারী চাকরি পেতেন।

২০১৭ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় সারা দেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন দুই লাখ ১১ হাজার ২৮২ জন, যার এক-তৃতীয়াংশ নারী। সুপারিশকৃত প্রার্থীতালিকায় ১ হাজার ৭১৪ জন পুরুষের বিপরীতে নারী ছিলেন ৬০৯ জন, যা শতকরা হিসাবে ছিল ৩৩ দশমিক ১৩।

এর আগে ৩২তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় পুরুষের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন নারীরা। ৭৫২ জন পুরুষের বিপরীতে চূড়ান্ত সুপারিশ তালিকায় নারীর সংখ্যা ছিল ৯২৩, যা শতকরা হিসাবে ৫৫ দশমিক ১০। ৩৩তম বিসিএসে চূড়ান্ত সুপারিশ তালিকায় নারীর সংখ্যা ছিল ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ৩৪তম বিসিএসে ৩৫ দশমিক ৬২ এবং ৩৫তম বিসিএসে ২৭ দশমিক ৯২। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে যে ২ হাজার ২০ জন নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৬৯৯ জনই নারী। শতকরা হিসাবে যা ৩৪ দশমিক ৬। এই বিসিএসে কেবল সংখ্যায় নয়, শিক্ষা বাদে ২০টি ক্যাডারে নিয়োগ পরীক্ষার মধ্যে আটটিতেই প্রথম হয়েছে নারীরা। আর শিক্ষার ৩০টি বিভাগের মধ্যে ১৩টিতেই প্রথম হয়েছেন নারী প্রার্থী। বেশ কিছু ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শতভাগই আবার নারী।

একটি বিসিএসের চিত্র

৩৪তম বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ২৭৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১০৭ জনই নারী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে এত বিপুলসংখ্যক নারী নিয়োগ পান। এ ছাড়া প্রথম ১০ কর্মকর্তার মধ্যে নারী ছয়জন। প্রশাসন ক্যাডারের প্রথম ১০ জনের মধ্যে প্রথমে আছেন মুনিরা চৌধুরী। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানও নারীর দখলে। তাঁরা হলেন সাঈদা পারভীন ও সাইয়েমা হাসান। ষষ্ঠ স্থানে মাহমুদা বেগম, অষ্টম স্থানে কোহিনুর জাহান এবং নবম স্থান দখল করেছেন রাবেয়া আক্তার। প্রশাসনের বাইরে শিক্ষা ক্যাডারে বিভিন্ন শাখায় মোট নিয়োগ দেওয়া হয় ৭৪৭ জনকে। তাঁদের মধ্যে নারী ২৮৮ জন। অর্থাৎ ৩৮ শতাংশেরও বেশি নারী নিয়োগ পেয়েছেন এই ক্যাডারে। তথ্য ক্যাডারের তিনজন কর্মকর্তার মধ্যে দুজনই নারী। তাঁরা হলেন মারুফা রহমান ও তানিয়া আক্তার। কৃষি ক্যাডারে মোট ২৫৯ জনের মধ্যে ৯০ জন নারী। পুলিশ ক্যাডারে মোট ১৪২ জনের মধ্যে নারী ২৫ জন। পররাষ্ট্র ক্যাডারে মোট ২১ জনের মধ্যে নারী নয়জন। স্বাস্থ্য ক্যাডারে নারীদের সাফল্যের হার আরও বেশি। সহকারী সার্জন ১৭৯ জনের মধ্যে ৭৫ জনই নারী।

সংগ্রাম করে প্রথম

৩৪তম বিসিএসে প্রশাসনে মুনিয়া চৌধুরী বলেন, ‘প্রথম বিসিএসেই আমি সফল হয়েছি। এতে মেধার দরকার হয়। প্রস্তুতি থাকতে হয় ও সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদও দরকার হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর আমি পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ বিষয়ে আমার দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর শেষ করি। সেটা শুরু করার আগে থেকেই আসলে আমি বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকে চাকরিতে যোগদানের সময় পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর সময় লেগেছিল। এই সাড়ে তিন বছরে আসলে আমি পড়ালেখার ভেতরেই ছিলাম। এর মধ্যেই দ্বিতীয় মাস্টার্স করা, শিক্ষকতা এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র অফিসার হিসেবেও কাজ করেছি।’

মুনিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন চাকরি করলেও মনটা সব সময় পড়েছিল ক্যাডার সার্ভিসের দিকেই। বিসিএসে উত্তীর্ণ হতে হলে এই প্যাশন থাকতেই হবে। শুধু পড়লেই হবে না।’

৩৬তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম সুবর্ণা শামীম বলেন, নারীদের জন্য বিসিএসে ভালো করাটা পুরুষদের চেয়ে কঠিন। যে সময় লাগে বিসিএসে, তাতে নারীরা সংসার শুরু করে দেন। অনেক সময় সন্তানও হয়ে যায়। সব সামলে আবার বিসিএসে ভালো করাটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তবে বিসিএসের মাধ্যমেই একজন নারী মাঠপর্যায়ে যেমন কাজের সুযোগ পান, তেমনি শীর্ষ পর্যায়েও নীতিনির্ধারণে অনেক ভূমিকা রাখতে পারেন।

৩৯তম বিসিএসে প্রথম হওয়া নীলিমা ইয়াসমিন যখন সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন বিয়ে হয়। বিয়ের পর সংসারের চাপ তো আছেই। তিনি বলেন, ‘নিজের পড়াশোনাটা করে গিয়েছি ঠিকমতো। আর তার ফলও পেয়েছি হাতেনাতে। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক নিয়েছিলাম সেরা ফলের জন্য। নিজের ফলাফল দেখে কিছুটা অবাক হলেও আবেগে ভাসিনি। ভালো পরীক্ষা দিয়েই তো এ ফল পেয়েছি।’

এগিয়ে যেতে হবে আরও সামনে

নারীরা বিসিএসে ভালো করছেন। নারীদের অনেকে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, এমনকি সচিবও হয়েছেন। বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেই তাঁরা এসব পদ পাচ্ছেন। তবে এই হার আরও বাড়তে হবে বলে মনে করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, নারীরা এখন বিসিএসের মাধ্যমে দায়িত্বশীল পদে আসছেন। তাঁরা সুযোগ নিয়েছেন ও প্রমাণ করেছেন চ্যালেঞ্জিং ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁরা কাজ করতে পারেন। তাঁদের যুক্ততার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের পথ তৈরি হচ্ছে, তবে এখনো সমতা আসেনি।

পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক বললেন, বিসিএসে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে বেশি চাকরি পাচ্ছেন। এর মাধ্যমে দেশের জন্য কাজ করছেন তাঁরা। তবে এই হার আরও বাড়াতে হবে। এসব পেশায় নারীদের আরও উৎসাহ দিতে হবে।

পঞ্চম বিসিএসের ক্যাডার সরকারের সাবেক সচিব আক্‌তারী মমতাজ বললেন, ‘আমাদের সময় নারী ক্যাডারের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। নারীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেওয়ার আগে ভাবা হতো পারবে কি না। কিন্তু পুরুষের বেলায় সেটা ভাবা হতো না। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আমি নিজেও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছি। নারীরা যদি উন্নয়নের অংশীদার হতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রের সম উন্নয়ন হবে না। তাই নারীদের কাজের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন