মানবতাবিরোধী অপরাধ

বীর সাক্ষী ১৪৪ নারী

বিজ্ঞাপন
default-image

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা রাজাকার আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন এক নারী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ওই নারী বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কীভাবে তাঁর বাবা, মা, ভাই-বোনকে তাঁরই চোখের সামনে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত ওই নারীর সাক্ষ্যকে আমলে নেন। রাজাকার কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দেন আদালত। সেই রায় কার্যকরও হয়েছে।

মৌলভীবাজারের চারজন রাজাকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দেন ধর্ষণের শিকার চারজন নারী। তাঁদের সাক্ষ্যে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের সময় কীভাবে পৈশাচিক কায়দায় হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ধর্ষণ করেন, নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৌলভীবাজারের রাজাকার আকমল আলীসহ চারজনের গত বছরের ১৮ জুলাই ফাঁসির রায় দেন ট্রাইব্যুনাল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, রাজাকার কাদের মোল্লা অথবা মৌলভীবাজারের রাজাকার আকমলদের বিরুদ্ধে শুধু নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের ৪১টি মামলায় ১৪৪ জন নারী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে বীরাঙ্গনা (বর্তমানে বীরাঙ্গনা নারীদের সরকার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে) নারীর সংখ্যা ৮০ জন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অপরাধ তদন্ত সংস্থার হিসাবমতে, জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মামলায় তিনজন ধর্ষণের শিকার নারী, সৈয়দ মোহাম্মদ হুসাইনের মামলায় ৩ জন ভুক্তভোগী নারী, জাহীদ হোসেন খোকনের মামলায় ১৪ জন নারী এবং আকমল আলী তালুকদারের মামলায় চারজন নারীসহ অন্যরা সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান বললেন, সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার বীরাঙ্গনা ৮০ জন নারী মানবতাবিরোধী অপরাধের ৪১টি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যাঁদের সাক্ষ্য আসামিদের বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ প্রমাণ করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। 

অসীম সাহসী সব নারী

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের পরতে পরতে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময় কীভাবে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বীরাঙ্গনা নারীদের পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ করেছিল। তাঁদের চোখের সামনে নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর বীভৎস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। সাহসী এসব নারীর সাক্ষ্যে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস, ছাত্রসংঘ ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের হিসাব।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রাখতে এসব ভুক্তভোগী নারী বিরাট ভূমিকা রেখেছেন বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। তিনি বলেন, একজন বীরাঙ্গনা নারী অনেক বাধা উপেক্ষা করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনেক নারী ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীর কাঠগড়ায় কেঁদেছেন। আদালতকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাছে বিবেচিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে এসব নারীর জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অপর প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। অর্থাৎ এসব ভুক্তভোগী নারীর সাক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংসতার ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা ইতিহাস হয়ে থাকবে চিরদিন।

তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান বলেন,‘ধর্ষণের শিকার কোনো নারী অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের কোনো কিছু বলতে না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মুক্তিযুদ্ধের সময় ভুক্তভোগী নারীদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তদন্ত সংস্থা সাহস জুগিয়েছে। ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে এসব নারী সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। তাঁরা জাতীয় বীর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতভাবে বলে গেছেন, বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনা নামটি দিয়ে ওই সব নারীকে সম্মানিত করে গেছেন। কিন্তু বীরাঙ্গনা নারীকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা দিতে হবে। যখনই কোনো ধর্ষণের শিকার নারীর মামলার রায় হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখি, যাতে ওই নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করে ভাতার ব্যবস্থা করে।’

আবদুল হান্নান খান জানান, ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ অনুযায়ী কয়েকজন বীরাঙ্গনা নারী, যাঁরা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা পেয়েছেন।

 তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভুক্তভোগী নারীসহ অন্য যেসব নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁরা বিরাট সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। ইতিহাসে তাঁদের সেভাবে মূল্যায়িত করা দরকার। আর আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে বীরাঙ্গনা নারীদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা দেওয়া উচিত এবং নিয়মিত তাঁদের ভাতার ব্যবস্থা করা হোক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন