default-image

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। মুষলধারে বৃষ্টি। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে আছি। বৃষ্টি আমার খুব প্রিয়। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা হাতে এসে পড়ছে। মা পাশে এসে দাঁড়াল।
‘সারা দিন বৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে থাকিস। ভিজিস তো না। সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কী আছে?’
আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলাম।
আমি কখনোই মায়ের প্রিয় ছিলাম না। আবার বৃষ্টি দেখতে লাগলাম। কী সুন্দর বড় বড় ফোঁটা! কিন্তু হাতে নিলেই শেষ।
রাতের বেলা খাওয়ার সময়ও বৃষ্টি থামল না। মা আমার প্যারালাইজড বাবাকে খাইয়ে আমার পাশে এসে বসল। মায়ের মুখে সারা দিনের কাজের ক্লান্তি। আমার খাওয়ার সময় মা সব সময় পাশে বসে। সন্তানের খাওয়ার সময় পাশে মা না থাকলে নাকি অকল্যাণ হয়। আমি চুপচাপ খাওয়া শেষ করলাম। ঘরে এসে শুলাম, কিন্তু ঘুম এল না। বৃষ্টি প্রায় ধরে এল বুঝি। চারদিকে নিস্তব্ধতা। ব্যাঙের ডাকও নেই। নিস্তব্ধতা খালি শব্দের অনুপস্থিতি নয়। কিছু নিস্তব্ধতা হাহাকারের মতো। এ নিস্তব্ধতাও মনে হচ্ছে সে রকম।
বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। আকাশে মেঘ ফুটে বেরোনো কতগুলো তারা। দেখি মা মোড়ায় বসে। মায়ের পাশে গিয়ে বসলাম। মায়ের গাল ভেজা। মায়ের বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
‘আমার বড় খোকা...’
আমারও দাদার কথা মনে পড়ল। আমার দাদা...
এমনই এক বৃষ্টির রাতে মা আমাকে ডেকে তুলেছিল। ধাক্কা দিয়ে আমাকে তুলে বলেছিল, ‘ও নীলু, তোর দাদা যেন কেমন করে।’
আমি দাদার ঘরে গিয়ে দেখি, দাদা তার বিছানায় ছটফট করছে। সঙ্গে সঙ্গে দাদাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম কিন্তু যেতে যেতে বড় দেরি হয়ে গেল।
দাদা আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিল। আমি তবু দাদাকে তুই করে বলতাম। মা রাগ করত।
‘বেয়াদব মেয়ে, কতবার বলেছি তুই করে বলবি না। এত বড় ভাইকে কেউ তুই করে বলে?’
কিন্তু দাদা রাগ করত না।
‘বলুক না মা, আমার ভালোই লাগে।’
দাদা মায়ের সবচেয়ে প্রিয় ছিল। মায়ের বিয়ে হয় অনেক ছোটবেলায়। তারপর বিয়ের এক বছরের মাথায় দাদার জন্ম। বাবা সারা দিন বাইরে। তখন দাদাই মায়ের সব। মা দাদা ছাড়া কিছুই বুঝত না। ভালো কিছু রান্না হলে দাদার জন্য তোলা থাকত আলাদা বাটিতে।
দাদা অনেক লাজুক ছিল। কখনোই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত না। লাল শাক দাদার ছিল সবচেয়ে প্রিয়। প্রতি বেলায় তার লাল শাক চাই, কিন্তু মাকে কখনোই বলত না। মা প্রতি বেলায় লাল শাক যেখান থেকে পারে জোগাড় করে রাখত।
দাদাও মাকে অনেক ভালোবাসত। মাকে তার সব কথা বলত। মায়ের অনেক নেওটা ছিল সে। মায়ের অসুখ হলে আমাদের সব ঠিক কিন্তু দাদার খাওয়াদাওয়া বন্ধ। মায়ের পাশে চুপ করে বসে থাকত। দাদা আর মা দুজনে ছিল বন্ধুর মতো। দুজনে পাশাপাশি বসলে ফিসফিস করে কথা বলত আর হাসত। সেই সময় আমার দাদার ওপর খুব হিংসা হতো। কিন্তু দাদা যে রেবা নামের অচেনা-অজানা মেয়ের জন্য গভীর ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিল, তা মা দাদার এত কাছে থেকেও জানতে পারেনি।
ভ্যানে বসে সেদিন মা দাদার মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। মায়ের চোখ থেকে টপটপ করে জল দাদার কপালে পড়ছিল। রাস্তায় অনেক কাদা জমেছিল। ভ্যানের চলতে অনেক সমস্যা হচ্ছিল। এর মধ্যে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমার এই প্রিয় বৃষ্টির মাঝে আমার অভিমানী দাদা মায়ের কোলে মাথা রেখে মারা গেল।
রেবা নামের মেয়েটার লেখা অনেকগুলো চিঠি মা দাদার তোশকের তলায় পেয়েছিল। মা চিঠিগুলো কোনো দিন পড়েনি। মাঝেমধ্যে মা চিঠিগুলো বের করে আর হাত বোলায়, ঠিক যেভাবে ভ্যানের ওপর দাদার মুখে হাত বুলিয়েছিল।
এরপর যে গভীর ভালোবাসা মা দাদার জন্য সঞ্চিত রেখেছিল, তার সবটুকু দিয়ে মা আমাকে তার কাছে টানল। আমার মাথা মায়ের কোলে। মায়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে আমার কপালে। আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। ঘরের ভেতরে কাশির শব্দ শোনা গেল। বাবা জেগেছে বোধ হয়...
সাকিব রহমান
[email protected]

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন