আমার মায়ের সারা জীবনের দুঃখ চাকরি করতে না পারা। সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও যোগ দিতে পারেননি তিনি। পেশার চেয়ে তখন সন্তানেরাই ছিল মুখ্য। মায়ের মতো যত্ন কি আর কেউ নিতে পারে? আম্মার চাকরি করা হলো না। ঘড়ির কাঁটা, ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে সত্তর দশক পেরিয়ে গেছে সেই কবে। সমস্যা সমস্যাই রয়ে গেছে। এখনো আমাদের মায়েদের অনেকেই সন্তানের দেখভালকে প্রাধান্য দিয়ে সরে আসছেন কর্মক্ষেত্র থেকে।
২০১৩-এর শেষদিকে মা হই আমি। ফুটফুটে মেয়েটা আমার এখন বাড়ি দাপিয়ে বেড়ায়। পুলকিত আমি। প্রথম মা হওয়ার আনন্দ তো আছেই, সেই আনন্দের বিভোরতায় কেটে যায় এক বছর। খুব কাছাকাছি সময়ে মা হওয়া আমার বন্ধুরা ছয় মাসের ছুটি শেষে ফিরে যায় কর্মক্ষেত্রে। আমার আর ফেরা হয় না। সমস্যা সেই এক, আমি বাইরে গেলে মেয়েটাকে দেখবে কে? শাশুড়ি বৃদ্ধ, মা অসুস্থ। আকাঙ্ক্ষিত কর্মক্ষেত্রগুলো মাঝে মাঝেই হাতছানি দেয়, আমার কিছুই করার থাকে না। ‘তুই কি তাহলে পুরোদস্তুর গৃহিণী?’ বন্ধুর এই প্রশ্নে দিশেহারা আমি।
সমসাময়িক অনেক তরুণীই আছেন এখন এমন। প্রথম মা হয়েছেন। আগে কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। সন্তান হওয়ার পর দেখাশোনার কেউ নেই বলে নিজেকেই সব সময় পালন করতে হচ্ছে সেই দায়িত্ব। অনেকের আক্ষেপ, কেন আমাদের দেশে ভালো দিবাযত্নকেন্দ্র নেই। মহল্লাকেন্দ্রিক দিবাযত্নকেন্দ্র এই সমস্যা মিটিয়ে দিতে পারে অনেকখানি। গলিতে গলিতে যেমনটা হয়েছে কিন্ডারগার্টেন, তেমনি কি পারে না দিবাযত্নকেন্দ্র হতে? কিন্ডারগার্টেনে যাঁরা উদ্যোগী হচ্ছেন, এর পাশাপাশি ছোট্ট পরিসরে শুরু করে দিতে পারেন উন্নতমানের দিবাযত্নকেন্দ্রও। উন্নত দিবাযত্নকেন্দ্রই পারে অনেক নারীর কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়া রোধ করতে। সন্তানের সঠিক যত্ন হচ্ছে, এতে যখন নিশ্চিত থাকবেন মা, কাজে যোগদান তখন অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ইসরাত জাহান। মা হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ায় তাঁর ছয় মাসের ছেলেকে দেখাশোনার জন্য সার্বক্ষণিক তিনজন গৃহকর্মী রাখেন। একজনের জায়গায় তিনজনকে রেখেছেন যেন ওর অনুপস্থিতিতে বাচ্চাটার কোনো অযত্ন না হয়। ‘তার পরও সারাক্ষণ বুকটা ধড়ফড় করে, খালি মনে হয় আমার আড়ালে যদি কোনো কিছু করে ফেলে। অফিস ছুটি হওয়ার পর কোনোদিকে তাকানো তো দূরের কথা, মনে হয় উড়াল দিয়ে বাসায় আসি। এমন একটা শহরে থাকি, মাঝে মাঝে বাচ্চাটাকে যে মেয়ে দেখাশোনা করে তাকেসহ পাশের বাসায় ঘণ্টা কতকের জন্য রাখব তাও সম্ভব না। আমাদের দেশে বেবিসিটিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে অনেক ভালো হতো।’ বললেন ইসরাত।
হ্যাঁ, এই বেবিসিটিং ব্যবস্থায়ও মায়েরা থাকতেন কিছুটা নিশ্চিন্তে। উদ্যোগ নিয়ে যে কেউ চালু করতে পারেন বেবিসিটিং। অনেক দেশেই তো এভাবে বড় হচ্ছে শিশুরা। তবে আমাদের দেশে নয় কেন? একজন নারী যিনি বাসায় আছেন, বাইরের চাকরিতে আগ্রহী নন, তিনি ইচ্ছে করলে প্রতিবেশীর সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব নিতে পারেন। একটি-দুটি করে শুরু করে যদি আশপাশে বাড়ির চার-পাঁচজন শিশুর দায়িত্ব নেন, সঠিক যত্ন-আত্তি করেন তাহলে বাড়িতে থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন তিনি। যা একজন কর্মজীবী নারীর উপার্জনের সমানই হবে। এতে করে বেবিসিটিং যিনি করছেন আর্থিকভাবে তিনিও স্বাবলম্বী হতে পারছেন। যাঁরা বাসায় থেকে নিজের সন্তান প্রতিপালন করছেন, নিজ সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও করতে পারেন বেবিসিটিং। আবার অনেক পৌঢ় নারী যাঁরা আফসোস করেন একাকিত্বের। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে সহকারী নিয়ে তাঁরাও শুরু করে দিতে পারেন বেবিসিটিং। শিশুর নির্মল হাসিতে প্রাণবন্ত সময় কাটবে আপনার, মা নিশ্চিন্তে কাজ করবেন কর্মক্ষেত্রে।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন