মসলিন নিয়ে কয়েকটি কিংবদন্তি কে না শুনেছে? এই যেমন আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায় মসলিন শাড়ি, এঁটে যায় দেশলাইয়ের ছোট বাক্সে। এতই সূক্ষ্ম ও মিহি এই মসলিন যে কেউ একে বলেছিলেন বোনা বাতাস, কেউ বলেছিলেন ভোরের কুয়াশা, আবার কেউ তুলনা করেছিলেন মাকড়সার জালের সঙ্গে। বাংলার মসলিন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা বিশ্বে, তার মধ্যে ঢাকাই মসলিন ছিল সবার সেরা।

মসলিন নিয়ে অনেকের জানাশোনার পরিধি মোটামুটি এই কয়েকটি কথাতেই সীমাবদ্ধ। প্রায় দেড় শ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এই মসলিন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। মসলিনের সৌন্দর্য নিয়ে যেমন আমরা জানতে চাই, তেমনি কীভাবে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে মসলিন জড়িয়ে গিয়েছিল, এর ব্যবসার দিকটা কেমন ছিল কিংবা একে ঘিরে কী ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সেসবও অনেকের আগ্রহের বিষয়।

সাইফুল ইসলামের মসলিন: আওয়ার স্টোরি বইটি পড়লে এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে। কফি-টেবিল বইটি পড়ে জানা যায়, কী জটিল প্রক্রিয়ায় বাংলার কোথায় কোথায় সূক্ষ্মতার ফারাক ভেদে কত রকমের মসলিন তৈরি হতো। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের নানা রাজপরিবারে শৌখিন সামগ্রী হিসেবে এর সুনাম এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে একসময় বিলেতে মসলিনের তুলাগাছ ফুটি কার্পাস চাষেরও চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। ফুটি কার্পাস চাষের সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ ছিল বাংলাতেই, বিশেষ করে ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায়। এখানে ছিল মসলিন বুননের কুশলী দক্ষতার জোগানও।

এতে দেখা মিলবে মূল্যবান কিছু ছবির। এর মধ্যে আছে টিপু সুলতান পরিহিত মসলিন পোশাক, ফরাসি সম্রাজ্ঞী জোসেফিনের মসলিন দিয়ে সজ্জিত শয়নকক্ষের ছবি। আছে সোনারগাঁয়ের পানামনগরে ব্রিটিশদের মসলিন কুঠি আর পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত মসলিন পোশাকের ছবি। দেখা যাবে মসলিনের তুলাগাছ ফুটি কার্পাস দেখতে কেমন ছিল সে ছবিও।

শুধু তথ্যের পর তথ্যে ঠাসা নয় এ বই, বরং এতে বলা হয়েছে মসলিনের একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প। আন্তর্জাতিকভাবে মসলিনের যে বইগুলো এত দিন প্রচলিত ছিল, সেগুলো বাইরের দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। ইংরেজিতে লেখা এ বইটির মাধ্যমে এই প্রথম আমাদের গল্পটি তুলে ধরা হলো বহির্বিশ্বে। গবেষক সাইফুল ইসলাম শুধু মসলিনের হারানো ঐতিহ্যের সন্ধানে থেমে থাকেননি, আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠান দৃকের সহায়তায় মসলিন পুনরুজ্জীবনের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। বই পড়ে নতুন মসলিন তৈরির সেই যাত্রার কথাও জানা যায়। সে দিক থেকে বইটি নতুন আশার জন্ম দেয়।

মসলিন: আওয়ার স্টোরি

সাইফুল ইসলাম

প্রকাশক: দৃক পিকচার লাইব্রেরি লিমিটেড

দাম: ৩৫০০ টাকা

প্রকাশকাল: ২০১৬

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন