default-image

‘আমি পাহাড় জানি না, তবে সাগর চিনি। আই অ্যাম ফ্যামিলিয়ার উইথ ওশান।’ এমন কথাই তো তাঁর মুখে মানায়। তিনি অ্যান কিউমেরে, ফরাসি নারী। একা একা নৌকা বেয়ে পাড়ি দিয়েছেন আটলান্টিক, প্রশান্ত মহাসাগর আর আর্কটিক। শুধু যে পাড়ি দিয়েছেন তা নয়, প্রশান্ত মহাসাগর আর আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার বেশ কটি রেকর্ড তাঁর দখলে।

default-image

গত ১১ থেকে ১৫ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু জাতীয় অ্যাডভেঞ্চার উৎসব। এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন অভিযাত্রী অ্যান কিউমেরে। সে কথা আগেই জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মশিউর খন্দকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা এবং ক্যালেন্ডার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহরিয়ার জামানের সৌজন্যে ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় কথা হয় অ্যানের সঙ্গে। কথার শুরুতেই জানালেন বাংলাদেশ তাঁর কাছে বেশ ভালো লাগছে। আর যে উদ্দেশ্যে এ দেশে আসা, ‘তা দারুণ উত্তেজনার।’

default-image

অ্যান কিউমেরে নৌকা চালান। আর তা সাগর–মহাসাগরে। কায়াক (বৈঠাচালিত সরু নৌকা), প্যাডেল বোট (প্যাডেল ও বৈঠাচালিত), কাইট বোট (ঘুড়ির মতো পালবিশিষ্ট বৈঠাচালিত) নৌকা চালিয়ে চ্যালেঞ্জিং সব নৌযাত্রা করেন দিনের পর দিন।  ‘রোয়িং (বৈঠা বেয়ে নৌকা চালানো), কায়াকিং করতে খুব ভালো লাগে। এর থেকে একটু কঠিন অবশ্য কাইট বোট। সেটাও চালিয়ে মহাসাগর পাড়ি দিয়েছি।’

আটলান্টিকে শুরু
সালটা ২০০১। অ্যান কিউমেরে সিদ্ধান্ত নিলেন, আটলান্টিক পাড়ি দেবেন নৌকা চালিয়ে। আর তা একা। আফ্রিকার কাছে ক্যানারি দ্বীপ থেকে শুরু হয় যাত্রা। যান ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বৈঠাচালিত নৌকায় সময় লেগেছিল ৫৭ দিন।

অ্যান বলে যান, ‘২০০৪ সালে আবার নামি আটলান্টিকের জলে। এবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে।’ বাড়ির উদ্দেশে, মানে ফ্রান্স ছিল তাঁর সেই নৌযাত্রার গন্তব্য। ‘ওটা ছিল ৮৭ দিনের। সবচেয়ে বেশি দিনের অভিযান। মার্কিন এক নারী অভিযাত্রীর রেকর্ড ছিল ৮৬ দিনের। অল্পের জন্য রেকর্ডটা হয়নি।’ বলেন অ্যান।

তাতে কী! রেকর্ড তো হাতছানি দিচ্ছিলই অ্যান কিউমেরেকে। ২০০৬ সালে আবার আটলান্টিক। আটলান্টিক পারের মেয়েই তো তিনি। ফ্রান্সের উপকূলবর্তী শহর কুইনপেরের অবস্থান আটলান্টিকের পারে। আটলান্টিক যেন তাঁর রক্তেই মিশে আছে।

আগের দুবার বৈঠা চালিয়ে আর প্যাডেল মেরে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছেন। ২০০৬ সালে নৌকার পরিবর্তন। যাত্রাপথ সেই নিউইয়র্ক থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত। এবারে বেছে নিলেন কাইট বোট, এটা তাঁরা দুই বছর ধরে বানিয়েছিলেন। ঘুড়ির মতো পালতোলা সেই নৌকা। বরাবরের মতোই এটিও অযান্ত্রিক নৌকা। এবার লাগল ৫৫ দিন। তৈরি হলো নতুন রেকর্ড।

default-image

প্রশান্ত মহাসাগরে
অ্যাডভেঞ্চার হচ্ছে অ্যানের জীবনের মূল বিষয়, তাই আটলান্টিকেই থেমে থাকবেন কেন। ২০০৮–এর লক্ষ্য প্রশান্ত মহাসাগর। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো থেকে যাত্রা শুরু হলো। এবার বিপত্তিই ঘটে। ‘৪ সপ্তাহ আটকে ছিলাম, সাগরে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিলাম। পরে একটি কার্গো জাহাজ আমাকে উদ্ধার করে।’

প্রশান্ত মহাসাগরে অ্যান আবার নামলেন ২০১১ সালে। পেরু থেকে ফ্রেন্স পলিনিশিয়া (তাহিতি দ্বীপ) ছিল গন্তব্য। ‘সাত হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম। এবারও কাইট বোট। আর আমি একা। ৭৮ দিন লেগেছিল।’ এ রকম অভিযাত্রায় সাধারণ মুঠোফোনের ব্যবহার করা হয় না। অ্যানের সঙ্গে ছিল কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর স্যাট ফোন। কিন্তু যাত্রার এক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর ফোনটি ভেঙে যায়। ‘আমার কারিগরি দল থেকে শুরু করে সবার সঙ্গেই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকি ৭০ দিন। সত্যিকারের একাকিত্ব।’

  কী ধরনের খাবারদাবার সঙ্গে নিয়ে যান? অ্যান বললেন, ‘শুকনা ও হালকা খাবার সঙ্গে থাকে। আর লবণাক্ত পানিকে সুপেয় করার একটা ব্যবস্থা থাকে। এভাবেই আমরা দিনরাত কাটাই। ঘুম বা বিশ্রাম নৌকার ছোট্ট কেবিনে।’

default-image

নৌকা চালানোর রুটিনটা বলে দিলেন অ্যান কিউমেরে। ছয় ঘণ্টা বৈঠা বাওয়ার পর তিন ঘণ্টা খাওয়া ও বিশ্রাম বা ঘুমের বিরতি। এই ছয় ঘণ্টা–তিন ঘণ্টার রুটিন চলতে থাকে সাগরে সাগরে। কাইট বোটের বেলায় এটা আরেকটু কঠিন। আট ঘণ্টা নৌকা চালানো আর চার ঘণ্টার বিরতি। ‘সন্ধ্যার পর কাইট বোট চালানো কঠিন। কেননা কাইট বা ঘুড়ির অবস্থান সহজে দেখা যায় না।’

অযান্ত্রিক সব নৌকাই ব্যবহার করেন অ্যান। ২০১৯ সালে দক্ষিণ মেরুর আর্কটিক সাগরও পাড়ি দিয়েছেন এই অভিযাত্রী। সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন সোলার বোট, সৌরশক্তিচালিত নৌকা। এটাও পুরোটা যান্ত্রিক নয়। আলাস্কা থেকে গ্রিনল্যান্ডের একেবারে উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত নৌকা চালিয়েছেন তিনি। এটিও একটি রেকর্ড।

default-image

বাবার হাত ধরে
অ্যান কিউমেরের বাবাও একজন নাবিক। ‘ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে সাগরে যেতাম। আমাদের বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরেই আটলান্টিক মহাসাগর। একটা নদী আবার সেই সাগরের সঙ্গে যুক্ত। সেই থেকে আমি সাগরের মানুষ।’ তিন বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় অ্যান কিউমেরের জন্ম ১৯৬৬ সালের ১৯ মে। তাঁর 

নিজের রয়েছে ২০ বছর বয়সী একজন মেয়ে।
একা একা এমন অভিযাত্রা কেমন লাগে? ‘যেকোনো দেশেই নারীর পক্ষে অ্যাডভেঞ্চার করা সহজ নয়। আমি যখন শুরু করি, তখন আমার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা আমার বাবাকে বলতেন, কী দরকার মেয়ের এভাবে অভিযানে যাওয়া? এটা তো খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তার চেয়ে পড়াশোনা করুক, ঘর–সংসার করুক।’ অ্যান সে পথে হাঁটেননি। তাই তো হয়ে উঠেছেন নারী অভিযাত্রীদের এক অনুপ্রেরণা।  

default-image

অভিযানে নতুন উপলব্ধি
ছোট নৌকা। চারদিকে বিশাল জলরাশি। মাছ ও অন্য প্রাণীরা পাশ দিয়ে যাচ্ছে, কখনো অতিকায় তিমিও সঙ্গী। এসবই অ্যান কিউমেরেকে নতুন নতুন উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিয়ে যায় প্রতিটি অভিযানে। বললেন, ‘পৃথিবীকে নতুন করে বোঝা যায়। আমরা কত ক্ষুদ্র, তা–ও উপলব্ধি করা যায়। আকাশভরা তারারা থাকে রাতের সঙ্গী হিসেবে।’

কাপ্তাই হ্রদেও এবার কায়াকিং করেছেন অ্যান কিউমেরে। বাংলাদেশের আতিথেয়তায় মুগ্ধ। ফ্রান্সে ফিরে গেছেন গত মাসেই। এখন সেখানে নিয়মিত জিম করছেন। প্রায় ৫৪ বছর বয়সী এই অভিযাত্রীকে আবার ডাকছে সাগর। মাস ছয়েকের মধ্যেই বেরোবেন নতুন অভিযানে। একা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন