মায়াময় মাটির মায়া

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব শাহাদত হোসেন। একসময় ছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসি ল্যান্ড)। ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ও দ্রুত সেবা দিতে ‘মাটির মায়া’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর সেই উদ্যোগের কথাই উঠে এসেছিল প্রথম আলোর শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদনে। এরপর দেশের প্রতিটি ভূমি অফিসে শাহাদত হোসেনের সেই সেবা প্রদানের আদল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম আলোর ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এ উদ্যোগ নিয়ে তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র মাটির মায়া। নির্মাতা রেদওয়ান রনি লিখেছেন তথ্যচিত্র নির্মাণের পেছনের কথা।

default-image

অনেক দিন পর বেশ বাধ্য ছাত্রের মতো মনোযোগী হয়ে ক্লাস করছি। শিক্ষক শাহাদত হোসেন কবির। একসময় রাজশাহীর পবা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছিলেন। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব। শাহাদত হোসেনের ‘মাটির মায়া’ ও ‘আপনার এসি ল্যান্ড’ নামে অভিনব এক উদ্যোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ভূমিসংক্রান্ত সেবার জটিল প্রক্রিয়ায় শাহাদত হোসেনের যে অভিনব সমাধান, সেটা বুঝতেই হাজির রীতিমতো তাঁর ক্লাসে। 

default-image

এই ক্লাসের পেছনের কারণটি ‘মাটির মায়া’। তাঁকে নিয়েই নির্মাণ করতে হবে প্রথম আলোর ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তথ্যচিত্র। প্রতিবছর এই নির্মাণের জন্য পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকের ফোনের জন্য আমি অপেক্ষা করতে থাকি। মানুষের ভালো কাজের বিজয়ের গল্প বলে অনুপ্রেরণা পাই ভবিষ্যতের সুন্দর বাংলাদেশের। এবার পত্রিকাটি বেছে নেয় শাহাদত হোসেনের সেই উদ্যোগকে।

পত্রিকার পাতায় পড়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে জানালেও ভূমিসংক্রান্ত খুঁটিনাটি তো বুঝতে হবে! তাই এই বিশেষ ক্লাস। ভূমি রেজিস্ট্রার, খাজনা, খারিজ, পরচানামার জটিল বিষয় বুঝতে তিনি আমাকে আর আমার দলকে রীতিমতো ক্লাসই করিয়ে ফেললেন ঢাকায়। ভূমিসংক্রান্ত নানান বিষয় জানতে জানতে অবাক হতে থাকলাম, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে আরাম–আয়েশের দিকে না গিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করার জন্য কতটা পরিশ্রম করছেন।

দলেবলে রাজশাহী

রাজশাহীতে পৌঁছালাম গত ১১ অক্টোবর রাতে। শুটিংয়ের আগের দুই দিন আমার কাজ হলো পবা ভূমি অফিসকে আপন করে নেওয়া। সেই সঙ্গে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের অনুভূতি জানা। ভূমিসেবার জটিল প্রক্রিয়াটি যেন তথ্যচিত্রে খুব সাধারণভাবে উপস্থাপন করতে পারি, এমন ভাবনা থেকেই কাজটি শুরু করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল মাটির মায়া তথ্যচিত্রটি যেন সারা দেশে ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে চিত্রগ্রাহক পাবলো আর আমি দুজনই একমত হলাম, সত্যের উপস্থাপনে দৃশ্যায়ন করব। সব দৃশ্য ও চরিত্র সত্যিকারের লোকেশন ও সেবাগ্রহীতার মাধ্যমে যেন হয়, সে অনুযায়ী দলের সদস্যদেরও অবহিত করলাম।

default-image

সাক্ষাৎ পেলাম মাজেদা বেওয়ার

আমাদের পরিকল্পনা পাকা। এদিকে প্রযোজক শাহরিয়ার সাগরের আয়োজনে ঢাকা থেকে শুটিং দল রওনা দিল। প্রধান সহকারী পরিচালক কনক সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের উৎসাহিত করতে থাকলেন শুটিংয়ের জন্য। এ সময় আমরা সন্ধান পেলাম মাজেদা বেওয়ার। তিনি সেদিন ভূমি অফিসে এসেছিলেন সেবা নিতে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও লড়াই করে চলেছেন জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানলাম একখণ্ড জমি নিয়ে তাঁর কষ্টের কথা। ভূমি অফিসের কর্মীরাও আন্তরিকতার সঙ্গে মাজেদা বেওয়ার জমিসংক্রান্ত কাজটি করছেন। কিন্তু শেষ বয়সে তাঁর করুণ অবস্থা দেখে খারাপই লাগছিল। সেসব জেনে আমি নিজেই উৎসাহিত হয়ে তাঁকে জানালাম শুটিংয়ের কথা। তিনিও রাজি হলেন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে।

শুটিংয়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল হায়াত বাড়িয়ে দিলেন সহযোগিতার হাত। অফিসের সব কর্মকর্তা–কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদসহ সবাই মিলে আমরা সভা করলাম ভূমি অফিসে। তাঁরা আমাকে সব সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। ঢাকায় পপকর্ন ক্রিয়েটিভ সেল একটি খসড়া চিত্রনাট্য তৈরি করেছিল, পরবর্তী সময়ে লোকেশন ঘুরে এসে সবার সঙ্গে কথা বলে আমরা চূড়ান্ত চিত্রনাট্য তৈরি করলাম রাজশাহীতে বসে।

default-image

লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন

১৪ অক্টোবর, শুরু হলো শুটিং। স্থান, পবা ভূমি অফিস। সকালে দৃশ্যধারণ। বেশির ভাগই বয়োজ্যেষ্ঠ সেবাগ্রহীতা বসে আছেন ভূমি অফিসের বারান্দায়। কেউ জীবনে কোনো দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে অনেকের শরীর। তারপরও আমাদের বারবার দৃশ্যধারণকে ধৈর্য ধরে সহ্য করলেন। কেউ কেউ একটু হয়তো অধৈর্য হয়ে চলেও যেতে চাইলেন, কিন্তু পাশের জন নিজ থেকেই তাঁকে উৎসাহিত করলেন সময় দিতে। এর মধ্যে আছেন সেই মাজেদা বেওয়াও। যিনি বার্ধক্যকে থোড়াই কেয়ার করে একের পর এক শট দিয়ে চলেছেন। যেন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এমন তরুণ কোনো শিল্পী, যিনি নিমগ্ন তাঁর শিল্পচর্চায়।

দৃশ্যধারণের মূল পর্বে শাহাদত হোসেনের শুটিং আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলল, যে মানুষ দীর্ঘদিনের রেকর্ড রুমে অযত্নে পড়ে থাকা নথি এক বছর ধরে সন্নিবেশ করার পরিশ্রম করতে পারেন, তাঁকে শুটিংয়ের পরিশ্রম কাবু করতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। তবে সত্যি টানা দুই দিন শুটিংয়ে একজন পেশাদার শিল্পীর মতোই আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছেন তিনি।

প্রায় প্রতিটি দৃশ্যধারণের সময় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছিলেন শাহাদত কবির। আমারও ভালো লাগছিল তিনিসহ পুরো ভূমি অফিসের সবার পূর্ণ সহযোগিতা পেয়ে। সবচেয়ে বড় পাওয়া ছিল গ্রামের অতি সাধারণ মানুষ। গ্রামের মুরব্বিরা আমাদের যে দোয়া দিয়েছিলেন ভালো উদ্যোগ প্রচারের কাজ করছি দেখে। শত পরিশ্রমেও মানুষের এই আন্তরিকতাই আমাদের নির্মাণ–সংশ্লিষ্ট সব সদস্যের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

default-image

বেলা শেষে
শুটিং শেষ হতে চলেছে। পাবলো ব্যস্ত অস্তগামী সূর্যকে ক্যামেরায় বন্দী করায়, ধানের খেতের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ভূমিসেবা গ্রহীতাদের প্রতীক মাজেদা বেওয়া। সন্ধ্যা নেমে আসছে, আমার ক্রমাগত মন খারাপ হতে থাকে। শুটিং শেষ করে যাচ্ছি মেইন রোডে রাখা গাড়ির দিকে, মাজেদা বেগম আমার হাত ধরে হাঁটছেন। হঠাৎ বলে বসলেন, ‘দুই দিন মায়া বাড়াইছিস তোরা, ঢাকায় গেলে তো খালাকে ভুলে যাবি।’ জোর গলায় বললাম, ‘আবার আসব, দেখা করে যাব।’ কিন্তু মনের ভেতর ঠিকই প্রশ্নটি উঁকি দিল, আসা হবে তো ফের?

অপেক্ষার জাল বুনি

ঢাকায় টিপু শুরু করে সম্পাদনা, চিরকুটের জাহিদ নীরব করে আবহ সংগীত, আজাদ আবুল কালামের ধারা বর্ণনায় শব্দ সংমিশ্রণ করে রিপন নাথ। চূড়ান্ত সম্পাদনার পর তৈরি হয়ে যায় মাটির মায়া।গত ৩১ অক্টোবর প্রথম আলোরসম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমীন, উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তথ্যচিত্রটি দেখলেন ও প্রশংসা করলেন। তখন আনিসুল হকের পরিকল্পনায় আর আমার নির্মাণের তথ্যচিত্রের এই ধারাবাহিকতা সার্থক মনে হলো।

ঠিক সেই সময়ই মনে পড়ল আমার মাজেদা বেওয়ার কথা। মতিউর রহমানকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি কথা বললেন রাজশাহীতে প্রথম আলোরনিজস্ব প্রতিবেদকের সঙ্গে। মাজেদা বেওয়ার জন্য বাড়িয়ে দিলেন সহযোগিতার হাত। প্রথম আলো ট্রাস্টের মাধ্যমে মাজেদা বেওয়াকে সহায়তা করা হচ্ছে জেনে মনটা ভরে গেল আমার।

পরবর্তী বছর হয়তো প্রথম আলোরবর্ষপূর্তির ভিডিও বানাতে নতুন কোথাও যাব। নতুন কোনো মানুষের গল্প বলব। বিগত ছয়–সাত বছরে তা–ই হয়ে আসছে। তাই শাহাদত হোসেনের মতো উৎসাহব্যঞ্জক গল্প যেন তৈরি হতে থাকে প্রতিনিয়ত, আর আমরাও যেন মাটির মায়ার মতো নির্মাণ দিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যেতে পারি সুন্দর বাংলাদেশের দিকে, এই প্রত্যাশাই করি প্রতিনিয়ত।

সারা দেশে মাটির মায়া
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
default-image
২০১৫ সালের অক্টোবর। কোনো এক বিকেলে হাজির হয়েছিলাম রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূমি অফিসে। পবার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছিলেন শাহাদত হোসেন। তাঁর ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর পেয়েই সেদিন যাওয়া। ভূমি অফিসে আসা সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো, দেশে মানুষে মানুষে বিরোধের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভূমির মালিকানা। ভূমি অফিসের কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণেও এই বিরোধের নিষ্পত্তি সহজে হয় না। পবা ভূমি অফিস সেই জায়গায় হাত দিয়েছে। এক বছর ঘুরে যে কাজ হয়নি, এক দিনে বা এক সপ্তাহেই তা হয়ে যাচ্ছে। তার জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে না। এ জন্য শাহাদত হোসেন অফিসের নিচে টিনশেডে বসে ডাক্তারের মতো একজনকে ডাকছেন আর তাঁর কথা শুনছেন। কাউকে তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়ে দিচ্ছেন।

জটিল বিষয় হলে তাঁর হাতে একটা টোকেন ধরিয়ে দেখা করার তারিখ লিখে দিচ্ছেন। তাৎক্ষণিক সেই সেবা পেয়ে কোনো কোনো ভুক্তভোগী কেঁদে ফেলছেন। এই ভূমি অফিসের সেবার দৃষ্টান্ত নিয়ে ‘এসি ল্যান্ডের মাটির মায়া’ শিরোনামে ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর প্রথম আলোয় শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। এরপর যেন প্রশাসনের চোখ খুলে যায়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সারা দেশের সব সহকারী কমিশনার (ভূমি), জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের কপিসহ চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, পবা উপজেলা ভূমি অফিসের আদলে সব ভূমি অফিসে সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
default-image
মাটির মায়ার উদ্যোক্তা শাহাদত হোসেন বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব হিসেবে কর্মরত। তিনি জানালেন, সারা দেশে শতাধিক সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে এখন মাটির মায়ার আদলে সেবা কার্যক্রম চলছে। পরে এই সেবা আরও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পবা উপজেলা ভূমি অফিসে শাহাদত হোসেনের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে আসেন নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ। গত বছর তিনি এই সেবা কার্যক্রমের সঙ্গে নতুন একটি মোবাইল অ্যাপ যুক্ত করেছেন। যার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা বাড়িতে বসেই আট ধরনের ভূমিসেবা পাচ্ছেন। তাঁদের স্লোগান হচ্ছে জনতার পকেটে এসি ল্যান্ড (এসি-ল্যান্ড ইন পিপলস পকেট)। এই অ্যাপের মাধ্যমে এই অফিসে শতভাগ ই-নামজারি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা বাড়িতে বসেই ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারছেন। সম্প্রতি নূরুল হাই বদলি হয়ে গেছেন কিন্তু সেবা চলছে।
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন