‘...তোমাকে বলার জন্য মান-অভিমান, দুঃখ-কষ্ট, ভালোবাসার এমন সহস্র কথা জমা হয়ে আছে। যা এই দুই পাতার চিঠিতে লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জানি মা, পৃথিবীর কোনো ডাকপিয়নই এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছে দিতে পারবে না। তবুও লিখলাম...’

মায়ের কাছে লেখা চিঠি পড়ছিল আবদুল্লাহ আল শাহীদ। চিঠি পড়তে পড়তে শাহীদের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতাদের চোখে জল। অজান্তে কেউ কেউ চোখও মুছছেন।

default-image

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মায়ের কাছে মায়ের ভাষায় চিঠি লেখার আয়োজন করেছিল ঢাকার নটর ডেম কলেজ। প্রথম বর্ষের ৩ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী তাদের মায়ের কাছে চিঠি লিখেছে। এরই মধ্যে চিঠিগুলো তাদের মায়ের ঠিকানায় ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। তাদের চিঠি নিয়েই নটর ডেম কলেজ প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল ২০ ফেব্রুয়ারি। সেখানেই চিঠি পাঠ করছিল আবদুল্লাহ আল শাহীদ।

প্রথম বর্ষের এই শিক্ষার্থী জানে তার চিঠির উত্তর আসবে না কোনো দিন। চার বছর আগে তার মা এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তবু সন্তান কি মাকে কোনো দিন ভুলতে পারে? শাহীদ বলছিল, ‘চিঠি লেখার কোনো রকম পরিকল্পনা আমার ছিল না। ১৪ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে হুট করেই মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। লিখতে বসি।’ তাই চোখের জল আর হৃদয়ের ভালোবাসায় লেখা সেই চিঠির প্রাপকের কোনো ঠিকানা নেই।

default-image

মায়ের ভাষায় চিঠি

বাংলাদেশের নানা ভাষাভাষী শিক্ষার্থীরা পড়ে নটর ডেম কলেজে। তারা নিজের মায়ের ভাষাতেই চিঠি লিখেছে। জয় চাকমা বলছিল, ‘আমি আমার ভাষায় চিঠি লিখেছি। মা তো দারুণ খুশি। যে কথা মুখে বলতে পারি না, তা চিঠিতে লিখেছি।’

আসিফের চিঠি

আসিফ পাটোয়ারী মায়ের কাছে চিঠি লিখেছে। তবে সেই চিঠি অন্যদের চেয়ে আলাদা। আসিফ বলছিল, ‘আমি তো চোখে দেখি না। তাই ব্রেইলে লিখেছি। আমার মা ব্রেইল শিখেছেন, সেটা আমার জন্যই। তাই চিঠির কথা পড়তে মায়ের কষ্ট হবে না।’

মায়ের অপেক্ষা

default-image

শেখ সালভিনের মা বিলকিস খাতুন খুলনায়

থাকেন। মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। পত্রিকায় পড়েছেন নটর ডেম কলেজের এই উদ্যোগ সম্পর্কে। তারপর অপেক্ষা করছেন ছেলের চিঠি হাতে

পাওয়ার। তিনি বলছিলেন, ‘আপনারা বিশ্বাস করবেন না আমি ইতিমধ্যে ছেলেকে কয়েকবার ফোনে জিজ্ঞাসা করেছি। চিঠিতে সে কী লিখেছে জানার চেষ্টা করেছি। ও তো কিছু বলে না। আমার জন্য নাকি চমক আছে!’ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটা চালু হোক, এমনটাই চান তিনি। সব মা তার সন্তানের ভালোবাসার কথা জানুক।

নেপথ্যের কারিগর

default-image

নটর ডেম কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আবুল বাশার। এই শিক্ষকের মাথায় এসেছিল অভিনব এই ধারণা। তিনি বলছিলেন, ‘একসময় দেখতাম মায়েরা সন্তানদের চিঠি বুকে জড়িয়ে ধরে থাকতেন। সন্তান দূর থেকে চিঠি পাঠাত। মা চিঠি পড়ে আলমারিতে রেখে দিতেন। আবার সময় করে চিঠিগুলো বের করে পড়তেন। চিঠিতেই সন্তানদের খুঁজে পেতেন। আমরা ঠিক কয়জন মাকে সামনাসামনি বলতে পেরেছি, মা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি? কিংবা সন্তানের জন্য মায়েরা যত কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করেন, সেটাও কি সন্তানেরা সামনাসামনি বলতে পারে? এসব ভেবেই মায়ের কাছে চিঠি লেখার এই আয়োজন।’  আবুল বাশার তাঁর এই ধারণা জানান ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক শুভাশিস সাহাকে। তারপরই এগোয় আয়োজনের কাজ। এই দুই শিক্ষক এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা।

নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও বলেন, ‘আমাদের জীবনের জন্য মায়ের কাছে আমরা ঋণী। মায়ের আদর, স্নেহ-ভালোবাসায় আমরা বেড়ে উঠেছি। এই চিঠিগুলোতে মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসা, নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে মায়ের সঙ্গে সন্তানের সুখকর মুহূর্তের অনুভূতি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0