default-image

‘সম্পত্তি বিক্রিতে মা বাধা দিয়েছিলেন। তাই একটি ঘরে মাকে বেঁধে বেদম পেটানো হলো। বাড়ির অন্যরা তা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। এই মারই যে শেষ মার, তা তো নয়। চুল কেটে দেওয়া থেকে শুরু করে একাধিকবার হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছে মাকে। একসময় বাবা নিরুদ্দেশ হলে চাচারা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। মা কলেজের আয়া, দোকানে চকলেটসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি, এমনকি ২০১৪ সালেও জুটমিলে শ্রমিকের কাজ করেছেন শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে। আমরা দুই ভাই এখন প্রতিষ্ঠিত। মাকে এখন আর কোনো কাজ করতে দিই না।’ কথাগুলো বললেন বিউটি কামালের ছোট ছেলে ইব্রাহীম মল্লিক। ইব্রাহীম বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (আইএফআরসি) কক্সবাজার অফিসে যোগাযোগ ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে।

বিউটি কামালের বড় ছেলে শরীফ হাসান বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের কক্সবাজার অফিসে প্রোটেকশন মনিটরিং অফিসার। তিনি পড়াশোনা শেষ করেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কক্সবাজারে বিউটি কামাল এখন দুই ছেলের সঙ্গেই থাকছেন। 

ইব্রাহীম মল্লিক বেশ গর্ব করেই বললেন, ‘একসময় খাওয়ার চিন্তা ছিল বড় চিন্তা। এখন আমাদের সে চিন্তা নেই। মায়ের শরীরটা প্রায়ই ভালো থাকে না। এখন শুধু চাই মা আর ২০টা বছর বাঁচুক। মাকে একটু শান্তি দিতে চাই।’

 ফরিদপুরের মেয়ে বিউটি কামালের বর্তমান বয়স ৪৭ বছর। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়। স্বামী এইচ এম কামালের টাকাপয়সার অভাব না থাকলেও ছিলেন মাদকাসক্ত। ছোট ছোট দুই ছেলে রেখে নিরুদ্দেশ হলে বিউটি বাড়ির বাইরে শ্বশুরের জমিতে ছাপরা ঘর তুলে থাকা শুরু করেন। দীর্ঘদিন পরে স্বামী ফরিদপুরে ফিরে এলেও আগের সেই সম্পর্কে আর ফেরা হয়নি। বর্তমানে ছেলেরাই অসুস্থ বাবার চিকিৎসা ও মাসিক খরচ দিচ্ছেন। 

ইব্রাহীম মল্লিক বললেন, ‘এই সমাজে কম বয়সী এবং দেখতে সুন্দর নারীর যদি স্বামী না থাকে, তাহলে তাঁর কী অবস্থা হয়, তা দেখেছি মায়ের বেলায়। একেবারেই নিঃসঙ্গ একজন মানুষ ছিলেন মা। আত্মীয়স্বজন কেউ পাশে দাঁড়াননি। শুধু আমাদের কথা চিন্তা করে কখনো আত্মহত্যা করেননি মা।’

বিউটি কামাল বললেন, ‘জীবনের প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টা মনে হতো ঝড় হচ্ছে। এ কথা বলার জন্য পাশে আপনজন কেউ ছিল না। বলিওনি। বললেও কপালে জুটত অপবাদ আর গ্লানি। আপনজনেরাই আমাকে “পাড়ার মেয়ে” বা “খারাপ মেয়ে” বলতেও ছাড়েনি।’

তবে স্কুলের শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন ইব্রাহীম মল্লিক। বললেন, ‘পরীক্ষা শুরু হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পরীক্ষার ফি দেওয়া হয়নি বলে স্কুলে ঢুকতে পারছি না। মা যে কলেজে আয়ার কাজ করতেন, স্কুল থেকে তা কাছেই ছিল। দৌড়ে যেতাম মায়ের কাছে। গিয়ে দেখতাম, মা স্যারদের চা খাওয়াচ্ছেন আর টাকা জোগারের চেষ্টা করছেন। কী যে এক অসহায় অবস্থা। মধুখালী পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষক আবু দাউদ মোল্যা স্যার মাঝেমধ্যেই সাদা কাগজে “পারমিট” লিখে দিলে পরীক্ষা দিতে পারতাম।’

 ইব্রাহীম মল্লিক বললেন, ‘মা কলেজে আয়ার কাজ করতেন আর কলেজের অধ্যক্ষ মাকে দিয়ে বাসার কাজ করিয়ে নিতেন বিনা মজুরিতে। একদিন ওই ম্যাডামের বাসায় হুইল পাউডার দিয়ে ঘর মুছতে গিয়ে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে ব্যথা পান মা। পরে মিথ্যা অজুহাতে মাকে আয়ার চাকরি থেকেও বরখাস্ত করা হয়। মা একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ নেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিমা করাতে পারলে টাকা পেতেন। তারপর আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন মা জুটমিলের একজন শ্রমিক। যেদিন মায়ের এ কাজের কথা জানতে পারলাম, সেদিন আমাদের দুই ভাইয়ের ভেতরে যে ঝড় শুরু হয়, তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।’

বিউটি কামাল বললেন, ‘আমি পণ করেছিলাম, ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত করব। “সবার মা হাসবে, আমার মা কাঁদবে, তা তো হবে না”—এ কথা মনে রেখে ছেলেরাও যুদ্ধে নামে।’ 

ইব্রাহীম মল্লিক বললেন, ‘মায়ের আত্মসম্মানবোধ খুব প্রবল। মায়ের রান্নার হাত অসাধারণ। আচার ও পিঠা খুব ভালো বানান। আমরা দুই ভাই চিন্তা করছি মায়ের এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা শুরু করব, যা দেখাশোনা করবেন মা। মা প্রবীণ নিবাস গড়ে তুলতে চান। আমরা মায়ের এ স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

অন্যদিকে বিউটি কামালের মুখে প্রশান্তির হাসি। বললেন, ‘আমার দুই ছেলে জীবনের কোনো কিছু গোপন না করেই বিয়ে করবে। তবে এটা ঠিক, বউ দুটো খুব ভালো থাকবে। আমার ছেলেরা আমার কষ্টকে উপলব্ধি করে, তাই তারা অন্য কোনো মেয়েকে কখনো কষ্ট দেবে না বলেই আমার বিশ্বাস।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0