default-image

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার পথ। দীঘিনালা-বাবুছড়া সড়ক ধরে এই দূরত্ব পেরোলেই দীঘিটির দেখা মেলে। সড়ক ঘেঁষেই দীঘিটি। বেড়াতে আসা মানুষদের জন্য দীঘিতে আছে প্যাডেল বোট, পাড়ে বসার জায়গা। পুরোনো দীঘির পাড়ে যে প্রাচীন বটগাছ দাঁড়িয়ে, তারই ডালে শালিক, ঘুঘুসহ বিভিন্ন পাখির বসবাস। ইতিহাস বলছে, এই দীঘির বয়স ৩৫০ বছর। দীঘি থেকেই দীঘিনালার নামকরণ।

ইতিহাসের পাতায়

এই দীঘি খনন করেন ত্রিপুরার মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য। ত্রিপুরার এই রাজবংশের ইতিহাস নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়, গোবিন্দ মাণিক্য ছিলেন ত্রিপুরার ১৮৪তম মহারাজা। ইতিহাসে রাজর্ষী নামে খেতাবপ্রাপ্ত এই রাজা ১৬৬০ সালে ত্রিপুরার সিংহাসনে আরোহণ করেন।

নানা ঘটনার পরিক্রমায় মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই নক্ষত্র নারায়ণের ষড়যন্ত্রের শিকার হন। ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে রাজ্যের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভ্রাতৃঘাতী কলঙ্ক থেকে মুক্ত থাকতে স্বেচ্ছানির্বাসনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন রাজা। এটা শুনে রাজ্যের পাত্রমিত্র সভাসদ ও মন্ত্রী পরিষদের সবাই আবেদন-নিবেদন করেন সিংহাসন না ছাড়ার। কিন্তু গোবিন্দ মাণিক্য সবার আহ্বান অগ্রাহ্য করে নক্ষত্র নারায়ণকে রাজার মুকুট পরিয়ে দেন। সিংহাসন ছেড়ে তিনি চলে আসেন ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনস্ত রাজ্যাংশ রিয়াংদেশে (বর্তমানে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মাইনী নদীর তীরে)। স্বেচ্ছানির্বাসনে এসে আশ্রম নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন রাজা।

গোবিন্দ মাণিক্য রিয়াংদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন জেনে রিয়াং সর্দাররা মহারাজার সামনে উপস্থিত হয়ে নক্ষত্র নারায়ণের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার অভিপ্রায় জানান। তখন মহারাজা গোবিন্দ মাণিক্য রিয়াং সর্দারদের শান্ত করেন। নানা উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের যদি একান্তই আমার প্রতি আনুগত্য পোষণের ইচ্ছা থাকে তবে তোমরা দীঘি খনন কর।’

রিয়াং সর্দাররা আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। ১৬৬০-১৬৬৭ সালের কোনো একটি সময় ১২ জন রিয়াং সর্দার রিয়াংদেশে ১২টি দীঘি খনন করেন। তার মধ্যে দীঘিনালার ৩২০ শতক বা প্রায় ১০ বিঘা জমি নিয়ে কাটা এই দীঘিটি অন্যতম।

ত্রিপুরা গবেষক ও লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা বলেন, ইতিহাসের অন্যতম স্বাক্ষী মাণিক্যের এই দীঘি থেকে দীঘিনালার নামকরণ হয়েছে, আগে যার নাম ছিল রিয়াংদেশ। ১৯১৬ সালে দীঘিনালা থানা হিসেবে উন্নীত হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, দীঘির পাশেই প্রথম থানার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বর দীঘিনালাসহ ৮টি এলাকাকে উপজেলায় রুপান্তর করে খাগড়াছড়ি জেলা ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ইতিহাসের স্বাক্ষী দীঘিনালার দীঘিটি চাকমা সার্কেলের (চাকমা রাজার) অধীনে রয়েছে।

পলাশ বড়ুয়া, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন