রেসিপির বই, ল্যামপ্রে মাছ ও একটি ভয়ংকর গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

খাদ্য বা খাবার শব্দটা শুনলেই ভেসে ওঠে খুন্তি-কড়াই আর মসলাপাতির মনমাতানো সুঘ্রাণ! খাবার নিয়ে রাজা বাদশাদের জাঁকজমক আর আদিখ্যেতার কথাও মনে পড়ে। অথবা মনে পড়ে, কোনো মনোরম পরিবেশে খাওয়া সুস্বাদু খাবারের কথা। তাই তো? আসুন আপনাদের এই সব সুন্দর চিত্রকল্পের বাইরে একটা ভয়ংকর গল্পের হদিস দিই। তার আগে বলে রাখি, খাদ্যসংস্কৃতির জগৎ যেমন বিশাল, তেমনি অদ্ভুত। যুদ্ধ, ইতিহাস, ভূগোল, রসায়ন, রাজা বাদশাদের পাগলামি— কী নেই এখানে? বিরিয়ানির প্লেটে যেমন সুস্বাদু মাংস পাওয়া যায়, খাদ্যসংস্কৃতির বিশাল জগতে তেমনি পাওয়া যায় মসলাদার বিভিন্ন ঘটনা। ভয়ংকর গল্পটা শোনানোর আগে রেসিপির বইগুলোর তথ্য দিয়ে রাখি আপনাদের, যাতে আপনারা ভয় না পান।

পৃথিবীর প্রথম রেসিপির বই লেখা হয় কবে? এই তথ্য হয়তো কেউ জানেন, কেউ জানেন না। যারা জানেন তারা তো জানেনই, যারা জানেন না তারাও জেনে নিন পৃথিবীতে লেখা প্রথম রেসিপির বইটির নাম ‘দা রোমান কুকারি’। আর এই বই লেখা হয় খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে। লেখক মার্কাস গভিয়াস অ্যাপিসিয়াস। এই বইয়ে নানারকম সস, গোলমরিচের গুঁড়ো এবং মসলার কথা লেখা আছে। বইয়ের কথা যখন উঠলই তখন আরও কয়েকখানা প্রাচীন রেসিপির বইয়ের নাম বলে রাখি। ‌খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে লেখা হয় ‘বুক অফ সংগস’। এই বই কিন্তু গানের নয়। রেসিপির বই। খাবার নিয়ে লেখা একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘দা ফিজিওলজি অব টেস্ট’, লেখক ব্রিলা সাভারাঁ। এটি আঠারো শতকে লেখা হয়। গ্রিক লেখক লিনসিউস–এর ‘দা সেন্টার’ বইয়ে সস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ রান্নার কথা লেখা আছে। তাই এই বইকেও রেসিপির বই হিসেবেই ধরা হয়। ‘ফুড ইন হিস্টরি’ বইয়ের লেখক রেনি টেনহিল। এই বইয়ে, মেসোপটেমিয়ায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৩০০ বছরেরও আগে ৫০ রকমের মাছের কথা পাওয়া গেছে। একই সময় ক্যালডিয়ার উর শহরের অলিগলিতে মাংসের বিভিন্ন খাবারের পাশাপাশি ভাজা মাছেরও উল্লেখ পাওয়া যায়, যা মানুষ কিনে খেত। বোঝাই যাচ্ছে, পুরান ঢাকা বা মিরপুরের গলিতে অথবা দিল্লি শহরের অলিগলিতেই শুধু এখনকার মানুষ কাবাব কিনে খায় না। এইরকম খাবারের চল বহু বহু বছরের পুরোনো। শেষ বইয়ের নাম ‘দা স্যাটেরিকন’। লেখক পেট্রনিউস। খ্রিষ্টীয় ১ম শতকে লেখা এই বইটিকে অসম্পূর্ণ হিসেবে ধরা হয়।

default-image

বহুত হলো বইপত্রের আলাপ। এবার সেই গল্প শোনাই।

রোমান জাতির কথা তো বহু শুনেছেন। এরা বেশ বীরের জাতি হিসেবে পরিচিত পৃথিবীর ইতিহাসে। তো এই রোমানদের খুবই প্রিয় একটি মাছের নাম ল্যামপ্রে মাছ। সাধারণ রোমানরা সেই মাছ যেমন খেত, নিরো বা ক্যালিগুলার মতো রাজা-উজির-সম্রাটরাও তেমনি খেত ল্যামপ্রে মাছ। সম্রাটরা তাদের ভোজসভায় এই মাছ দিয়ে তৈরি উপাদেয় সব খাবার রাখতেন অতিথিদের জন্য। অতিথিদের ল্যামপ্রে মাছ দিয়ে তৈরি খাবার পরিবেশন ছিল ভীষণ সম্মানের ব্যাপার। এতে অতিথি ও গৃহস্থ দুজনেই নাকি নিজেদের সম্মানিত ভাবত!

রাজা বা সম্রাটের বাড়িতে জীবন্ত ল্যামপ্রে মাছ খাবার চল ছিল। রাজার কাছে কখন কোনো অতিথি আসবে বা কখন রাজার ল্যামপ্রে মাছ খাবার শখ হবে সেটাতো আর রাঁধুনিরা জানত না। তাই মাছগুলোকে জ্যান্ত রাখা হতো বড় বড় চৌবাচ্চায়। এই মাছগুলোকে জ্যান্ত রাখার জন্য তো খাবার দিতে হতো, তাই না? গল্পটা এখানেই ভয়ংকর। মাছগুলোকে কোনো সাধারণ খাবার খেতে দেওয়া হতো না। সম্রাটের চোখে যেসব ক্রীতদাস অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হতো তাদের টুকরো টুকরো করে কেটে সেই মাছগুলোকে খাওয়ানো হতো! দীর্ঘ দিন ধরে সেই মাংস খাইয়ে মাছগুলোকে মোটাতাজা করা হতো! সেই সব মাছে তৈরি বিভিন্ন মুখরোচক খাবার পরিবেশন করা হতো রাজ অতিথিদের সুদৃশ্য খাবার টেবিলে।

default-image

ল্যামপ্রে মাছের চৌবাচ্চায় সবাই যে মারা যেত, তা নয়। চূড়ান্ত ভাগ্যবান কেউ কেউ হয়তো বেঁচেও যেত। এবার তেমনি একটি গল্প বলি। রোমান সম্রাট অগাস্টাসের বন্ধু ভেদিয়াস ফলিওর এক ক্রীতদাস একবার একটি ক্রিস্টাল কাপ ভেঙে ফেলে। এতে ভেদিয়াস ভীষণ রেগে গিয়ে সেই ক্রীতদাসটিকে মৃত্যুদণ্ড দেন বড় বড় ল্যামপ্রে মাছের চৌবাচ্চায় নিক্ষেপের মাধ্যমে। এই শাস্তি শুনে ক্রীতদাসটি ভেদিয়াসের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কোনো রকমে ক্রীতদাসটি অগাস্টাসের সামনে হাজির হয়ে সম্রাটকে বিকল্প একটি মৃত্যু পদ্ধতি বাতলে দিতে অনুরোধ করে। কারণ সে ল্যামপ্রে মাছের খাবার হতে চায়নি। অগাস্টাস ক্রীতদাসটির প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাকে মুক্ত করে দেন। কিন্তু তার আগে ফরমান জারি করেন, তার সামনে ভেদিয়াসের সব ক্রিস্টাল কাপ ভেঙে ফেলতে হবে এবং সেই ভাঙা অংশ দিয়ে ল্যামপ্রে মাছের চৌবাচ্চাটি পূর্ণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন