default-image

স্বামী হাসান সাইদের আক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রুমানা মনজুর দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান ২০১১ সালে। সে সময় নাক-মুখের বেশ কিছু অংশ থেঁতলে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা জানা শাম্মী কানাডায় বসেই খবরটি শুনলেন। রুমানা আর শাম্মী ছিলেন স্কুল-কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করা দুই বন্ধু। তাই খবরটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না শাম্মী। এ ছাড়া আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি রুমানার যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাতে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে, তা শাম্মীর ধারণায় ছিল না। সেখান থেকেই কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী চলচ্চিত্র নির্মাতা শাম্মীর ফিচার ডকুমেন্টারি ফিল্ম আনটাই দ্য নট–এর গল্পের শুরু হয়।

default-image

টেলিফোনে শাম্মী জানালেন, রুমানার সঙ্গে শাম্মীর ফেসবুকে যোগাযোগ ছিল। ২০১১ সালে রুমানা উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় ছিলেন। ছুটিতে দেশে ফিরলে এ উচ্চশিক্ষাকে কেন্দ্র করেই স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্য এবং পরের ঘটনাটি ঘটে। পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর কানাডার ভ্যাংকুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউবিসি) রুমানার চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। আবার কানাডায় ফেরেন রুমানা। কানাডায় রুমানার সঙ্গে দেখা করেন শাম্মী। রুমানার জীবনের ঘটনাটা সবাইকে জানানোর তাগিদ অনুভব করেন শাম্মী। এই সূত্র ধরেই বাংলাদেশে আসেন কয়েকবার। আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে নারী নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নারী নির্যাতন নিয়ে করা জরিপ থেকেও শাম্মীর ধারণা পাল্টাতে থাকে। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কোনো শ্রেণিভেদ নেই। একই সঙ্গে শাম্মী কানাডার নারী নির্যাতনেরও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। দেখতে পান দেশভেদেও নারী নির্যাতনের তথ্য প্রায় একই মাত্রায় ঘটছে। তারপর ২০১৬ সালে শাম্মী ডকুমেন্টারি নিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০১৬ সালে শাম্মী বাংলাদেশে আসেন এবং রুমানার মতো আরও তিন নারী শারমীন, নাঈমা ও জেসমিন রাজি হন তাঁদের জীবনের গল্প বলতে। এঁরা কেউ পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, কেউ যৌন বা মানসিক নির্যাতনের শিকার। বিয়ের পর পারিবারিক জীবনে সুখী হতে পারেননি, বিভিন্ন স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় তাঁদের। অবশেষে চলতি বছরের জুন মাসে কাজ শেষ হয় ডকুমেন্টারি আনটাই দ্য নট বা শিকল ছেঁড়ার গল্প। ডকু ফিল্মটির প্রোডিউসার ললিতা কৃষ্ণা এবং কেটি সোয়েলস। কানাডার ব্রডকাস্ট চ্যানেল সিবিসিতে প্রিমিয়ার হবে ২৪ নভেম্বর। যাত্রার পর থেকে এ ডুকুমেন্টারির ভাগ্যে একের পর এক যোগ হচ্ছে নানা সম্মানজনক পুরস্কার। কানাডা, ভারতের দিল্লিসহ বিভিন্ন জায়গার দর্শকেরা পছন্দ করছেন ডকুমেন্টারিটি। আনটাই দ্য নট হচ্ছে ৭৮ মিনিটের পূর্ণদৈর্ঘ্য ডকুমেন্টারি।

জানা শাম্মী বলেন, আনটাই দ্য নট হচ্ছে নির্যাতনের শিকার নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চিত্র। বিয়ে নামক সামাজিক বন্ধনে নিষ্পেষিত হওয়া নারীদের মুক্তি বা সে অবস্থা থেকে উত্তরণের গল্প।

জানা শাম্মী ভবিষ্যতেও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান। বলেন, নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কানাডাতেও দেখা যায়, নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে পুলিশ, সমাজ সবাই আছে, কিন্তু ওই নারী মুখ খুলতে চান না। আর বাংলাদেশে তো এ চিত্র আরও প্রকট।

 রুমানা দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, তাতে থেমে যাননি তিনি। চলতি বছরের খবর হলো, সেই রুমানা বর্তমানে কানাডার একজন আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৪ বছরে পা দেওয়া একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তিনি মানসিক স্বস্তিতে আছেন। ভালো আছেন।
২০১১ সালে কারাগারেই মৃত্যু হয় রুমানার স্বামী হাসান সাইদের।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0