শিক্ষার্থীদের জন্য দুপুরের খাবার ৫ টাকা

বিজ্ঞাপন
default-image

দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বিদ্যালয়ে এসে টিফিনে না খেয়ে থাকে, আর অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তানেরাও ভাত খাওয়ার সময়ে মুখরোচক ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়—এ দুটোর কোনোটিই মানতে পারেন না বিপ্লব সরকার। তাই তিনি নিজের হোটেলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাত্র পাঁচ টাকায় ডাল-ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। শর্ত একটাই, গায়ে স্কুলড্রেস থাকতে হবে। 

বিপ্লব সরকারের বয়স ৩৫ বছর। বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পূর্বপাড়া মহল্লায়। আড়ানী বাজারের তালতলায় বড়াল নদের ধারে বিপ্লব সরকারদের হোটেল। নাম ‘অন্নপূর্ণা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।’ আড়ানী মনোমোহিনী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই প্রধানত সেখানে পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবার সেরে নেয়। এই কাজ করতে গিয়ে বিপ্লব সরকারকে বিপদেও পড়তে হয়েছে। 

বিপ্লব সরকারের বাবা শ্যামল সরকারই মূলত হোটেলটির মালিক। বাবা বিকেলে বসেন। এর আগ পর্যন্ত বিপ্লব সরকারকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পাঁচ টাকার প্যাকেজের কথা তুলতেই এক গাল হেসে বিপ্লব বলেছিলেন, গ্রামের অধিকাংশ শিশুই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসে না। অনেকের বেশি টাকা দিয়ে হোটেলে দুপুরের খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্যও নেই। তারা স্কুলে এসে টিফিনের সময় আশপাশের দোকানে মুখরোচক কিছু একটা কিনে খায়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অথচ দুপুরে এক প্লেট ভাত খেতে পারলে তাদের শরীরটা ভালো থাকে। এই চিন্তা থেকেই বাবার অগোচরে পাঁচ বছর আগেই তিনি এই প্যাকেজ চালু করেন। তখন থেকেই বাচ্চারা খেতে আসতে শুরু করে। করোনাভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ হওয়ার আগে তাঁর হোটেলে গিয়ে দেখেছিলাম শিক্ষার্থীদের ভিড়। দুপুর হতেই স্কুলের বাচ্চারা খেতে আসছে। তাদের সামলাতে ব্যস্ত বিপ্লব সরকার।

default-image

বিপ্লব বলেন, ‘প্রথমে বাবাকে আড়াল করে শুরু করেছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো বাবা জানলে এটা আর করতে দেবেন না।’ এখন বিপ্লবের সে ভয় দূর হয়েছে। বাবা জানার পরে ছেলের ওপর রাগ করেননি, বরং ছেলের এই মহানুভবতায় খুশিই হয়েছেন। তাই এখন তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে শিশুদের প্যাকেজ দিচ্ছেন। 

বিপ্লব সরকার বলেন, শিশুদের তিনি কয়েকটি শর্তে খেতে দেন। তার প্যাকেজ খেতে হলে অবশ্যই স্কুলড্রেস পরে আসতে হবে। আর খাবার আগে বা পরে বাইরের দোকানে অন্য কোনো মুখরোচক খাবার খাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, তিনি দেখেছেন বেশির ভাগ শিশুই এক প্লেটের বেশি ভাত খেতে পারে না। তিনি ভাতের সঙ্গে সবজি আর ডাল দিয়ে একটি প্যাকেজ তৈরি করেছেন। খাবার সময় তিনি খেয়াল করেন কোনো শিশু যেন সবজি নষ্ট না করে। শরীরের জন্য সবজির বড় প্রয়োজন। তিনি তাদের সবজি খেতে বাধ্য করেন। টমেটোর মৌসুমে টমেটোর সালাদ খেতে বাধ্য করেন। এটি পাঁচ টাকায় দেন। তবে পাশাপাশি খেতে বসে কোনো শিশু যদি বেশি টাকা দিয়ে মুরগির মাংস খেতে চায়, তাহলে তিনি পাশের শিশুকেও ছোট এক টুকরা মুরগির মাংস ও একটু ঝোল দেন। যাতে তার মন খারাপ না হয়। একজন স্বল্পশিক্ষিত হোটেলমালিকের মুখে এই জীবনদর্শনের কথা শুনে চোখে পানি এসে যায়। শিশুদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার চেতনা থেকে নিজের হোটেলের রংটাও জাতীয় পতাকার রঙে করেছেন। 

ভালো লাগে বিপ্লবের সরল স্বীকারোক্তি শুনেও। তিনি বলেন, এই প্যাকেজে তাঁর কোনো লাভ হয় না। আবার ক্ষতিও হয় না। তিনি মনের আনন্দে করেন, সেবার মানসিকতা থেকে করেন, কারণ তাঁর এসএসসি পরীক্ষাটা দেওয়া হয়নি। লেখাপড়া না করে কী ভুল করেছেন এখন বুঝতে পারেন। এ জন্য যে শিশুরা লেখাপড়া শিখছে, তারা যেন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে, তার জন্য তিনি তাঁর সাধ্যের মধ্যে যতটুকু পারছেন, তাদের সহযোগিতা করছেন। 

এই প্যাকেজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপরে কী ধরনের সাড়া ফেলেছে জানতে চাইলে আড়ানী মনোমোহিনী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বললেন, গরিব বাচ্চারা দুপুরে কিছু খায় না। আর পাঁচ টাকায় তেমন কিছু পাওয়া যায় না। সেখানে ওরা বিপ্লবের ওখানে ভাত খেতে পারে। এ জন্য ইদানীং তিনি খেয়াল করেছেন বিদ্যালয়ে ওই ধরনের বাচ্চাদের উপস্থিতি আগের চেয়ে বেড়েছে। বিপ্লব ইতিমধ্যে এই কাজ করে যে মহানুভবতার পরিচয় দিচ্ছেন, তিনি সারা জীবন শিক্ষকতা করেও হয়তো তাঁর জায়গায় যেতে পারবে না। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন