>
default-image
রক্তের প্রয়োজনে খুঁজতে হয় রক্তদাতা। রক্তদাতাদের নানা রকম সংগঠন, অনলাইন নেটওয়ার্কও রয়েছে। বয়সে তরুণ সুব্রত দেব ভাবলেন, এমন একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে কেমন হয়, যেখানে রক্তদাতাই খুঁজে নেবেন রক্তের প্রয়োজন আছে এমন মানুষকে। সেই চিন্তা থেকে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ডোনেট ব্লাড বিডি’ নামে রক্তদাতাদের তথ্য নিয়ে ওয়েবসাইট। সেই সাইট বিস্তৃত হলো ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামে। হলো ফেসবুক গ্রুপ, যেখানে সদস্য দেড় লাখের মতো। ফোনে যোগাযোগের জন্য কল সেন্টারও হয়েছে। এই উদ্যোগ নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
default-image

ততক্ষণে গল্পের ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন সুব্রত দেব। একের পর এক তিনি রক্তদাতা মানুষের অভিজ্ঞতার গল্প বলে যাচ্ছেন। এই চট্টগ্রামের তৌহিদুল ইসলামের কথা বলছেন তো আবার ছুটে যাচ্ছেন খুলনার মিরাজের গল্পে। ১ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকায় সুব্রত দেবের সঙ্গে আরও খানিকটা সময় কাটল এমন গল্প শুনে।

হালকা-পাতলা গড়নের মানুষ সুব্রত দেব। রাজধানীর একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মুখে মানানসই ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। সব সময় চোখে থাকে ভারী চশমা। কথায় কথায় বললেন, ‘প্রয়োজনের চেয়ে ওজনটাও অনেকটা কম।’ এই কম ওজনের মানুষই এক ওজনদার কাজ করেছেন। তাঁর গড়ে তোলা একটি উদ্যোগ যোগসূত্র তৈরি করে দিচ্ছে রক্তসন্ধানী ও রক্তদাতা মানুষকে। ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামের এই উদ্যোগে রক্তদাতারাই খুঁজে বের করেন যাঁদের রক্ত প্রয়োজন তাঁদের।

আক্ষেপ থেকে শুরু
২০০৫ সালের কথা। সুব্রত দেব তখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়েন। স্বেচ্ছায় রক্ত সংগ্রহের একটি ক্যাম্প বসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। রক্ত দেবেন বলে সুব্রত দাঁড়ালেন সারিতে। দারুণ উত্তেজনা ভেতরে-ভেতরে। তবে বিপত্তি বাধল একটু পরই। রক্ত সংগ্রহকারীরা জানিয়ে দিলেন, ‘আপনার ওজন কম, রক্ত নেওয়া সম্ভব নয়।’ খুব মন খারাপ হলো সুব্রত দেবের। তবে আঘাত পেলেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের ব্যবহারে। সুব্রতকে ওজন ও ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য টিটকারি সহ্য করতে হলো।
দিন যায়, বছর যায়, ভেতরে থেকে আক্ষেপ জেগে ওঠে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র সুব্রত তত দিনে পড়াশোনা শেষ করেছেন। চাকরি নিয়েছেন একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে। তখনই মাথায় আসে সুব্রত দেবের, ‘আমি রক্ত দিতে না পারি।
মানুষকে তো রক্ত দিতে উৎসাহিত করতে পারি।’ এমন ভাবনা থেকেই ২০১৩ সালে ব্লাড ডোনেট বিডি (www.donatebloodbd.com) নামের ওয়েবসাইট বানিয়ে ফেললেন।

default-image

সাড়া মিলল ছয়জনের
ওয়েবসাইট দাঁড়াল। এখন তো দরকার রক্তদাতা। ফেসবুকে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে পোস্ট দিলেন। খুব একটা পাত্তা পেলেন না পরিচিত মানুষের কাছে। হতাশ সুব্রত দেব দেখলেন মোটে ছয়জন রক্তদাতা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাঁদের নিয়েই শুরু হলো। সংখ্যাটা বাড়ানোর জন্য সুব্রত সহায়তা নিলেন ফেসবুকে সক্রিয় আরিফ আর হোসেনের। তাঁকে দিয়ে পোস্ট করানোর পর রক্তদাতার সংখ্যা দাঁড়াল ২৬০।
সুব্রত বলছিলেন, ‘রক্তদাতার এই সংখ্যা এখন ৩ হাজার ৬৬০। রক্তদানে আগ্রহী রক্তদাতারা এই ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেন। রক্তের গ্রুপ, জেলা, মোবাইল নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য রয়েছে রক্তদাতার।

প্রস্তুত রক্তদাতা
সুব্রত দেবের তখন ১০টা-৬টা অফিস। সারা দিনই রক্তের প্রয়োজনে ফোন পান সুব্রত। কিন্তু রক্তের প্রয়োজন তো অফিস বোঝে না। জরুরি কাজ থাকলে দুই দিক সামলাতেই হিমশিম খেতে হয়। ‘তা ছাড়া নিয়মিত রক্তদাতারাও ফোন করে জানাতেন তাঁদের চার মাস পূর্ণ হয়েছে, রক্ত দিতে চান।’ বলেন সুব্রত।
সহজ একটা পথ খুঁজলেন সুব্রত। ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুললেন। নাম দিলেন ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’। যেখানে রক্তদাতা নিজেই পোস্ট করে জানান, তিনি রক্ত দিতে আগ্রহী। রক্তগ্রহীতা যোগাযোগ করে সংগ্রহ করে নেন রক্ত।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই ফেসবুক গ্রুপে এখন সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লাখ। প্রতিদিনই রক্তদাতারা পোস্ট করেন রক্ত দেওয়ার কথা জানিয়ে।

default-image

দেখা হলো সরোবরে
এক নেটওয়ার্কে এসে ধীরে ধীরে রক্তদাতারা একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। কেউ থাকেন কুমিল্লা, কেউ বা গফরগাঁও, কেউ আবার রংপুর। কারও সঙ্গে সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি। তাই তাঁরা এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন ‘সেলফি উইথ বাংলাদেশের সকল রক্তদাতা’। রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে হাজির হলেন প্রায় ২৫০ জন রক্তদাতা। দিনমান তাঁরা কাটালেন ‘রক্ত দিন জীবন বাঁচান’ স্লোগানে।
সুব্রতর পাশেই বসা ছিলেন রাজধানীর সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নিয়মিত রক্তদাতা জাহিদুল ইসলাম। অনেকক্ষণ ধরে শুনছিলেন আমাদের কথোপকথন। এবার তিনি মুখ খুললেন, ‘আমরা আরও নানা ধরনের কাজ করি। মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করতে রয়েছে কিছু কর্মসূচি।’
সেসব কর্মসূচির কিছুটা জানাতে তিনি ওয়েবসাইট খুললেন। চোখ আটকাল রক্তদাতাদের নিয়ে প্রকাশ হওয়া দুটি ই-বুকে। নামও অভিনব। প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত বইটির নাম এক ব্যাগ মানবতা এবং রক্তদাতাদের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে যে বই সেটির নাম ৪৫০ মিলিলিটার স্মৃতি। ই-বই প্রকাশ ছাড়াও মানুষকে রক্ত দিতে সচেতন করছেন নানা ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে।

default-image

সুব্রতর স্বপ্নপূরণ
চট করে প্রশ্নটা মাথায় এল। আচ্ছা আপনি কি শেষ পর্যন্ত রক্ত দিতে পেরেছিলেন? সুব্রতর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাসতে হাসতে জানালেন, ‘জি, পেরেছি।’
অফিসের কাজে সুব্রত ২৮ জুলাই গিয়েছিলেন বগুড়া। কাজ শেষ হতে যতক্ষণ, এরই মধ্যে পরিচিত রক্তদাতারা হাজির। জমে উঠল আড্ডা। রক্তদাতা সেই বন্ধুদের নিয়েই একসময় গেলেন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শুনলেন, এক নবজাতকের জন্য রক্ত দরকার। ও পজিটিভ। সুব্রত বলে যাচ্ছেন সে দিনের কথা, ‘আমারও রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। রক্তও লাগবে খুব সামান্য পরিমাণ। মাত্র ৪০ মিলিলিটার। এই সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়!’

default-image

‘রক্তের সম্পর্ক’
রক্তের প্রয়োজনেই পরিচয় হয়েছিল নজরুল ইসলাম ও আফসানা নাজনীনের। তারপর প্রেম, পরিণয়। এই দম্পতি পুরান ঢাকায় নিজেদের বাসায় বসে রক্তের অপেক্ষায় বাংলাদেশ উদ্যোগের কল সেন্টার পরিচালনা করেন। ২০১৬ সাল থেকে চলছে এই কল সেন্টার। রোগীর জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজে দেন তাঁরা। নজরুল ইসলাম প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরেই সময় দেন কল সেন্টারে (ফোন ০১৭৫৬৯৬৩৩০৮, ০১৭৪৮৩০৬০২৭)। আফসানা নাজনীন সামলান দিনের বেলা। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের অন্যান্য দিনে কল সেন্টার খোলা থাকে। রবি থেকে বৃহস্পতিবার—সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা এবং শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সেবা দেন তাঁরা।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কল সেন্টারে প্রতিদিন অনেক মানুষ ফোন করেন। কিন্তু আমাদের পক্ষে সবার জন্য রক্তদাতা খুঁজে দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে।’ এ কাজটি তাঁরা করেন বিনা পারিশ্রমিকে। কল সেন্টারের আনুষঙ্গিক খরচ চলে সমমনা ১৫ জনের সহায়তায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0