default-image

ছবিটি প্রথমবার দেখলে মনে হবে সাদামাটা সাজে এক কিশোরীর মুখ। এর আবার আলাদা কী? কিন্তু এই সাদামাটা মুখই দ্বিতীয়বার আপনাকে ছবিটির দিকে তাকাতে বাধ্য করবে। কারণ, সমুদ্রের গভীরতামাখা সেই চোখের রং আর দশজন বাঙালির মতো নয়, একদম ঝকমকে সবুজাভ! মেয়েটা বাংলাদেশি? বিশ্বাসই হতে চায় না। 

default-image

অস্ট্রেলিয়ান আলোকচিত্রী ডেভিড লেজার কেমন করে খুঁজে পেলেন সবুজনয়না বাংলাদেশি এই মেয়েকে? কীভাবে তুলি নামের সেই কিশোরী হয়ে উঠল বাইরের দুনিয়ার চেনা মুখ!

আমি সেই মেয়ে
ডেভিড লেজারের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বের তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের নানা প্রান্ত ঘুরে অসাধারণ কিছু ছবি তুলেছিলেন তরুণ এই অস্ট্রেলীয় আলোকচিত্রী। সেগুলো তিনি শেয়ারও করেছিলেন তাঁর ফেসবুক পেজে। কুয়াশাভেজা সরষেখেত, গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের সরল মুখ—নানা কিছু উঠে এসেছিল তাঁর ছবিতে।
তাঁর ফটোগ্রাফি মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু ডেভিড লেজার নামের সেই তরুণ আলোকচিত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার উপায় ছিল না। ডেভিডকে ভুলেই গিয়েছিলাম। এর মধ্যে তিনি গিয়েছিলেন দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানে গহিন অরণ্যের বাসিন্দাদের ছবি তুলে চমকে দেন। সেই চমকটা বিস্ময় হয়ে দেখা দিল যখন তাঁর তোলা আদিবাসী এক কিশোরের ছবি উঠে এল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর প্রচ্ছদে। আর তিনি শেয়ার দিলেন এমন একটা ছবি, যেখানে দেখা গেল, 

default-image

ফুটবলসম্রাট কালো মানিক পেলে স্বয়ং তাঁর তোলা আদিবাসীদের ছবিসহ সেই ইস্যু নিয়ে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছেন। সেই সূত্রেই আবার কদিন আগে ডেভিডের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ। ডেভিড জানালেন, তিনি এখন আছেন ইন্দোনেশিয়ায়। খুব কঠিন একটা অ্যাসাইনমেন্টে। তার পরই কথায় কথায় বেরিয়ে এল সেই সবুজ চোখের মেয়েটির বিখ্যাত হয়ে ওঠার গল্প।বছর দুই আগে রাজশাহীর পুঠিয়াতে তোলা সেই মেয়ের ছবি এক অর্থে মোড় ঘুরিয়ে দেয় ডেভিড লেজারের ফটোগ্রাফি ক্যারিয়ারেরও। তুলি নামের সেই মেয়ের মুখ উঠে আসে ডিজিটাল ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড আর ফটো রিভিউ অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফিবিষয়ক সাময়িকীর প্রচ্ছদে।ফ্রেমে বন্দী সবুজ চোখ‘সারা দিন ঘোরাফেরার পর শীতের বিকেলটায় একটু শান্ত সময় কাটানোর জন্য একটা গ্রামের ছোট্ট টিলার মতো জায়গায় গিয়ে বসি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে ঘিরে একটা ভিড় তৈরি হয়। কেউ কেউ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আমার দেশ, নাম, এখানে আসার কারণ জানতে চাইছিল। সময়টা উপভোগ করতেই আমি বাচ্চাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে শুরু করলাম। খেলতে খেলতেই আমার চোখ আটকে গেল একটি ঘরের সিঁড়িতে বসে থাকা এক কিশোরীর দিকে। সে খোলা চুলে বাংলাদেশের জাতীয় 

default-image

পতাকার টি-শার্ট পরেছে। তার চেহারা খুব সাধারণ ও অকৃত্রিম, কিন্তু তার চোখে ছিল অসাধারণ কিছু। আমি তার সঙ্গে কথা বলি। নাম জানতে চাই। নিজের পরিচয়ও দিই। তার সবুজ চোখের প্রশংসা করে জানতে চাইলাম সে আমার পোট্রে৴ট ছবির সাবজেক্ট হতে রাজি কি না। খুব সহজভাবেই মেয়েটি রাজি হয়ে যায়।’ ডেভিড ই-মেইলে দেওয়া উত্তরে এভাবেই বলছিলেন তুলিকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।
পরদিন বিকেলে তুলিদের বাড়িতে গিয়ে সবার সঙ্গে পরিচিত হন ডেভিড। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তুলির বড় বোন দুলি ডেভিডকে পরিচয় করিয়ে দেন সবার সঙ্গে।

default-image

ডেভিড বলছিলেন, ‘ছবি তোলার জন্য আমি চাইছিলাম তুলি সবুজ কোনো ওড়না বা স্কার্ফ পরুক। তাতে তার চোখের রং আরও স্পষ্ট হবে। কিন্তু সবুজ কিছু বাড়িতে নেই বলে জানায় সে। এরপর আমি সবুজের সঙ্গে অন্য কিছু খুঁজতে বললে সে লাল-সবুজে মেশানো একটা ওড়না (শাল) পরে। এটা মাথায় জড়িয়ে আমি তার কয়েকটি ছবি নিই। সেই সঙ্গে তাকে গত দিনের লাল-সবুজ টি-শার্ট পরিয়েও কিছু ছবি তৈরি করি।’ ডেভিডের ভাষায় এই হচ্ছে তুলির ছবি তোলার গল্প।
ডেভিড লেজার-বৃত্তান্ত
বাংলাদেশে ডেভিড ছিলেন সপ্তাহ তিনেক। এর মধ্যে তিনি ঘুরেছেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও শ্রীমঙ্গলের মতো জায়গা।
ডেভিড বলছিলেন, ‘আমি আসলে সেসব জায়গায়ই ঘুরতে পছন্দ করি, যেখানে নিজের ঘরের মতো লাগে। ঠিক এ কারণেই আমার এখনো ইউরোপ দেখা হয়নি। ২০০৪ সাল থেকে বছরে দু-তিন মাস আমি পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াই। এই ১০ বছরে আমি অনেক মানুষ দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মতো কৌতূহলী, অতিথিপরায়ণ ও খোলা মনের মানুষ আর কোথাও দেখিনি।’
বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকা গেছেন ডেভিড। ঘুরেছেন দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য। তুলেছেন বহু অসাধারণ ছবি!

default-image

‘আমি কোনো দেশে ঘোরার সময় তাদের ভাষার কিছুটা শিখতে চেষ্টা করি। এতে সে দেশের মানুষ যেমন কিছুটা খুশি হয়, তেমন আমারও যোগাযোগ করতে সুবিধাই হয়। আমি সব সময়ই নতুন মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিশতে পছন্দ করি।’ বললেন ডেভিড।
এই ট্র্যাভেল ফটোগ্রাফারের রয়েছে আরও পরিচয়। তিনি একই সঙ্গে একজন পিয়ানো শিক্ষক ও সংগীতশিল্পী। ডেভিডের জন্ম অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। কাজ করেছেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, এশিয়ান জিওগ্রাফিক, যুক্তরাজ্যের ডেইলি মিরর ও ডেইলি মেইল-এর মতো পত্রপত্রিকার জন্য। তরুণ এই আলোকচিত্রী যখন ধূসর-কালো চোখের দেশে সবুজ চোখের আকর্ষণ ধরতে পেরেছেন, তখন তিনি যে পুরো পৃথিবীর রূপ তুলে ধরবেন, তাতে আর সন্দেহ কী!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0