সার্থক মানুষের প্রতিকৃতি

বিজ্ঞাপন
default-image

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জনপরিসরে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যে সম্মান, স্বীকৃতি ও মান্যতা পেয়েছেন, তা আক্ষরিক অর্থেই অ-তুলনীয়। তিনি ঢাকার বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব-বিকাশ ও পরিণতির কালের মানুষ। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সব দেশেই খ্যাতিমান ও দায়িত্বশীল মানুষের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে ষাট-সত্তরের দশকে তাই হয়েছিল। নিজেদের নানামুখী তৎপরতায় দেশের মানুষের আকাংক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বহু মান্যজন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন সম্মানজনক উচ্চতায়। আনিসুজ্জামান-যে নানা অর্থে ছাড়িয়ে গেছেন প্রায় সবাইকে, তা মোটেই অকারণ নয়। একটা প্রত্যক্ষ কারণ এই যে, তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ তৎপরতার কাল বেশ দীর্ঘ—ছয় দশকেরও বেশি। এ দীর্ঘ সময় ধরে তিনি যাপন করেছেন একাডেমিক পণ্ডিতের জীবন—শিক্ষকতায়, গবেষণায়, সভা-সেমিনারে, সম্পাদনায়; আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিজীবীর ভূমিকায় তাঁর কাজ এর চেয়ে বেশি বৈ কম নয়। ক্ষমতার প্রত্যক্ষতায় তিনি যাননি। এই না-যাওয়াটা তাঁর জন্য বোধহয় কল্যাণকর হয়েছে। আবার রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁর অবাধ যোগাযোগ ছিল। তাতে করে গুরুত্বপূর্ণ বহু কাজের সাথে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি কাজ করেছেন। তাঁর সে কাজ জনসমাজে গৃহীত হয়েছে। এভাবেই তাঁর এ বিরল অর্জন সম্ভবপর হয়েছে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের গবেষণা-প্রকল্পগুলোর মধ্যে দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি হলো বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির ইতিহাসের ধারাক্রমের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের অবস্থান ও অবদানের প্রকৃতি নির্ধারণ। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (১৯৬৪) এ দিক থেকে ইতোমধ্যেই ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে; যদিও এ বিষয়ে তাঁর আরও কিছু কাজ আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা বইগুলোর মধ্যে এটিই সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত-ব্যবহৃত বই। বইটিতে ইতিহাসের যে দৃষ্টিভঙ্গি ও কাঠামো নির্মিত হয়েছে, পরবর্তীকালে তা ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকল্পকে তাঁর বইয়ের নাম অনুসরণে বলতে পারি ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’ প্রকল্প। নতুন উপকরণ আবিষ্কার, উপকরণগুলোর পাঠযোগ্য সংস্করণ প্রস্তুত ও তাৎপর্য–নির্ণয় এবং ধারাবিবরণী নির্মাণের ক্ষেত্রে আনিসুজ্জামান বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এই এলাকায় মৌলিক অবদান রেখেছেন। পুরোনো গদ্যের প্রমাণসূচক উপকরণ আবিষ্কার বা নতুনভাবে উপস্থাপনের দিক থেকে তাঁর লেখালেখির একটি অপূর্ণ তালিকা এরকম: ক) ‘এ নোট অন টু ম্যানস্ক্রিপ্টস অব ‘স্বরোদয়”, [চিটাগং ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ, পার্ট ১, ভলিউম ২, ১৯৭৮]; খ) ফ্যাক্টরি করেসপনডেন্স অ্যান্ড আদার বেংগলি ডক্যুমেন্টস ইন দ্য ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড রেকর্ডস, [লন্ডন, ১৯৮১]; গ) ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর কিছু বাংলা চিঠিপত্র’, [‘ভাষা ও সাহিত্যপত্র’, ষষ্ঠ বর্ষ, ১৩৮৫]; ঘ) ‘আঠারো শতকের একটি মামলার নথি’, [‘সাহিত্য পত্রিকা’, বর্ষা, ১৩৮৯]; ঙ) আঠারো শতকের বাংলা চিঠি [চট্টগ্রাম, ১৯৮২]

এর মধ্যে স্বরোদয়-সংক্রান্ত গবেষণার বিশেষ গুরুত্ব এই যে, এর মধ্য দিয়ে ‘ষোড়শ শতাব্দীর রচনা বলে নিঃসংশয়ে গণ্য হতে পারে, এমন একটি গ্রন্থের সন্ধান’ পাওয়া গেছে। ফ্যাক্টরি করেসপনডেন্স ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির বাংলা নথিপত্রের ব্যবহারযোগ্য সুশৃঙ্খল তালিকা করে অন্য অনেক গবেষণার পথনির্দেশ করেছে। আঠারো শতকের মামলার নথি সমকালীন চালু বাংলার কেজো রূপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তাঁর সংগৃহীত উপাদানরাশির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একরাশ বাণিজ্যিক চিঠির সংকলন। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে রক্ষিত দু হাজারের বেশি বাণিজ্যিক পত্র খুঁজে পেয়েছিলেন আনিসুজ্জামান।

গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। এর মধ্যে তিনটি বিশেষভাবে ঈর্ষণীয়। এক. ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ; দুই. প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসাবে দায়িত্বপালন; তিন. সংবিধানের বাংলা ভাষ্য প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসাবে মুখ্য ভূমিকা পালন।

গত প্রায় চার দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি সর্বাগ্রগণ্য একজন। তাঁর এ বিশদ ভূমিকাকে নিম্নোক্ত কয়েকভাগে সংক্ষেপে প্রকাশ করা যায়।

প্রথমত, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের মহাবয়ান বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ যাঁদের হাতে তৈরি হয়েছে তিনি তাঁদের একজন। তাঁর এ ধরনের রচনার একটা সাধারণ নাম হতে পারে ‘স্বরূপের সন্ধানে’, যা তাঁর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ ও বইয়ের নাম। বস্তুত বাঙালি মুসলমান ও বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের দিকনির্দেশনা প্রণয়ন তাঁর প্রায় সকল কাজের অন্যতম প্রধান পটভূমি। একে আমরা এ অঞ্চলের মানুষের ‘আধুনিকায়ন’ নামেও চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর কালের প্রগতিশীল ধারা হিসাবে তিনি স্বাতন্ত্র্যবাদী ধ্যানধারণা থেকে সমন্বয়বাদী ধ্যানধারণায় উত্তরণের পক্ষে বিরামহীন কাজ করেছেন। অন্য অনেক কাজের মতো এক্ষেত্রেও তিনি বেশি উচ্চকণ্ঠ নন, চরমপন্থিও নন; যদিও যাকে তিনি প্রতিক্রিয়াশীলতা মনে করেন তার সাথে লড়াইয়ে কখনো পিছপা হননি।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বাংলা ভাষার প্রমিতায়নে তিনি খুব সক্রিয় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। পাঠ্যপুস্তক ও অপরাপর ব্যবহারিক কাজে প্রমিত বাংলার ব্যবহারে বাংলাদেশ আমলে যত ধরনের তৎপরতা হয়েছে তার প্রায় সবটাতেই তিনি অংশ নিয়েছেন।

তৃতীয়ত, আজকাল যাকে তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক দিক থেকে ‘অ্যাক্টিভিজম’ বলা হয়, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কর্মকাল সে গ‌ণ্ডিতে না পড়লেও তিনি কাঠামোর মধ্যে ভীষণ রকম সক্রিয় একজন মানুষ। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে ভূমিকা পালন আর যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজে সক্রিয়তা তার দুই নমুনা মাত্র। নিত্যদিনের লেখালেখিতেও তিনি সুমিত, প্রজ্ঞাবান এবং পরিচ্ছন্ন। কমিটির সভাপতি বা সভ্য হিসাবে—সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়—তিনি পালন করতেন কার্যকর ভূমিকা। আর বক্তা হিসাবে তাঁর পরিমিতি এবং যথার্থতা রীতিমতো ঈর্ষণীয়।

চতুর্থত, একজন সম্পাদক ও পাণ্ডুলিপি–সম্পাদক হিসাবে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। কাজ করেছেন দেশে ও বিদেশে, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায়। বস্তুত এ দুই ভাষায় পারঙ্গম মানুষ বাংলাদেশে খুবই বিরল। তাঁর সম্পাদিত বইয়ের পরিমাণ বিপুল। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস–এর কয়েক খণ্ডা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক মনে করতেন, আনিসুজ্জামানের মতো গুছিয়ে গবেষণার কাজ আর কেউ করতে পারে না। তাঁর গবেষণার কাজ হয়তো বিপুল নয়; কিন্তু বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার দুর্বলতার বিবেচনায় যথেষ্ট। জীবনদৃষ্টিতে এবং স্বভাবে তিনি লিবারেল হিউম্যানিস্ট। কলকাতায় রবীন্দ্রোত্তরকালে সংস্কৃতিবান মানুষের যে মূর্তি গড়ে উঠেছিল, অন্তত তাঁর প্রকাশিত জীবনাচরণে তার প্রত্যক্ষ ছায়া পাওয়া যায়। এ জীবনদৃষ্টির যেসব সীমাবদ্ধতা আছে, তার কোনো কোনোটি হয়তো তাঁর মধ্যেও পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনো সন্দেহ নাই, উদারনৈতিক মানবতাবাদী এবং সংস্কৃতিবান বাঙালির আকর্ষণীয় দিকগুলো তাঁর মধ্যে বিশেষভাবে মূর্ত হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্ববান পোশাক, মৃদু উচ্চারণ, পরিমিতিবোধ ও সুরুচিতে সেই মাধুর্যের প্রকাশ।

আহমদ ছফা একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেবল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মধ্যেই বুদ্ধিজীবীসুলভ সৌন্দর্য আছে। বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ যে তাঁকে অভিভাবকের সম্মান দিয়ে গেছে দীর্ঘদিন ধরে, এই সৌন্দর্যই হয়তো তার মূল ভিত্তি।

মোহাম্মদ আজম: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন