>তিন ব্রিটিশ সাংসদের ঝাড়ু হাতে ছবিটি অনেকেই দেখেছেন। তাঁরা সিলেটের এক পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তবে সুরমাপাড় পরিচ্ছন্ন রাখার এই কার্যক্রমের শুরুটা হয় আরও কয়েক মাস আগে। তরুণদের সেই উদ্যোগের নাম ক্লিন সুরমা, গ্রিন সিলেট। চলুন, পরিচিত হওয়া যাক।
default-image

নদীর নাম সুরমা। সিলেটের বুক চিরে প্রবহমান নদীটি নগরকে নান্দনিকভাবে ভাগ করেছে। উত্তর আর দক্ষিণ, সুরমা নদীর এপার-ওপার। নদীকেন্দ্রিক যাতায়াতব্যবস্থায় একসময় সুরমার তীরও ছিল সুরক্ষিত, জলতরঙ্গের মতন। নগরের অংশে নদী পারাপারে আছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের কিনব্রিজ। সিলেট অঞ্চলে সুরমায় প্রথম সেতু। এক পাশে জমিদার আমলে সময় সচেতনতার প্রতীক আলী আমজদের ঘড়িঘর। নদীতে নামার যে ঘাট, সেটিও ঐতিহ্যবাহী। নাম চাঁদনি ঘাট।

ঐতিহ্যের এই ত্রিরত্ন ঘিরে সদা উন্মীলন থাকলেও নদীতীরের ছিল হতশ্রী এক রূপ। দখল-দূষণের করাল গ্রাসে বিপন্ন সুরমার এমন অবস্থায় মন কাঁদে নদীপ্রেমীদের। এই অবস্থা কাটাতেই একদল স্বেচ্ছাসেবী সপ্তাহের একটি দিনের কিছুটা সময় ব্যয় করছেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়। বছরব্যাপী এই স্বেচ্ছাশ্রমের নাম দিয়েছেন তাঁরা ‘ক্লিন সুরমা, গ্রিন সিলেট’। গত ২১ জুন থেকে এ কার্যক্রমের শুরু হয়। সুরমার তীর পরিচ্ছন্নতায় তাঁদের ১৩ সপ্তাহে ১৩টি কর্মসূচির পর ১৪ নম্বর সপ্তাহের পরিচ্ছন্নতায় তাঁদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন ব্রিটিশ তিন সাংসদ। তখন নজর কাড়ে সবার। স্বেচ্ছাশ্রমের এ কাজের মধ্য দিয়ে সুরমাকে সেই সুরম্য অবস্থায় ফেরানোর স্বপ্ন দেখছেন উদ্যমী তরুণেরা।

default-image

একজন সমন্বয়কের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁদের কর্মতৎপরতা বা কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়। ২১ জুন থেকে প্রতি শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটা বাজলেই যেন টের পাওয়া যায়—নাক-মুখ বেঁধে তরুণ-তরুণীরা পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তাঁদের। দিন শেষে ফিরে যাচ্ছেন নিজ নিজ ঠিকানায়। এ রকম কর্মযজ্ঞে এখন সক্রিয় শতাধিক তরুণ স্বেচ্ছাসেবী। যুক্ত হয়েছে ২৭টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও। এই পুরো কাজের সমন্বয় করছেন যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সিলেটের সায়েকা তাবাসসুম চৌধুরী। তিনিই ‘ক্লিন সুরমা, গ্রিন সিলেট’-এর দূত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের তিন সাংসদকে যুক্ত করার সমন্বয়কও ছিলেন সায়েকা তাবাসসুম।

নদীতীর পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে সিলেটের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শতাধিক শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত আছেন জানিয়ে সায়েকা তাবাসসুম বলেছেন, প্রতি শুক্রবার সুরমা নদীর নগরের অংশকে পরিষ্কার রাখতে স্বেচ্ছায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছেন তাঁরা। ৫২ সপ্তাহ তাঁরা এই কাজ করবেন। পরে সবুজ গড়ায় মনোনিবেশ করবেন। তাঁদের এ কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করছে সিলেট সিটি করপোরেশন।

default-image

ব্রিটিশ সাংসদদের যুক্ত করার বিষয়ে সায়েকা বলেন,এই কর্মসূচি সম্পর্কে কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাংসদেরা জানতে পেরেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের এক ফাঁকে সিলেটে এসে পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নিয়েছেন শুধু আমাদের উৎসাহ জোগাতে। এতে স্বেচ্ছাসেবীরা ভীষণ উৎসাহ পেয়েছেন।’

কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মেহফুজ চৌধুরী জানান, যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টি থেকে নির্বাচিত সাংসদ পল স্কালি, এনি মারগারেট মেইন ও বব ব্ল্যাকম্যান সুরমাতীরে পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেন। মেহফুজ চৌধুরী বলছিলেন, তিন সাংসদসহ একটি প্রতিনিধিদল ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসেছিল। ২০ সেপ্টেম্বর তারা ফিরে গেছে। বাংলাদেশ সফরকালে তারা সিলেট ছাড়াও কক্সবাজার ও ঢাকায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রকল্প পরিদর্শন করে গেছে। যুক্তরাজ্যে সিলেটপ্রবাসী বেশি। বাংলাদেশ বলতে সিলেটকে চেনেন অনেক ব্রিটিশ। তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রম দেখতে গিয়ে নিজেই অংশ নিয়েছেন তাঁরা। ​

‘এখানকার তরুণেরা যেভাবে পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় এগিয়ে এসেছে, এটি খুবই ইতিবাচক একটি বিষয়’—এ রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তিন সাংসদের একজন মারগারেট।

default-image

সুরমা নদীর কিনব্রিজ সিলেটের প্রথম সেতু্। সেই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে জনদাবি বাস্তবায়নের একটি ঐতিহাসিক চিহ্নও এটি। ১৯২৮ সালের দিকে নদী বিভক্ত দুই এলাকার লোকজনের চলাচলের সুবিধায় সিলেটের গোলাপগঞ্জের রনকেলীর বাসিন্দা রাজনীতিবিদ মৌলভী আবদুল হামিদ চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন সুরমায় সেতু নির্মাণের।

তৎকালীন আসাম লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য (এমএলসি) ছিলেন মৌলভী আবদুল হামিদ চৌধুরী। এ দাবি পাঁচ বছরে জনদাবিতে রূপ নেয়। ১৯৩৩ সালে লোহার কাঠামোর সেতুটি নির্মাণ করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯৩৬ সালে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামে সেতুর নামকরণ হয় ‘কিনব্রিজ’। ১ হাজার ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৮ ফুট প্রস্থের সেতু দিয়ে সেই থেকে সেতুবন্ধের যাতায়াত। পথচলতি মানুষের ময়লা-আবর্জনা স্তূপ আকারে নদীতীরে জমা হওয়ার প্রবণতাও তখন থেকে শুরু।

‘নদী আমার মা’ নামে ২০১৫ সালের দিকে ধারাবাহিক কিছু পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি করেছিলেন সিলেটের পরিবেশবাদী সংগঠনের সংগঠক আবদুল করিম চৌধুরী। ২০১৬ সালে তিনি ‘ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্স’ নামের সংগঠন ঘোষিত ‘সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার’ হন। ২০১৬ সালে তিনি সংগঠনের আহ্বানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন সুরমা নদীর এক বোতল পানি নিয়ে। নদীর প্রতি এমন টান দেখে বিমোহিত হয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী নদীসংগ্রামীরা।

‘ক্লিন সুরমা, গ্রিন সিলেট’ কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, কিনব্রিজের ছবির সঙ্গে সুরম্য সুরমার রূপ একদিন পরিচ্ছন্ন আর সবুজময় হবে—এমন স্বপ্নই দেখা যায় এই স্বেচ্ছাসেবীদের কার্যক্রমে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0