হাওয়ার নৌকায় ৮০০ কিলোমিটার

বিজ্ঞাপন
default-image

‘নতুন নৌকার ফরমাশ দিয়েছি। সেটি আসছে। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করব, এরপর নদীপথে পুরো বাংলাদেশ ঘুরব আমরা। এটা আমাদের কাছে খুব রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে।’ কথাগুলো অভিযাত্রী ও উদ্যোক্তা হানিয়াম মারিয়ার, রাকা নামেও যিনি পরিচিত। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ ক্রোড়পত্রের জন্য দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেদের অভিযান পরিকল্পনা নিয়ে এমন করেই বলেছিলেন। 

এরপর তো এল করোনাকাল। এরই মধ্যে নৌকাও এল। নড়েচড়ে বসলেন ফজলে রাব্বি ও রাকা দম্পতি। ফজলে রাব্বি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেন, আর সুযোগ পেলেই বেরিয়ে যান অভিযানে। যে নৌকার কথা বলা হচ্ছে, সেটার কেতাবি নাম ইনফ্ল্যাটেবল বোট। সহজ ভাষায় হাওয়াভরা এক জলযান। চলে ইঞ্জিনে। দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট আর প্রস্থে সাড়ে ৫ ফুটের মতো। রাব্বি ও রাকা এমন নৌকা দিয়ে সমতল নদ–নদী পাড়ি দিয়েছেন ঢের, এমনকি পাহাড়ি সাঙ্গু নদ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁদের। নদীতে বিশেষ করে বর্ষাকালে যেকোনো ধরনের ভ্রমণের সময় সবাইকে খুব সচেতন ও সতর্ক থাকার কথা বললেন এই অভিযাত্রীরা। মানসম্পন্ন, ঠিকঠাক কাজ করে এমন লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই পরতে হবে। সবাইকে সাঁতার শেখার পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।

default-image

নতুন নৌকা আসার পর এই অভিযাত্রী দম্পতির উত্তেজনা তুঙ্গে। বেরিয়ে পড়তে হবে। সঙ্গে জুটে গেলেন বন্ধু আশরাফ সিদ্দিকী, পেশায় উদ্যোক্তা। করোনাকাল, স্বাস্থ্যবিধি, সতর্কতা—সবই মানতে হবে। ৫ আগস্ট ভিডিও কলে রাব্বি বললেন, ‘পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কিন্তু যখন দেখলাম স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চালু করা হয়েছে, তখন আমরা নৌকা নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চর অঞ্চলে জনবসতি কম, তাই আমাদের যাত্রাপথের বিরতির সেসব জায়গা গুগল ম্যাপস দেখে বের করলাম।’ 

যাত্রার গন্তব্য ঠিক হলো ভোলার চর কুকরিমুকরি। ভিডিও কলে রাকা পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘এ জায়াগাটা আমাদের খুব প্রিয়।’ রাব্বি যোগ করেন, ‘আগেও অনেকবার গিয়েছি, তবে নিজেদের নৌকা নিয়ে ঢাকা থেকে এবারই প্রথম।’

২৬ জুন ভোরে শুরু হলো যাত্রা। রাব্বি বললেন, কোন দিক দিয়ে বুড়িগঙ্গায় নামব, সেটা ঠিক করতেও সময় লাগল। পরে হাজারীবাগের কাছে বেড়িবাঁধ থেকে বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভাসালাম। এই নৌকায় রাব্বিরা ব্যবহার করছেন ১০ অশ্বশক্তির আউটবোট ইঞ্জিন। যাত্রী তিনজন, তবে মাল–সামান কম নয়। হাঁড়িপাতিল থেকে শুরু করে, চুলা, তাঁবু, শুকনা খাবার, হ্যামকসহ নানা কিছু। ফলে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতির যে আশা ছিল, তা আর হলো না। গড়ে ১৫ কিলোমিটার গতি নিয়েই এগোতে থাকলেন। 

বিপদের আঁচ পেলেন চাঁদপুরের কাছে গিয়ে। পদ্মার পর মেঘনা নদীতে যখন পড়লেন, তখন দেখলেন সেই নদী উত্তাল আর প্রমত্ত। আর পদ্মা–মেঘনার মোহনা রীতিমতো বিপজ্জনক। হাওয়াভরা এই নৌকা ডুববে না, কিন্তু উল্টে যেতে পারে। চাইছিলেন মোহনা এড়াতে, তারপরও কাছ দিয়েই পার হতে হলো। ‘এমন স্রোত আর বড় বড় ঢেউ, ভয়ই পেলাম। ইঞ্জিনের পুরো শক্তি দিয়েও নৌকার গতি ৩–৪ কিলোমিটারের বেশি মনে হয় না তুলতে পেরেছি।’ বললেন রাব্বি।

default-image

চাঁদপুর পেরোতেই বিকেল হয়ে গেল। কিন্তু নৌকা ভেড়ানোর জায়গা পাচ্ছেন না। এই নৌকার সঙ্গে তো নোঙর নেই, একজন নেমে রশি ধরতে হয়। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর পেলেন হরিণাঘাটা খাল। ‘খাল মানে জনপদ রয়েছে, যেখানে আমরা তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাতে পারব।’ প্রথম রাত তাঁদের কাটল হরিণাঘাটাতেই। 

দ্বিতীয় দিন সকালে আবার ভাসল নৌকা। দুপুরের দিকে ভোলা পার হয়ে তাঁরা পড়লেন ঝড়ের কবলে। একটা মসজিদের কাছে আশ্রয় নিলেন। ঝড় থামার পর পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন জানালেন, ৪০ কিলোমিটার দূরে মেঘনা ইকোপার্কে তাঁবু খাটিয়ে থাকা যাবে। 

তৃতীয় দিন ২৮ জুন। এবার গন্তব্য সরাসরি চর কুকরিমুকরি। ভালোভাবেই পৌঁছে গেলেন। নৌকার মূল চালক রাব্বি, আর শান্ত নদীতে চালিয়েছেন আশরাফ সিদ্দিকী। চর কুকরিমুকরির চর পাতিলায় তাঁবু গাড়ল দলটি, চার দিনের জন্য। রাকা বললেন, ‘স্থানীয় একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের তাঁর বাড়িতে থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু আমরা এই সময়ে কারও বাসায় যেতে চাইনি। সব জায়গাতেই দূরত্ব মেনে চলেছি।’ তারপরও এক সন্ধ্যায় সেই ইউপি সদস্যের বাড়িতে যেতে হলো তাঁদের। রাব্বি বললেন, ‘রাকাকে বাড়ির মেয়েরা দেখলে নাকি অনুপ্রাণিত হবে, তাই আমরা সে বাড়িতে গেলাম।’

default-image

৩ জুলাই ফিরতি যাত্রা। মেঘনা এড়িয়ে আসাটাই নিরাপদ মনে করলেন ফজলে রাব্বিরা। ভোলার কাছে এক পাশে মেঘনা, অন্য পাশে তেঁতুলিয়া নদী। তেঁতুলিয়া বেছে নিলেন। সন্ধ্যা হলো বরিশালের গৌরনদীর কাছে মিয়ার চরে। এখানে তাঁবু গেড়ে রাত কাটানো হলো। পরদিন ৪ জুলাই সূর্য ওঠার আগেই আবার হাওয়ার নৌকা ভাসল জলে। এরই মধ্যে মাল–সামান কমিয়ে ফেলা হয়েছে। ভোলা থেকে অনেক কিছুই ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ক্যুরিয়ারে। ফলে নৌকার গতি পাচ্ছিলেন ভালো।

‘পদ্মা নদীতে ঢুকে খারাপই লাগল। মানচিত্র দেখাচ্ছে এখানে জনবসতি, কিন্তু আমরা দেখছি অথই পানি। অনেক গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে।’ একপর্যায়ে বিশাল পদ্মার আর কূলকিনারা দেখতে পেলেন না, কোনো নৌযানও নেই, তখন আবার ভয় বাসা বাঁধল মনে। দূরে পদ্মা সেতুর অবকাঠামো। রাব্বিরা ঠিক করলেন, সেতুর নিচ দিয়ে পদ্মা পাড়ি দেবেন। সেতুর নিচ দিয়ে এ পারে এসে লৌহজংয়ের পদ্মা রিসোর্টে কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার যাত্রা করলেন। 

সন্ধ্যার পর পৌঁছালেন ঢাকায়। ঠিক যেখানে নেমেছিলেন জলে, সেখান থেকেই আবার উঠলেন ডাঙায়। এই ৯ দিনে পাড়ি দিলেন ৮০০ কিলোমিটার নদীপথ। নৌকায় পুরো বাংলাদেশ ঘোরার একটা অংশ তো হলোই।

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন