‘মহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমে রসায়ন বিভাগের অতি নিরীহ একজন ছাত্র বাস করত। এসএসসি এবং এইচএসসিতে তার রেজাল্ট ভালো ছিল বলে তাকে একটি সিঙ্গেল সিটের রুম দেওয়া হয়েছিল।’

হুমায়ূন আহমেদ–ভক্তরা শুরুর বাক্য দুটি আগেও নিশ্চয়ই পড়েছেন। বাক্য দুটি আছে ২০১০ সালে প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের মাতাল হাওয়া বইয়ে। যাঁরা পড়েননি, তাঁদের জন্য বলা, ‘রসায়ন বিভাগের অতি নিরীহ একজন ছাত্র’ হলেন স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৬৮ সালে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকার জায়গা হিসেবে বরাদ্দ পেয়েছিলেন সদ্যনির্মিত হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর কক্ষটি। চলুন, ৫১ বছর পর সেই কক্ষটিতে ঢুঁ মেরে আসা যাক।

default-image

কক্ষ নম্বর ৫৬৪

২৫ আষাঢ়ের দুপুর, আকাশে ছাইরঙা মেঘ। জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘ভিজে হয়ে আসে মেঘে এ দুপুর’। ভেজা দুপুরের নিরিবিলি করিডর ধরে হেঁটে হেঁটে আমরা চলে যাই হলের একদম দক্ষিণে। যেখানে হলদেটে, প্রাচীন এবং বিচিত্রদর্শন এক লিফট অপেক্ষা করছে। বলা হয়, বাংলাদেশের প্রথম লিফট এটি। ‘আপ বাটনে’ চাপ দিয়ে কোনো সাড়া মিলল না। প্রাচীন উত্তোলক কি ভাতঘুম দিচ্ছেন? হয়তোবা! আমরা হলের আরেক প্রান্তের তুলনামূলক নবীন লিফট ধরে পাঁচতলায় উঠে পড়ি। ওপরের করিডর নিচের করিডরের চেয়েও নিঝুম। সারবাঁধা কক্ষগুলোর সামনে এলোমেলো এবং অলস বসে থাকা স্যান্ডেলগুলো বলছে—সবাই আছে ঘরে। স্যান্ডেলগুলো পাশ কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা যেতে থাকি একদম উত্তরে—৫৬১… ৫৬২… ৫৬৩… এবং সেই ৫৬৪ নম্বর কক্ষ! কমলা রঙের দরজার ওপর খোদাই করা ‘৫৬৪’ যেন মামুলি কোনো সংখ্যা নয়, গর্বিত সাক্ষী। যেন বলছে, ‘আমার ভেতরে হুমায়ূন আহমেদ বাস করতেন!’

কিন্তু হতাশ হতে হলো, দরজায় তালা ঝুলছে। পাশের কক্ষের এক বাসিন্দার কাছ থেকে জানা গেল, ৫৬৪–তে থাকেন সুমন ও মাহমুদ নামের দুজন। মাহমুদের ফোন নম্বর জোগাড় করে কথা বলে জানা গেল, তিনি সিলেটে। সুমনের নম্বরে ফোন করে সব জানাতেই বললেন, ‘ভাই, পাঁচ মিনিট বসেন, আমি আসছি।’

পাঁচ মিনিট মানে ‘অনেক সময়’। আমরা সিঁড়ি ভেঙে আরও একতলা ডিঙিয়ে উঠে গেলাম ছাদে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে। কতগুলো কাক জটলা পাকিয়ে কা–কা করছে। আর ছাদটা খাঁ খাঁ করছে। মাতাল হাওয়ায়হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘আমি এবং আনিস সাবেত। মহসিন হলের ছাদে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। ছাদে রেলিং নেই। দমকা বাতাস দিলে নিচে পড়ে যাব। এই নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। নিজেদের খুব এলোমেলো লাগছে।’

default-image

মনের জানালা

ছাদে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা হুমায়ূন আহমেদকে কল্পনা করতে করতে সুমনের ফোন এল, ‘ভাই, আসেন, রুমে এসেছি।’ প্রায় ছুটে নেমে গেলাম। ৫৬৪ নম্বর কক্ষের দরজাটা আধখোলা। ঢুকতেই বৃষ্টিভেজা বাতাস স্বাগত জানাল। বাতাস ঢুকছে ছোট্ট কক্ষের একমাত্র এবং বিশাল জানালাটি দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর দশটা হলের গড়পরতা কক্ষের মতোই সবকিছু। ব্যতিক্রম কেবল ওই জানালাটি। ওটা যেন মনেরও জানালা! জানালার ওপাশে সবুজ বৃক্ষের সমাবেশ চোখে পড়ে, দূরের আকাশ আর আকাশে ডানামেলা কাক দেখা যায়। চেষ্টা করলে অদেখা আরও অনেক কিছুই দেখা যায় হয়তো। আবারও ফিরে যাই মাতাল হাওয়ায়।হুমায়ূন লিখেছেন, ‘মহসীন হলে আমার সিঙ্গেল সিটের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমি জানালার দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি। জানালা বিশাল। শীতের হাওয়া আসছে। গায়ে চাদর দিয়েছি। চাদরের ওম ওম উষ্ণতা। আমার হাতে টমাস হার্ডির লেখা বই এ পেয়ার অব ব্লু আইজূল ইংরেজি বই না, অনুবাদ। আমি মুগ্ধ হয়ে প্রেমের উপন্যাস পড়ছি।’

৫৬৪ নম্বর কক্ষের বর্তমান বাসিন্দাদের একজন মো. সুমন সরকার। ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এমবিএ করছেন। জানালার পাশেই পাতা বিছানায় বসে ছিলেন সুমন। জানালা গলে আসা আলো পেছনে রেখে বসেছেন বলে প্রথম প্রথম তাঁর মুখ স্পষ্ট হয় না। তাঁর মুখের জায়গায় তরুণ হুমায়ূন আহমেদের মুখটি কল্পনা করতে ভালো লাগে। সুমন উঠে দাঁড়িয়ে বসতে বলেন। ৫৬৪ নম্বর কক্ষটি এখন আর ‘সিঙ্গেল সিটের’ নেই। ডবল সিট বসেছে। হালকা আকাশি রঙের দেয়াল। দরজার পাশেই চেয়ার–টেবিল। দেয়ালে দরজাওয়ালা তাক। সেই তাকের দরজার ভেতরের দিকে ২০০৮ সালের একটি ক্যালেন্ডার। সুমন বললেন, ‘পুরোনো স্মৃতি বলতে এই ক্যালেন্ডারটাই। তা ছাড়া আর কিছু নেই। হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি থাকার তো প্রশ্নই আসে না।’

পুরোনো দিনের গল্প

default-image

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতি থাকা উচিত ছিল কি না বা কীভাবে স্মৃতিতে মোড়ানো যায়—এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল সুমনের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কবে থেকে জানেন, এই কক্ষে হুমায়ূন আহমেদ থাকতেন? সুমন বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বই পড়ে জেনেছিলাম। এক বছর আগে এই রুমে আসি আমি। হঠাৎ একদিন মনে হলো, আরে, এই তো সেই ৫৬৪ নম্বর রুম! নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হলো তখন।’

সুমন নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন। কারণ, এই কক্ষে বসে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘দিতে পারো এক শ ফানুস এনে/ আজন্ম সলজ্জ সাধ/ একদিন আকাশে কিছু ফানুস ওড়াই।’ এই কক্ষে বসেই লিখেছিলেন প্রথম দুই উপন্যাস—শঙ্খনীল কারাগার নন্দিত নরকে।জোছনা খুব প্রিয় ছিল তাঁর। বিশাল এই জানালা দিয়ে নিশ্চয়ই ‘জোছনার ফুল’ ধরারও চেষ্টা করতেন। বৃষ্টিও খুব প্রিয় ছিল তাঁর। সুমন বলছিলেন, ‘এই জানালা দিয়ে যখন বৃষ্টি দেখি, তখন নিজের মধ্যেও কেমন কাব্যিক ভাব আসে। মনে হয়, কিছু একটা লিখি। হুমায়ূন আহমেদেরও হয়তো তেমনটাই হতো। এখন অনেকেই এই রুমটা দেখতে আসে, একটা রাত থাকতেও চায়। এই রুমে হয়তো খুব বেশি দিন থাকা হবে না। তবে সারা জীবন মনে রাখব, হুমায়ূন আহমেদের রুমে আমিও থাকতাম। খুব মিস করব!’

হুমায়ূন আহমেদও মুহসীন হলের জীবনটা মিস করতেন। আমার আপন আঁধার বইয়ে লিখেছিলেন, ‘দেখতে দেখতে কুড়ি বছর পার হয়ে গেল। আনিস সাবেত মারা গেল ক্যানসারে। বন্ধুবান্ধবরা আজ কে কোথায় জানিও না। মাঝে মাঝে হলের সামনের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় মনে হয়—আবার সবাইকে খবর দেয়া যায় না? খেতে খেতে আমরা পুরোনো দিনের গল্প করব…।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0