হুমায়ূন গিয়ে বসেন বালিকার পাশে

বিজ্ঞাপন

নতুন প্যান্ট, তবে জিপার নেই। এ নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন ছোট্ট হুমায়ূন। সুবোধ বালকের মতো গিয়ে বসলেন শ্রেণিকক্ষে। মেঝেতে পাতা পাটি। প্রথমে ছাত্রীরা, পেছনের সারিতে ছাত্ররা। ছাত্রদের নির্দিষ্ট সারিতে না বসে হুমায়ূন বসলেন এক সুশ্রী বালিকার পাশে!

সেই রূপবতী বালিকা হুমায়ূনের জিপারহীন প্যান্টের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘তোর তো সবকিছু দেখা যাচ্ছে!’ ব্যস, আর যায় কোথায়? ক্লাসসুদ্ধ সব বালক-বালিকার মধ্যে হাসির রোল পড়ল। ক্ষুব্ধ বালক হুমায়ূন ওই রূপবতী বালিকা নয়, রাগ ঝাড়লেন সহপাঠী এক বালকের ওপর। ওই বালকই কিনা সবচেয়ে বেশি জোরে জোরে হাসছিল! তাই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হুমায়ূন কনুই দিয়ে আঘাত করে সামনের পাটির একটি দাঁত ফেলে দিলেন! (সূত্র: আমার ছেলেবেলা— হুমায়ূন আহমেদ)।

default-image

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনের ঘটনা এটি। শুরুর দিনই রীতিমতো রক্তারক্তি কাণ্ড! ঘটনার পরপরই স্যার ক্লাসে এলেন। হুমায়ূনকে শাস্তিও দিলেন। প্রথম শ্রেণির ক্লাস চলাকালীন দুই ঘণ্টা হুমায়ূন কান ধরে ক্লাসে দাঁড়িয়ে রইলেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনও হুমায়ূনের জন্য একই শাস্তি বরাদ্দ ছিল। দ্বিতীয় দিন অপরাধ ছিল বালিকাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসা, আর তৃতীয় দিন এক সহপাঠীর স্লেট ভেঙে ফেলা। এর কিছুদিন পর সহপাঠিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কারণে হুমায়ূনকে দুই হাতে দুই ইট নিয়ে নিলডাউন হয়ে থাকতে হয়েছিল কয়েক ঘণ্টা। তাঁর শৈশবের দুষ্টুমির স্থানই যেন ছিল এ স্কুল।

লেখক নিজেই এসব লিখে গেছেন তাঁর বইয়ে। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের সেই স্কুলটির অবস্থান সিলেট শহরের মীরাবাজার এলাকায়। নাম কিশোরী মোহন (বালক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৩০ সালে স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানটিই তাঁর প্রথম স্কুল। ১৯৫৫ সালে যখন হুমায়ূন এই স্কুলে ভর্তি হন, তখন এর নাম ছিল কিশোরী মোহন পাঠশালা। হুমায়ূন এ পাঠশালায় ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। শৈশবের সেই স্কুল ঘিরে হুমায়ূনের স্মৃতির শেষ নেই। তাই তাঁর বিভিন্ন লেখায় জীবনের প্রথম এ স্কুলের প্রসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। এ স্কুলেই পেয়েছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু ‘মাথামোটা’ শংকরকে।

default-image

নানা দুষ্টুমির কারণে প্রায় নিয়মিতই শাস্তি পাওয়া হুমায়ূনের সঙ্গী থাকতেন শংকর। তাঁকেও হুমায়ূনের মতো দুষ্টুমির কারণে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। শংকরকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এক লেখায় লিখেছেন, ‘মাথামোটা শংকর। মোটা বুদ্ধি অর্থে নয়, আসলেই শরীরের তুলনায় তার মাথা অস্বাভাবিক মোটা ছিল। ক্লাস ওয়ানে সে যতখানি লম্বা ছিল, ক্লাস ফাইভে ওঠার পরও সে ততখানি লম্বাই রইল, শুধু মাথাটা বড় হতে শুরু করল। মারামারিতে সে আমার মতো দক্ষ নয়, তবে মারামারির সময় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আঁ-আঁ ধরনের গরিলার মতো শব্দ করে প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে যেত। এতেই অনেকের পিলে চমকে যেত। শংকরকে নিয়ে শিশুমহলে আমি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করে ফেলি।’

হুমায়ূনের সেই ‘জানে দোস্ত’ শংকর অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। তাঁর সেই পাঠশালার পুরোনো ভবনও এখন আর নেই। এখানে এখন দোতলা ভবন উঠেছে। পাশেই উঠেছে আরেকটি ত্রিতল ভবন। অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হুমায়ূনকে ভুলে যায়নি কর্তৃপক্ষ। এ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির কক্ষটি হুমায়ূনের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিরক্ষার্থেই এমনটি করা হয়েছে বলে জানালেন প্রধান শিক্ষিকা ফরিদা পারভীন। তিনি জানান, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের গর্ব। তিনি এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর স্মৃতি ও কর্মকে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জানাতেই একটি কক্ষ তাঁর নামে নামকরণ করা হয়। সেই কক্ষের প্রবেশমুখে হুমায়ূনের সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্মও লেখা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন