বাংলাদেশের লাখো মেয়ে পিরিয়ড, অনিশ্চয়তা ও ভয় নিয়ে বড় হয়। সংকোচের কারণে পরিবার থেকে তারা এ বিষয়ে তেমন কিছু জানতে পারে না। যতটুকু জানে তা-ও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক নয়। স্কুলেও কারও কাছে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। অনেক সময় স্কুলের শিক্ষিকা সাহায্য করলেও সবার সে সৌভাগ্য হয় না। মা, বড় বোন, বান্ধবী, স্কুলের আয়াদের কাছ থেকেই যা জানার; অনেক সময় তা-ও থাকে ভুলে ভরা। আবার তারাও ভুল তথ্যগুলো পৌঁছে দেয় অন্য কারও কাছে। এভাবেই ভুলের একটি চক্র চলতেই থাকে। আর ভুল থেকেই জন্ম নেয় মারাত্মক সব শারীরিক সমস্যা। কেউ কেউ স্কুলই ছেড়ে দেয়। অথচ সমাধানটা কতই না সহজ।

জীবনের শুরুর দিকের পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা যেন কষ্টের আর ভুলের না হয়, সে জন্য সেনোরা দীর্ঘ এক যুগ ধরে চালিয়ে আসছে ‘স্কুল প্রোগ্রাম’। লৌহজংয়ের একটি গার্লস স্কুলে প্রথম যখন প্রোগ্রামটি শুরু হয়, তখন স্কুলের মেয়েরা, শিক্ষিকারা ভাবতেই পারেননি যে পিরিয়ড নিয়ে এমন স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা হওয়া সম্ভব। স্কুলের সেই শিশু, কিশোরীরা লাজুক মুখে যখন শুনছিল স্বাভাবিক এ শারীরিক অবস্থার বর্ণনা, তখন তাদের গালে লাল আভার আড়ালেও উঁকি দিচ্ছিল হাফ ছেড়ে বাঁচার আনন্দ। কত সহজেই পিরিয়ডের মতো স্বাভাবিক এ প্রক্রিয়াটি ম্যানেজ করা সম্ভব, এটা ভেবেই তারা ছিল উল্লসিত। তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো স্কুলে সেনোরা চালিয়ে আসছে এ অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের দিন পরিচিতিমূলক পর্বের শেষে একটি অডিও ভিজ্যুয়াল দেখিয়ে ছাত্রীদের বোঝানো হয় সবকিছু। এরপর একজন গাইনি চিকিৎসক পিরিয়ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি। সেনোরার কেয়ার লাইন নম্বর (০৮০০০৮৮৮০০০)। এই নম্বরের মাধ্যমে ছাত্রীরা কী ধরনের সহায়তা পেতে পারে, সে বিষয়েও বিস্তারিত বলা হয়। অনুষ্ঠান শেষে একজন ছাত্রী স্বাস্থ্যকরভাবে পিরিয়ড ম্যানেজ করা শেখে আর শেখে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা—পিরিয়ড কোনো ট্যাবু নয়।

সেই এক যুগ আগে শুরু হওয়া এ স্কুল প্রোগ্রামের মাধ্যমে সেনোরা প্রায় ৩৭ লাখ মেয়েকে দিয়েছে পিরিয়ড বিষয়ে সচেতনতা। এ বছরও আগস্ট পর্যন্ত তিন শরও বেশি স্কুলে এ অনুষ্ঠান চলেছে। ভবিষ্যতেও স্কুলগুলোয় প্রোগ্রামটি চলতে থাকবে বলে জানিয়েছেন সেনোরার ব্র্যান্ড কর্মকর্তা।

হবিগঞ্জ গার্লস হাইস্কুলের শিক্ষার্থী শমী জানায়, বাসায় প্রথম মায়ের কাছেই সে ভাসা-ভাসা পিরিয়ড বিষয়ে জানে। তবে স্কুল প্রোগ্রামটির পর সে এ বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন হয়। একই সঙ্গে সে জানায়, শুধু স্কুলে নয় বরং ঘরে ঘরেই হওয়া উচিত এমন উদ্যোগ। ‘স্কুল প্রোগ্রামটির মাধ্যমে মেয়েরা পিরিয়ড বিষয়ে যেমন সচেতন হয়েছে, একই সঙ্গে পিরিয়ড যে কোনো সংকোচ নয়, এটাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এ উদ্যোগ’ এমনটাই জানালেন কুমিল্লা মডার্ন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম।

এক যুগ ধরে নীরবেই চলা সেনোরার স্কুল প্রোগ্রামটি সবার চোখে আঙুল দিয়ে এটাই দেখিয়েছে যে ইচ্ছে থাকলেই ভালো কিছু করা সম্ভব। যে মেয়েরা একসময় দেশ চালাবে, তাদের চলার পথটা যেন মসৃণ হয়, এটুকু তো নিশ্চিত করাই যায়। নইলে ভবিষ্যতের বেগম রোকেয়ারা কেবল অজ্ঞানতা, অনিশ্চয়তা আর বিভ্রান্তির আঁধারেই ঘুরপাক খাবে।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন