default-image
>

জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এবার তিনি তৃতীয় মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রিয়াদুল করিম

প্রথম আলো: তৃতীয় মেয়াদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা জানতে চাই

শিরীন শারমিন চৌধুরী: স্পিকার পদটা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। সংবিধান এবং কার্যপ্রণালি বিধির আলোকেই এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রথমবারের মতো যখন স্পিকারের দায়িত্ব নিই, তখন একজন নারী হিসেবেও যাতে দায়িত্বটা সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারি, সে বিষয়টার প্রতি অনেক বেশি সচেতন থেকেছি। যাতে অন্য কোনো নারী স্পিকার পদে আসার ব্যাপারে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত না হয়। আর যখনই স্পিকারের আসনে বসি, তখন মনে করি দেশের নারীদের জন্য আমার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে। আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সুযোগ না পেলে নিজেকে প্রমাণ করার উপায় নেই।

প্রথম আলো: সংসদের বৈঠক পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ তো আছে।

শিরীন শারমিন চৌধুরী: সংসদের বৈঠক পরিচালনায় অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকে। সদস্যদের কতক্ষণ সময় দিতে হবে, সবার প্রতি ন্যায্যতা বজায় রাখা, আইনেরও যাতে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে, সব বিষয় মাথায় রেখেই বৈঠক পরিচালনা করতে হয়। সংসদের বৈঠকে দিনের একটা কার্যসূচি থাকে, তা অনুসরণ করতে হয়। অনেক বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ভূত হয়, যার জন্য পূর্বপ্রস্তুতির কোনো সুযোগ থাকে না। তাৎক্ষণিকভাবেই তা নিষ্পত্তি করতে হয়। ক্ষমতা ও কার্যপ্রণালি বিধি মেনেই তা নিষ্পত্তি করলেও মানুষের ‘পারসেপশন’ বলে একটি কথা আছে। এ বিষয়টি কতটুকু উত্তীর্ণ হতে পারলাম, তা গুরুত্ব দিই। আমি চাই, বিরোধী দলের সাংসদেরাও যাতে যথেষ্ট কথা বলার সুযোগ পান।

প্রথম আলো: রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেন কীভাবে?

শিরীন শারমিন চৌধুরী: ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতাম, ভবিষ্যতে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চাইলে আইনে অধ্যয়ন করা একটা ‘স্টেপিং স্টোন’ হিসেবে কাজ করবে। আমার বাবা ১৯৫৮ সালে ছাত্রলীগের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন এবং তারও অনেক আগে থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনীতি ধারণ করতেন। আমাদের বাসায় সব সময় রাজনৈতিক আবহ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় যখন আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সেল এবং নির্বাচনবিষয়ক সেলে কাজ করেছি। পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন ওয়ান–ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হন, তাঁর আইনজীবী প্যানেলে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হই। ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সদস্য নির্বাচিত হই। তার আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথমে সদস্য পরে আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি।

প্রথম আলো: সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি দীর্ঘদিনের...

শিরীন শারমিন চৌধুরী: ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী আসন সংরক্ষিত থাকবে বলে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই আমার মতো শিরীন শারমিন সে আসনে এসে পরে স্পিকার হয়েছি। নারীদের এগিয়ে আসা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জায়গায় অনেক বড় মাইলফলক এই নারী আসন। এ ছাড়া যেকোনো নারী সরাসরি নির্বাচনে আসতে পারবে সে বিধানটিও সংবিধানে রয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন সংরক্ষিত আসনের সদস্যের পাশাপাশি সরাসরি নির্বাচন করে এসেছেন ২৩ জন নারী। এ সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। সংরক্ষিত আসনের প্রক্রিয়া চিরকাল থাকবে, তা বলছি না। আমরা বলছি, যত দিন ৫০ বা ৩৩ শতাংশ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে আনতে না পারছি, তত দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত নারী আসনের দরকার আছে।

প্রথম আলো: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারীকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমিটিতে রাখার বিষয়ে দলগুলোর সদিচ্ছা কতটুকু আছে বলে মনে করেন।

শিরীন শারমিন চৌধুরী: তৃণমূলসহ রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের অভাব নেই। কিন্তু ক্ষেত্রটা প্রস্তুত না। ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য আইনগত একটা বিধান আনা হয়েছে। আমি আশাবাদী, নিশ্চয় ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আরও নারীকে আমরা পাব। আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটিতে অনেক নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক দল আসনটা জয় করতে চায়। নারীরা কোনো আসনে মনোনয়ন পেলে তিনিও জয়ী হয়ে আসতে পারবেন, এই বিশ্বাসটা নারীরা যদি দলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করাতে পারেন, তাহলে ওই আসন থেকে তাঁকে সরিয়ে আরেকজনকে মনোনয়ন দেওয়া বা কোনো ব্যাপারে শঙ্কা হয়তো কাজ করবে না। তখন অনেক নারী মনোনয়ন পাবেন বলে আমি মনে করি।

প্রথম আলো: সংসদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসার—দুটির সমন্বয় করেন কীভাবে?

শিরীন শারমিন চৌধুরী: বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেও উচ্চশিক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়ি থেকেও আমি কোনো বাধার সম্মুখীন হইনি। আমি বিয়ের পর এলএলএম করেছি। আমি দেশের বাইরে তিন বছর থেকে পিএইচডি করে এসেছি। আমার স্বামী...পরিবারের সবাই সহযোগিতা করেছেন। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার মা অনেক সহযোগিতা করেছেন। অন্যদিকে মায়ের যে সহজাত দায়িত্ব, তা আমাকেও পালন করতে হচ্ছে। আমার ছেলে এবং মেয়ে দুজনই আমাকে বুঝতে পারে। মা একটা পেশায় আছেন, সেই ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েরা তা বুঝতেও অভ্যস্ত। স্কুল থেকে ফিরে যখন খেতে বসবে, তখন মা থাকবে, এটা তারা প্রত্যাশাও করেনি। তবে অন্য সময় আমি সেটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ‘লাইফ ইজ অলওয়েজ অ্যাবাউট আ ব্যালান্স।’

প্রথম আলো: আপনার স্বপ্ন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা...

শিরীন শারমিন চৌধুরী: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আমাকে স্পিকারের পদে বসে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার যে সুযোগ দিয়েছেন, সে সুযোগটাকে যাতে কাজে লাগাতে পারি। নারীদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাতটা সম্প্রসারিত করতে চাই। আমার নির্বাচনী আসনের মানুষ আমাকে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছেন। মানুষ আমার প্রতি আস্থা রেখেছেন, আমি মানুষের আস্থার মর্যাদা রাখতে চাই। একেকটা ইউনিয়নে আমি যখন নির্বাচনী প্রচারে ঢুকতাম, ২৫-৩০টা জায়গায় মায়েদের সমাবেশ হতো, ডিসেম্বরের কনকনে শীতে গভীর রাত পর্যন্ত সভাস্থলে মায়েরা শিশুদের নিয়ে বসে থাকতেন আমার প্রতীক্ষায়। আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, ‘মা তুমি ওঠি গ্যাছ’ ‘নৌকা ওঠি গ্যাছে’। এই যে ভালোবাসা, আস্থা এটার মূল্য অপরিসীম। ‘অনেক তোমার খেয়েছি গো, অনেক নিয়েছি মা... তবু জানি নে-যে কী বা তোমায় দিয়েছি মা!’ এই সময়টা এসেছে। এখন দেশ ও দেশের মানুষকে দেওয়ার সময় এসেছে।

বিজ্ঞাপন
জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন