বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই অসাধারণ শিল্পী ও সুরস্রষ্টা অখিলবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় এবং পরেও অনেকটা ব্রাত্যই থেকে গেছেন। প্রচারবিমুখ এই শিল্পী স্বীকৃতির পেছনে একদমই ছোটেননি। এমন আত্মভোলা, সাধক শিল্পী বহু যুগে একবারই আসে। তিনি বিয়োগান্তক সুর-গল্পের এক মহানায়ক, এক যুগন্ধর গায়ক।

বাংলা গানের ধ্রুবতারা, ক্ষণজন্মা, আত্মমগ্ন, ধ্যানী এই দরদি, অতুলনীয়, কালজয়ী, জাদুকরী কণ্ঠের স্বতন্ত্র সাধক–গায়কের জন্মশতবর্ষে, পাঠশালার এবারের আয়োজন ছিল অখিলবন্ধুর জীবন ও গান ঘিরে।

আসরের শুরুতেই শিল্পী সুমন চৌধুরী অখিলবন্ধুর খুব প্রিয় শ্যামকল্যাণ রাগে ‘রসঘন শ্যাম কল্যাণ সুন্দর’ নজরুলগীতিটি পরিবেশন করেন। অখিলবন্ধুর কণ্ঠে নজরুলগীতি এক অনন্য মাত্রা পেয়েছিল। জীবনের শেষ দিকে তিনি মঞ্চে নজরুলগীতি গাইতেন খুব।

আলোচক রাজীব চক্রবর্তী বলেন, ‘অখিলবন্ধু যে গানই গেয়েছেন, সেটাই রসোত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে তাঁকে এবং তাঁর গান নিয়ে বলা খুব কঠিন কাজ। তাঁর গানের মধ্যে এমনভাবে হারিয়ে যেতে হয় যে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কাজ করাও খুব কঠিন। তবে বাঙালির একটা দায়বদ্ধতা আছে অখিলবন্ধুর প্রতি। ১৯২০ সালে অখিলবন্ধুর জন্ম। ২০২০ সালে তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে, ১০১ বছরও পূর্ণ হয়ে গেছে। আমরা কিন্তু দেখিনি, অখিলবন্ধুকে নিয়ে সেভাবে কোনো আয়োজন হয়েছে কিংবা আমরা কেউ করে উঠতে পেরেছি। বলা হয়ে থাকে, আমরা তাঁকে উপেক্ষা করেছি, তিনি উপেক্ষিত ছিলেন। এসব কথা তো আমরাই বলি। আমরা কি সেই দায় মোচনের জন্য চেষ্টা করেছি? করিনি।’
আলোচক রাজীব অখিলবন্ধুর জীবন ও তাঁর গান নিয়ে একটা উপস্থাপনা পরিবেশন করেন। তাতে করে এমন কিছু গানও শোনানো হয়, যেগুলো অখিলবন্ধুচর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজীবের পরিবেশনাটির মাধ্যমে অখিলবন্ধুর জীবনের একটা সামগ্রিক পরিচয় উঠে আসে।

default-image

রাজীব শুরুতেই অখিলবন্ধুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগের একটি কনসার্টে তোলা তাঁর একটি দুষ্প্রাপ্য ছবি দেখান। এই ছবি আগে কোথাও দেখা যায়নি। ছবিটি কলকাতা বেতারের একসময়ের কর্মী, বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্রী ভবেশ দাশের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া।

রাজীব বলেন, ‘অখিলবন্ধু আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিলেন। আমরা তাঁকে ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়। সেই ভুলে যাওয়ার হাত থেকে যে মানুষ প্রথম আমাদের মনে করিয়েছিলেন অখিলবন্ধুর কথা, তাঁর নাম সুমন চট্টোপাধ্যায় (কবীর সুমন)। অখিলবন্ধু মারা যান ১৯৮৮ সালে। তার পাঁচ বছর পর, সুমন চট্টোপাধ্যায় নিজের একটি গানে অখিলবন্ধুকে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন।’ এ বক্তব্যের সঙ্গে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সেই গান—‘বয়েস আমার মুখের রেখায় শেখায় আজব ত্রিকোণমিতি… একলা লাগার সময় মানে নিজের সঙ্গে কথা বলা, তারই ফাঁকে কোথায় যেন অখিলবন্ধু ঘোষের গলা’ গানটির কিছু অংশ শোনানো হয়। সুমনের গানের কথায় সুর মিলিয়ে রাজীব বলেন, ‘আমাদের যখন একলা লাগে, আমরা যখন একা হয়ে যাই, তখন অখিলবন্ধু ঘোষের গান আমাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে।’

আলোচক বলেন, ‘আমরা যারা ক্যাসেটের যুগে বড় হয়ে উঠেছি, তাদের মনে আছে নিশ্চয়ই, যে সময় ক্যাসেট বাজারে আসছে, সে সময় বাজার থেকে বিদায় নিচ্ছে রেকর্ড। এ রকম একটা সন্ধিক্ষণের সাক্ষী আমরা। সেই রেকর্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় লং প্লেতে অখিলবন্ধু ঘোষের ‘ও দয়াল, বিচার করো’ গানটি শোনানোর মধ্য দিয়ে। গানটি ১৯৬১ সালে মেগাফোন কোম্পানি থেকে বের হয়। রেকর্ড নম্বর জেএমজি ৬১১৭। এটি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও অখিলবন্ধুর যুগলবন্দী। অখিলবন্ধু তাঁর যাত্রাপথে বহু সুরকার ও গীতিকারের গান গলায় তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অখিলবন্ধুর রসায়ন সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল এবং পুলকের প্রায় সব গান অখিলবন্ধুর সুর করা। কিছু কিছু গান সুর করেছিলেন অখিলবন্ধুর স্ত্রী দীপালি ঘোষ।

আলোচক রাজীব অখিলবন্ধুর জীবনের কিছু প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরেন। অখিলবন্ধুর জন্ম ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর, ভবানীপুরে। তাঁদের আদিবাড়ি রানাঘাটে, তারপর হুগলিতে। শোনা যায়, শ্রী অরবিন্দ ঘোষের বংশধর অখিলবন্ধু ঘোষ। এ কথা শোনা গিয়েছিল শিল্পীর পত্নী দীপালি ঘোষের মুখ থেকে। অখিলবন্ধুর বাবা বামনদাস ঘোষ, মা মণিমালা ঘোষ। তিনি পড়াশোনা করেছেন ভবানীপুরে, নাসিরুদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুলে। ১৯৪৭ সালে বিয়ে করেন তাঁর ছাত্রী দীপালি ঘোষকে। দীপালি ঘোষ ছিলেন অসামান্য গুণী গায়িকা ও সুরকার।

১৯৪৪ সাল থেকে অখিলবন্ধু রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন প্রথাগত তালিমসহ। তিনি তখন তরুণ, ২৪ বছর বয়স মাত্র। আর এর মধ্যেই তিনি প্রথম শিক্ষা পান মামা কালিদাস গুহর কাছে। মামার কাছে গান শিখতে শিখতে তাঁর মনে হয়, গলার কিছুটা মহড়া দরকার এবং এর জন্য প্রয়োজন উচ্চাঙ্গসংগীতের শিক্ষা। সে জন্য তিনি যান নিরাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তারপর তারাপদ চক্রবর্তী, চিন্ময় লাহিড়ি এবং সব শেষে কেশব গণেশ ঢেকনের কাছে। এই কয়েকজনের কাছেই অখিলবন্ধুর প্রথাগত সংগীতশিক্ষা।

১৯৮৮ সালে এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন অখিলবন্ধু ঘোষ। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ২০ মার্চ তারিখে। অনুষ্ঠানে নির্মল নাথের ‘আধুনিক বাংলা গান: স্বর্ণযুগের ইতিবৃত্ত’ বই থেকে একটি অংশ পড়ে শোনানো হয়, যেটি থেকে বোঝা যায়, অখিলবন্ধু ঠিক কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। এক শীতের সকাল। সেদিন প্রাতঃভ্রমণকারী এক ভদ্রলোক দেখলেন, ওই আলো না ফোটা ভোরে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে চলেছেন অখিলবন্ধু ঘোষ। কৌতূহলবশত ভদ্রলোক এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আপনাকে এত সকালে কোনোদিন এদিকে দেখিনি। আপনি তো থাকেন ভবানীপুরের স্কুল রোডে।

আজ এদিকে?’ অখিলবন্ধু ঘোষ বললেন, ‘আমার প্রাতঃভ্রমণের অভ্যাস নেই। বালীগঞ্জে একটা অনুষ্ঠান ছিল। আমাকে অনেক রাতে গাইতে দিয়েছিল। তারপর বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নেই দেখে হেঁটেই ফিরছি।’ এভাবেই অখিলবন্ধুর জীবনের বহু রাত কেটেছে। হেঁটে যাওয়া, হেঁটে ফেরা, উপেক্ষা নিয়েই তাঁকে ফিরতে হয়েছে। পৃথিবী থেকেও তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। এ রকম অসংখ্য ঘটনা আছে।

অনুষ্ঠানে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ও অখিলবন্ধুর সুরে অখিলবন্ধু ঘোষের বিখ্যাত গান ‘ও দয়াল বিচার করো’ (১৯৬১) এবং শান্তি ভট্টাচার্যের কথায় ও অখিলবন্ধুর সুরে ‘শিপ্রা নদীর তীরে’ (১৯৫৪) গেয়ে শোনান সুমন চৌধুরী।

অখিলবন্ধু যাঁদের কাছে সংগীতশিক্ষা নিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন আলোচক রাজীব। তারাপদ চক্রবর্তী ছিলেন অখিলবন্ধুর অন্যতম গুরু। তার আগে তিনি শিখেছেন নিরাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। নিরাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। আমাদের সংগীতের ইতিহাসটাই এ রকম। ঠিকঠাকভাবে ইতিহাসচর্চা আমরা করি না, ইতিহাস রক্ষাও করি না। ফলে অনেক কিছু হারিয়ে যায়।

অখিলবন্ধুর গুরু তারাপদ চক্রবর্তীর কণ্ঠে ‘বনে বনে পাপিয়া বোলে’ গানটির কিছু অংশ শোনানো হয় অনুষ্ঠানে। তারাপদ চক্রবর্তীর পর অখিলবন্ধুর গুরু ছিলেন চিন্ময় লাহিড়ি (১৯১৬-১৯৮৪)। অখিলবন্ধুর মৃত্যুর মাত্র চার বছর আগে তিনি মারা যান। চিন্ময় লাহিড়ির জন্মও অখিলবন্ধুর জন্মের ঠিক চার বছর আগে। কী অদ্ভুত সমাপতন!

চিন্ময় লাহিড়িও যুগন্ধর গায়ক ছিলেন। অসামান্য সব গান গেয়েছেন। আমরা জানি, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর এক অসামান্য গান ‘ত্রিবেণী তীর্থ পথে কে গাহিল গান’–এর কথা। কাজেই দেখা যায়, নামকরা সব ঘরানার উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পীদের কাছে অখিলবন্ধু তাঁর সাংগীতিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তারাপদ চক্রবর্তীর গানের পর চিন্ময় লাহিড়ির কণ্ঠে খাম্বাজ রাগের একটি ছোট খেয়ালের কিছু অংশ বাজিয়ে শোনানো হয়।

default-image

অখিলবন্ধু ১৯৪৪ সাল থেকে বেতারে গান গাইতেন। আমাদের জানামতে, তাঁর প্রথম রেকর্ড ১৯৪৭ সালে, মেগাফোন থেকে। কিন্তু তার আগেও নাকি দুটো গান তিনি এইচএমভিতে রেকর্ড করেছিলেন। সেটি কোনো কারণে বাজারে বের হয়নি। অনুষ্ঠানে ব্যোমকেশ লাহিড়ির কথায় ও সন্তোষ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ১৯৪৭ সালের প্রথম রেকর্ডের অখিলবন্ধুর একটি গান ‘আমার কাননে ফুটেছিল ফুল’ বাজিয়ে শোনানো হয়।

অখিলবন্ধুর গান নিয়ে আমরা যারা চর্চা করি, এই গান সচরাচর আমরা শুনতে পাই না। অখিলবন্ধু যে বিভিন্ন শিল্পীর গান গলায় তুলে নিতেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন শচীনদেব বর্মন। শচীনদেব বর্মনের প্রভাব তাঁর সুরে কীভাবে পড়েছে, সেটি দেখাতে শচীনদেবের ‘আহ্‌! বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি’ এবং পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় অখিলবন্ধুর সুরে অখিলবন্ধুর গাওয়া ‘ওই যা! আমি বলতে ভুলে গেছি সে যেন বাঁশি না বাজায়’—গান দুটোর প্রথম অংশ পরপর বাজিয়ে শোনানো হয়। শচীন তাঁর গানটিতে ‘আহ্’ বলে শুরু করছেন। ঐ স্টাইলটিই অখিলবন্ধু তাঁর এই গানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। এসব প্রভাব এভাবেই বয়ে চলে। শিল্পের প্রভাব তো ওইভাবে দেখানো যায় না, কিন্তু এইভাবে বুঝে নিতে হয়।

এরপর সুমন চৌধুরী পরপর দুটো গান গেয়ে শোনান। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ও দীপালি ঘোষের সুরে অখিলবন্ধুর বিখ্যাত গান ‘যেন কিছু মনে কোরো না’ এবং নজরুলগীতি ‘কুহু কুহু কোয়েলিয়া’।

অখিলবন্ধু ঘোষের জন্মশতবর্ষে নিবেদিত পাঠশালার আসরে আলোচক রাজীব চক্রবর্তীর গভীর ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা, সুমন চৌধুরীর গান ও স্যামসন সরকারের তবলা বাদন দর্শক-শ্রোতারা ভীষণ উপভোগ করেছেন এবং মন্তব্য করে সক্রিয় থেকেছেন আসরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সঞ্চালনায় ছিলেন ফারহানা আজিম শিউলী।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন