কেন যে লোকে বাড়ি-গাড়ি কেনে। এমন একটা ক্যারাভ্যানের পেছনে পয়সা না ফেলে। মনে মনে ফন্দি এঁটে নিলাম, এই বাহন আমার চাই-ই চাই। বড়লোকি বাড়ি-গাড়ির টু-ইন-ওয়ান মধ্যবিত্ত সমাধান।

রাস্তা সামান্য ফাঁকা পেয়ে ভক্ করে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া ছেড়ে ক্যারাভ্যানটা চম্পট দিল। উড়ু উড়ু মনটাও তার সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে তাকে ফিরিয়ে আনলাম জায়গামতো।

সমান্তরালে এবার প্রমাণ সাইজের মাইক্রোবাস এসে হাজির। হ্যান্ডপেইন্ট করা চিত্তিরবিত্তির তার চেসিস। রং চড়ানোতে তাতে দারুন ভিনটেজ লুক এসেছে। তবে সব ডিঙিয়ে পেছনের সিটে বসা ফ্রক পরা মেয়েটাকে চোখ পড়ল।

default-image

বয়স ১০–১২ বছর হবে। জানালার কাচে মুখ লেপটে এদিকে তাকিয়ে দেদার ভেংচি কাটছে কানের পেছনে হাত দুটো মেলে। মুচকি হেসে হাত নাড়তে গিয়ে খেয়াল হলো অস্বাভাবিকতাটা। গোলগাল চাপা মুখে ছোট্ট পুঁতির মতো বসানো চোখ আর সামান্য ঠেলে বেরোনো জিভ। এমন চেহারা বইয়ের পাতায় অনেক দেখেছি। পড়াশোনা জিন প্রকৌশল নিয়ে। তাই বলতে পারি, মেয়েটার ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের ২টা কপির পাশে আরেকটা বাড়তি কপি আছে খুব সম্ভবত। একধরনের জেনেটিক ত্রুটি আর কি। এর নাম ডাউন সিনড্রোম। আর সে সংজ্ঞা মানলে তাকে শারীরিক আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীর কাতারে ফেলতে হয়। কিন্তু ছোট–বড় ত্রুটি এ জগতে কার নেই। বুদ্ধিশুদ্ধি কি নিজের ঘটেও খুব বেশি আছে। আর এত বুদ্ধি দিয়ে হবেও–বা কী। মনের সুখই যে আসল।

ভাবনাটা প্রমাণ করতেই যেন মেয়েটা তার প্রতিটি কোষের ৪৭টা ক্রোমোজোম কাঁপিয়ে খিলখিল হেসে উঠল। গাড়ির কাচটা জিভ দিয়ে একটু চেটেও দিল হালকা। সেই হাসিতে আমিও আমার ৪৬টা ক্রোমোজোম ঝাঁকিয়ে যোগ দিলাম প্রাণখুলে। মাত্র একটা ক্রোমোজোমের হেরফেরে আমাদের গাড়ি আনন্দ বিনিময় কোথায় আটকাল না। পৃথিবীর সব শিশু স্বর্গীয়। আজ থেকে গোমড়ামুখো বিজ্ঞানীদের দেওয়া ডাউন সিনড্রোমের নাম পাল্টে রাখলাম, ‘আপ সিনড্রোম ‘।

নব ঘুরিয়ে রেডিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। না ছাড়লেই ভালো হতো রেডিও। কারণ, শুরুতেই আতঙ্কের খবর। এই হাইওয়ের উল্টো পথে উল্কার বেগে ছুটে আসছে এক ‘গাইস্টারফারার’। ভুল করে কি ইচ্ো করেই সে ওয়ান-ওয়ে রাস্তার রং-ওয়ে দিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে দিলে তাকে গাইস্টারফারার বা গোস্টরাইডার বলে। এখন মাননীয় ভুতুড়ে চালকের জন্য বাঁয়ের লেন খালি করে সব গাড়িঘোড়াকে ডান আর মাঝের লেনে সরে যেতে বলা হচ্ছে। আর সঙ্গে সঙ্গে ইন্ডিকেটরের বাতি জ্বেলে গাড়িগুলোর ভেতর লেন বদলের হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। গোস্টরাইডারের গুঁতোয় বেঘোরে প্রাণ খুঁইয়ে নিজেরাই গোস্ট বনে যাবার কোনো মানে হয় না।

default-image

গাইস্টারফারার আর তার হঠাৎ আগমন দেখতে হল না। তার আগেই পাশের হাইওয়েতে উঠে দম ছাড়লাম। তবে রেডিও শোনার আর মানে নেই। ইচ্ছে করে ভয়ের সংবাদ কে শোনে, ধুর! তার চেয়ে গান শোনা যাক। নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত আর অনুপম রায়ের ভিড় ঠেলে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ তুলে নিলাম ড্যাশবোর্ডের দেরাজ থেকে। সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ির পুরোনো প্লেয়ার বারদুয়েক আপত্তি তুলে বাধ্য ছেলের মতো ঢোক গিলে নিল সিডিটা। দেরাজের আস্তাবল থেকে মুক্তি পেয়ে মহীনের ঘোড়াগুলোও সপাটে চাবুক ছুটিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত মাদকতা নিয়ে শুনছি,
‘ভেবে দেখেছ কি,
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে...‘।

ক্রমে ক্রমে সরে আমরাও যে কখন গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, খেয়ালই হয়নি। পাহাড়ের সমান্তরালে খণ্ড খণ্ড মেঘ ভেসে যেতে দেখে সম্বিত হলো এতক্ষণে। ষ্টুটগার্ট উঁচুনিচু ঢালু শহর। মনে হয় যেন রোলার কোস্টারে চেপেছি। তবে পাহাড়ের সবুজ স্নিগ্ধতায় পথের শ্রান্তিতে ক্লান্ত হয়ে আসা মনটা আবার শান্ত হয়ে বসে।

বড় শহরের মতন এখানে কলকারখানা আছে বটে, তবে দঙ্গল বেঁধে নেই। আর কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইমারতের জঙ্গলও চোখে পড়ে না। বাড়িঘর সব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা টিকিয়ে রেখেছে। ওপর থেকে নিচে তাকালে লাল টালির বাড়িগুলোকে কোনো বিরাট শিশুর খেলনা লেগো বলে ভুল হয়।

default-image

পোস্টকার্ডের মতো নিখুঁত সাজানো শহর দেখে তার অতীত বোঝার উপায় নেই। এই শহর বোমার আঘাতে গুঁড়িয়ে চুরচুর হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে জার্মানদের জুড়িমেলা ভার। শহরে ঢোকার পথে পোর্শে, মার্সিডিজের ঝকঝকে হেডকোয়ার্টারগুলো দেখলে লক্ষীর খবর বেশ টের পাওয়া যায়। ওদিকে সরস্বতীর পাল্লাটাও বেশ ভারী। ষ্টুটগার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি দেশজোড়া। বছরখানেক আগে এসেছিলাম একটা ওয়ার্কশপে। প্রমাণ দেখে গেছি কাছ থেকে।

ঢেউতোলা ঢালু পথ পেরিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছালাম বটে, তবে খিদেয় প্রাণভোমরা বেরিয়ে যাবার জোগাড়। ওদিকে গাড়ির নেভিগেশন এই শেষকালে বিগড়ে গেছে। ঠিকানায় না গিয়ে ভুলভাল এদিক সেদিক নিয়ে যাচ্ছে। এলোমেলো পথ হাতড়ে অবশেষে ঝকঝকে এক দালানের নিচে দাঁড়ালাম। তিনতলার খোলা বারান্দা পেরিয়ে গরম খিচুড়ি আর ঝাল করে রাঁধা মাংসের ঘ্রাণ জোরসে নাকে ঝাপটা মেরে গেল। পুরো জার্মান মহল্লা বাঙালি হেঁসেলের ঝাঁজালো ঘ্রাণে মাতোয়ারা। মাতাল মাতাল লাগছে আমাদেরও।

default-image

মাতাল উদ্ধারে এগিয়ে এল বন্ধু দম্পতি মৌরি আপু-হাদি ভাই আর তাদের ছোট্ট ছানা নূর। আর দেরি না করে ধুপধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলাম রান্নার সুবাস বরাবর। তিনতলার খোলা দরজায় হুড়মুড়িয়ে হানা দিলাম পাঁচ দিনের অভুক্ত সৈনিকের মতো। টেবিলের লাল টমেটো আর সবুজ কাঁচামরিচের হাতছানিতে মন আবেগে দ্রবীভূত। আর তো দেরি সয় না।

কিসের অটোকাহিনি আর কিসের ভ্রমণ। ভোজন হলো বাঙালির ওয়ান অ্যান্ড অনলি বিনোদন। সালাদের বাটি বাগিয়ে, বেগুন ভাজির থালা উড়িয়ে চিকন চালের খিচুড়ি আর গরুর মাংসের যুগলবন্দীতে স্বেচ্ছায় বন্দী হতে সময় লাগল না। চার ঘণ্টা ঠেঙ্গিয়ে ‘জার্নি বাই কার’ আজকে পুরোটাই সার্থক। (সমাপ্ত)

default-image

*লেখক: ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার, গবেষক, ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন