default-image

মনীষী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন, ‘মানবশিশুর সুন্দরতম স্থান হচ্ছে মাতৃক্রোড়’। এই সুন্দরতমের মানে একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। কেউ এটাকে আক্ষরিক অর্থে নিতে পারে আবার কেউ এটার বিস্তৃত ব্যাখ্যায় যেতে পারেন।

মায়ের কোলে ছোট শিশুর হাসিমাখা মুখখানি সত্যিই অনেক কথা বলে। এটা তার অধিকারের জায়গা, যেমন খুশি তেমনে খেলার জায়গা। এটা তার স্বাধীনতার জায়গা, এটা তার নিরাপত্তার জায়গা।

আমরা দেখি, মায়ের কোল থেকে শিশুকে ছিনিয়ে নিলে তার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়, তার প্রাণচাঞ্চল্য আর থাকে না। কারণ, তার সহজাত, স্বাভাবিক, সুন্দরতম স্থানে সে আর নেই। সে নিজেকে নিরাপদ বোধ করে না। ঠিক একই কথা বন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেটাই তাদের স্বাধীন বিচরণভূমি, সেখানেই তাদের বেড়ে ওটা। চিড়িয়াখানা তাদের স্বজাত জায়গা নয়। তাদের স্বাভাবিক বেড়ে উঠতে দিলে, প্রাণে ছন্দের সঞ্চারণ হয়। বাঘের যে হিংস্রতা, ক্ষীপ্রতার অমায়িক সৌন্দর্য তা শুধু বনেই দেখা যায়, চিড়িয়াখানায় নয়।

সকালে করোনা ‘নেগেটিভ’, বিকেলে ‘পজিটিভ’। ৭ মে প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে আইসোলেশনে ভর্তি এক রোগীর নমুনা পরীক্ষার ফলাফল সকালে করোনা নেগেটিভ এলেও সন্ধ্যায় করোনা পজিটিভ এসেছে। নমুনা পরীক্ষা দুটি প্রতিবেদন একই ল্যাব থেকে এসেছে বলে জানা যায়। এ রকম আরও বেশ কিছু রোগীর ক্ষেত্রেও এমন অস্বাভাবিক ডায়াগনস্টিক প্রতিবেদন পাওয়া যাওয়ায়। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রশ্ন ওঠে, যথাযথ গুণগত মান বজায় রেখে দক্ষ জনবল দিয়ে টেস্ট করানো হচ্ছে কি না।

এ অবস্থায় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করা অণুজীববিজ্ঞানীদের (মাইক্রোবায়োলজিস্টদের) পেশাদারত্বের দিকনির্দেশনামূলক সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলিজিস্ট (বিএসএম) কোভিড-১৯ শনাক্তকরণে বিভিন্ন ল্যাব থেকে আসা ভুল ফলাফল নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯ মে, ২০২০)। অন্যদিকে গ্র্যাজুয়েট মাইক্রোবায়োলজিস্ট সোসাইটি (জিএমএস) বাংলাদেশ ও তাদের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অণুজীববিজ্ঞানীর পদ সৃষ্টিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

পত্রিকার আরও প্রতিবেদন থেকে জানা যায় দক্ষ জনশক্তির অভাবে নিয়মিত সব ল্যাবে করোনা পরীক্ষা হয় না। যা আমাদের ল্যবগুলোর দৈন্যতাই প্রকাশ করে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত আরটি-পিসিআরই একমাত্র টেষ্ট, যা মলিকুলার বায়োলজির একটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ যন্ত্র এবং এটি চালাতে দক্ষ জনবল দরকার হয়। ভাইরাস নিয়ে কাজ, আরটি-পিসিআর টেষ্ট। অথচ ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারগুলোতে কোন অণুজীববিজ্ঞানী নেই। যা হতাশাজনক, এরকম গুরুত্বপুর্ণ পরীক্ষাগুলোর নির্ভূল ফলাফলের অন্তরায়।

প্রশ্ন আসতে পারে, পরীক্ষার ফলাফল ভূল আসতে পারে কি না, সকালে এক প্রতিবেদন, বিকালে অন্য প্রতিবেদন হতে পারে কি না? হ্যাঁ পারে। একবারে দক্ষ জনবল থাকলেও হতে পারে, তবে তা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। যা পরীক্ষাগুলোকে শুধু ত্বরান্বিতই করবে না, জনবিভ্রান্তি দূর করে মানুষের আস্থা অর্জনে সহায়ক হবে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আস্থার সংকট যে প্রকট, তা প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমনে লোকের সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়।

যেহেতু এই ভাইরাসটি দেশে দেশে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তাই, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশই তাদের দক্ষ জনবল দ্বারা পরীক্ষা পদ্ধতিকে নিজেদের মত করে উন্নয়ন করে নিয়েছে। এতে তাদের পরীক্ষার ফলাফলটাকে নির্ভূল করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের জন্য এরকম কোন সুযোগ নেই। দক্ষ জনবল থাকলেও, নেই সরকারের জোরালো পৃষ্টপোষকতা ও দিকনির্দেশনা। ফলে এসব গবেষণায় তেমন একটা গতি দেখা যায় না। অন্যের প্রেসক্রিপশনের (এখানে যেমন চায়না) উপর নির্ভর করতে হয়। যা আমাদের জন্য কতটুকু ফলপ্রসূ তা প্রশ্ন থেকেই যায়।

উন্নত দেশগুলোতে নেই আস্থার সংকট, এ নিয়ে নেই উদ্বেগ। যে যেখানে থাকার কথা সেখানেই নিজ ধ্যানে কাজ করে চলেছেন। কানাডায় কোভিড-১৯ এর নিশ্চিতকরণ পরীক্ষাগুলো কানাডা ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরিগুলোতে হয়ে থাকে। এই ল্যাবরেটরির পিছনের মানুষটির নাম ড. ম্যাথিই গিলবার। তিনি একজন অনুজীববিজ্ঞানী। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার বাইরেও এখানে জাতীয়ভাবে সারস, জিকা, ইবোলা, টিউবাসকুলোসিসের মত মারাত্নক সংক্রামক অণুজীব নিয়ে গবেষণা করা হয়।

অন্যদিকে বর্তমান সময়ের আলোচিত ট্রাম্প প্রশাসনের হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের অন্যতম প্রধান অ্যান্থনি স্টিফেন ফাইসি একজন চিকিৎসাবিদ। ফাউসিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংক্রামক ব্যাধি (অনুজীব ঘটিত) বিশেষ্জ্ঞ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এলার্জি এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসের ডিরেক্টর হিসেবে ১৯৮৪ সাল থেকে কর্মরত আছেন। ১ হাজার ৩ শয়ের বেশি সায়েন্টিফিক পাবলিকেশনস ও বইয়ের অথর হিসেবে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। গবেষণালব্ধ ফলাফলের বাইরে কথা বলতে যথেষ্ট অনিহা। যুক্তরাষ্ট্রের লকডাউন তুলে নেওয়া থেকে অনেক কিছুতে ফাউসির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

তাইতো জ্ঞানীজনদের কথায় বার বার প্রতিধ্বনি হয় 'যার যে স্থান, প্রকৃতিরই দান; থাকিতে দাও সেথা শোভিতে অম্লান'।

*লেখক: পিএইচডি ক্যান্ডিডেট, ইউনিভার্সিটি অব নিউব্রান্সউইক, ফ্রেডেরিক্টন, কানাডা।mnalam.mb@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0