default-image

১.

এবং...সত্য হয়ে গেল, অতঃপর ‘তিনি’ আর ‘আমি’ তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব হারিয়ে সেদিন থেকে ‘আমরা’। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পৌঁছে সংসার শুরুর সময়ে সবার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই ‘আমরা’। গেঁয়ো আর শহরের কোনো কালু-নিশিতা জুটি, শহুরে আর গ্রামের কোনো জনি-রুপালি যুগল, গেঁয়ো আর গাঁয়ের কোনো কালুয়া-সখিনা দম্পতি, অথবা শহুরে আর শহরের কোনো বাদশা-রানি কাপলদের একসঙ্গে ‘আমরা’ হয়ে পথচলাতেই আনন্দ। নিজেদের আমিত্বকে পরিহার করে আমরা হওয়াটা খুব দরকার। সংসারের সুখের জন্য, সমাজকে সুন্দর রাখার জন্য।

২.
সংসার, সমাজ আর দেশকে সুন্দর করার দায়িত্ব সবার। দায়িত্বকে আমলে নিয়ে শিক্ষাস্তরের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের সীমানা পেরিয়ে তরুণ-তরুণীরা পা বাড়ায় উচ্চতর শিক্ষার পথে। যেতে হয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজন আর বেড়ে ওঠার প্রিয় এলাকায় সব মায়াকে পেছনে ফেলে। নিজ এলাকা পেরিয়ে দূরদূরান্তে। বিশ্বশিক্ষার জন্য এগিয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের এ ত্যাগের নমুনা সব জায়গায়। কি গ্রামে, কি শহরে। জ্ঞানের অন্বেষণে সুশিক্ষা পেতে এ ছুটে চলা।

নিরন্তর এ ছুটে চলা। গ্রামের কাদামাটি মাড়িয়ে, ধুলোবালু মেখে, প্রখর সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মিতে ঝলসে গিয়ে, পরনের কাপড় উঁচিয়ে ডোবার পানিকে ডিঙিয়ে, আঁকাবাঁকা বয়ে যাওয়া প্রমত্ত নদীতে ডুবুডুবু করতে থাকা নৌকায় অতিক্রম করে, ছোট কোনো জনপথ বা ঘাট পেরিয়ে, ক্লান্ত শরীরে স্টেশনের রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে গিয়ে তবেই না গন্তব্যের পথে যেতে দূরপাল্লার কোনো বাস। পরে নিকষ কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার পথে মিটিমিটি আলো জ্বেলে সাঁই সাঁই করে ছুটে চলা জীবনের নিরাপত্তাকে থোড়ায় তোয়াক্কা করা বাসটায় রাতভর ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে কাটিয়ে তবেই না বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পৌঁছানো। সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হওয়া কিছু সৌভাগ্যবান অবশ্যই আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে শহরে তাঁদের বেড়ে ওঠা।

৩.
জন্ম কোথায়, জাত কী, বর্ণ কেমন, বেড়ে ওঠা কোথায়, তাতে কারও হাত থাকে না। সোনার চামচে খাবার নিয়ে কোনো আম্মা হয়তো তাঁর সন্তানকে খাওয়াতে পিছু পিছু দৌড়াচ্ছেন, অন্যদিকে খিদেয় পেট চোঁ–চোঁ করা সন্তানের চুপসে থাকা চেহারার দিকে তাকিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরানো কোনো মা নিশ্চয় হতাশায় মাথা চুলকাচ্ছেন। সমস্যা নেই, অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। এ জন্য কর্মের গুরুত্বটা সর্বাধিক। আসলে এটাই মোক্ষম অস্ত্র। কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। এতে ডুবে থাকা। আলো একদিন ফুটবেই।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে সারা দেশ থেকে জ্ঞানপিপাসুদের ছুটে চলাতেই ফুল ফোটার সব আশা থাকে। এখানে দিনমজুরের সন্তান, চাষির সন্তান, শিক্ষকের সন্তান, ব্যবসায়ীর সন্তান, চেয়ারম্যানের সন্তান, চাকরিজীবীর সন্তান, প্রেসিডেন্ট-এমপি-মন্ত্রী-সচিবের সন্তান সবাই সমান। মেধা দিয়ে নিজেদের প্রমাণিত করেই তবে সেখানকার ছাত্রছাত্রী তাঁরা। ভেদাভেদ ভুলে তাই সমতার শিক্ষাটা সবার আগে মাথায় নেওয়া দরকার। সমতার শিক্ষা নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরির হাতিয়ার। সুন্দর দেশ ও সমাজ গঠনের উপায়। বন্ধুত্ব তৈরির পাশাপাশি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে কঠোর পরিশ্রম করা, বিনয়ী আর নৈতিকতার চর্চা করা, স্বাবলম্বী হওয়া চেষ্টা করা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা।

৪.
স্বপ্নের শেষ নেই, চেষ্টার কমতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উঠতি বয়স। লেখাপড়ার পাশাপাশি থাকে কর্মজীবনের ভাবনা আর মনে মনে জীবন সঙ্গী খোঁজা। জীবনসঙ্গী পেতে উতলা মনের প্রেমিক খোঁজে তাঁর স্বপ্নের প্রেমিকাকে, আর প্রেমিকা প্রেমিককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বা বাইরে বন্ধুমহলে অথবা অন্য কোথাও। প্রেম খারাপ জিনিস নয়, বিধাতার দেওয়া সুন্দর উতলা মনে তার সৃষ্টির প্রতি ভালো লাগা। পরিপাটি মন, সুন্দর দৃষ্টি, বিনয়ী আচরণ, মার্জিত ব্যবহারে সৃষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হওয়াটা ভালোবাসার রসায়ন।

ভালোবাসার রসায়ন একটি সহজ বিষয়। তবে কখনো এটা রসহীন রসায়নের মতো খুবই জটিল হতে পারে। এই বিষয় বোঝার আগে নিজেকে জানাটা খুবই জরুরি। ভালো লাগার এই রসায়নের ফাঁদে পড়ে না বুঝে অযাচিত সময় নষ্ট করে শিক্ষায় দুই তুমুল প্রতিযোগীর কেউ একজন সহজেই হেরে যেতে পারেন। খুব ভালো ছাত্রছাত্রী অল্প দিনেই মানের তলানিতে নেমে যেতে পারেন। বিশাল হৃদয়ের কোমল অনুভূতি দিয়ে সৃষ্টির প্রতি সত্যিকারের ভালো লাগা কোনো মানুষের কিছুটা বিশৃঙ্খল জীবনে সুবিশাল এক আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। নিজের কর্মই জীবনের ভাগ্য গড়ে।

ভাগ্য গড়তেই সবার চেষ্টা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়, সামাজিক শিক্ষায়, জীবনের শিক্ষায় লেগে থাকা। অন্য সবার মতো রাসায়নিক বিক্রিয়া, মেকানিজম, জৈব আর অজৈব যৌগের ধর্ম আর বৈশিষ্ট্যের মতো নিজ বিভাগের এই কাঠখোট্টা বিষয়গুলো নিয়ে যখন ঢাবির ফজলুল হক হলের রুমে বসে পড়ছি. আমার উড়ন্ত মনের আঙিনার এক কোণে তখন বসে থাকা কোনো এক রূপসীর অস্তিত্ব টের পাই। এবং...সত্য হয়ে গেল, অতঃপর ‘তিনি’ আর ‘আমি’তে সেই দিন থেকে হয়ে গেলাম ‘আমরা’।

বিধাতা চেয়েছিলেন বলে রসায়ন পড়তে গিয়ে জীবনের রসায়নে এই সফলতা—আমরা চলার সাথি, ভালো বন্ধু। দুই দশকের কিছু আগে কোনো একদিন আকাশের দিকে তাকিয়েই মাটির গন্ধমাখা গ্রামের এই ছেলেকে দেশের ব্যস্ততম শহরে অতি আদরে বড় হওয়া সেই মেয়েটি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। বছর কয়েক পরে মাটির গন্ধ মাখা ছেলের মাস্টার্স শেষ হলে আগস্টের কোনো এক শুভক্ষণে জীবনযুদ্ধের জন্য এই দুই রসায়নবিদের মিশে যাওয়া। তখন থেকেই একসঙ্গে পথ চলি, ক্লান্ত হলে ফিরে ফিরে তাকাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোয়। শক্তি ফিরে পায় নতুন উদ্যমে অনেক পথ পাড়ি দিতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগে দুই বছরের জুনিয়র তিনি। বই পড়ায় দারুণ আগ্রহ তাঁর। নিজ ক্লাসে গ্রুপ স্টাডি করতে বন্ধুদের নিয়ে লেখাপড়া করতেন। তাঁর ক্লাসের বন্ধুরা আজ আমার কাছের মানুষ, ছোট ভাইবোন। দুলাভাইয়ের সঙ্গে কেউ কেউ মজায় মেতে ওঠেন। আগস্টের সেই কোনো এক শুভক্ষণের এই বিবাহবার্ষিকীর মাসে ওপরের ‘আমরা’ ছবিটি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। ইভার বন্ধু আমার প্রিয় ছোট ভাই জিয়ার মন্তব্য পড়ে খুব মজা পেয়েছি। কমেন্টটা এখানে দিতে মন চাইল, ‘পিক চুরি করে কভার ফটো!!! এই ফটো আমার বান্ধবীর প্রোফাইল পিক। নারীর স্বাধীনতা ও তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।’ জ্ঞানী মানুষ সে, উত্তরে বলি ‘ভাইরে তুমি পারোও!!! কথা কিন্তু খুবই সত্য। তোমার বান্ধবীর হয়ে মামলা ঠুকে দাও। ওর বোন কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশের খুব বড় কর্মকর্তা, জানো নিশ্চয়। সাহায্য নিয়ো। তবে বিচারককে আমি বলব, সে আর আমি তো আলাদা কেউ না, “সে” আর “আমি” অস্তিত্ব হারিয়ে হয়ে গেছি “আমরা”। মামলা ডিসমিশ। বিচারক বলবেন, এবার মামলাকারীকে নিয়ে এসো!’

৫.
সংসারের সুখের জন্য, সমাজকে সুন্দর রাখার জন্য নিজেদের আমিত্বকে পরিহার করে ‘আমরা’ হওয়াটা খুব দরকার। পরিপাটি মন, সুন্দর দৃষ্টি, বিনয়ী আচরণ, মার্জিত ব্যবহারে সৃষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হওয়াটাই ভালোবাসার রসায়ন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়, সামাজিক শিক্ষায়, জীবনের শিক্ষায় সফলতা আনতে লেগে থাকতে হয়। ধনী-গরিব, গ্রাম-শহর ভেদাভেদটা চিরস্থায়ী নয়, অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কর্মের গুরুত্বটা সর্বাধিক। আসলে এটাই মোক্ষম অস্ত্র। কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। এতে ডুবে থাকা। আলো একদিন ফুটবেই।

*লেখক: রিসার্চ সায়েন্টিস্ট, টরন্টো, কানাডা। adeq78@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন