বৃষ্টির বেড়ে গেছে। মেয়েটিও কাছাকাছি চলে এসেছে। একটু আগেই মেয়েটি ছাতা মেলেছে। বাতাসে গতিও বেড়েছে। মেয়েটির ওড়না উড়ছে। জামাটা পতপত করে উড়ছে। মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে আদির ঘরে সামনে চলে এল। আদি আরও অবাক হলো। এই ঝড়বৃষ্টিতে মেয়েটি যাচ্ছে কোথায়? আরেকটু পথ যেতেই বাতাসের গতিতে মেয়েটির হাত থেকে ছাতাটি উড়ে যায়। আদি এবার মেয়েটিকে ডাক দেয়, ‘হ্যালো শুনছেন, আপনি ভেতরে চলে আসুন।’ মেয়েটি আসছে না। আদি আবার ডাকল। এবারও মেয়েটি আসছে না। আদি বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়াল। মেয়েটি অবাক হয়ে আদির দিকে তাকাল। বলল, ‘প্লিজ, এভাবে ভিজবেন না। চলুন ঘরে চলুন।’ মেয়েটি কিছু বলছে না। এদিকে বৃষ্টিতে আদি ও মেয়েটি ভিজে একাকার। একপর্যায়ে আদি মেয়েটির হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে যায়।

default-image

আকাশে বিকট শব্দ। ঘরের চালে বৃষ্টির শব্দে মুখরিত চারপাশ। ভেতরে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে আদি। মাঝেমধ্যে টিনের চালে বিকট শব্দ হয়। গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে। লোডশেডিং হয়েছে। ঘরের ভেতর খানেকটা অন্ধকার। মেয়েটির পুরো শরীর ভিজে আছে। এদিকে শীতল আবহাওয়া। আদি ভাবছে আর যাহোক, মেয়েটিকে শুকনো জামা দিতে হবে। কিন্তু আদির ঘরে মেয়েদের কোনো জামা নেই। পশ্চিম ঘরে নেহার জামা আছে। কিন্তু প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির জন্য সেই ঘরে যাওয়া সম্ভব নয়। অবশেষে আদির একটি টি–শার্ট ও প্যান্ট পরতে দেয় মেয়েটিকে। প্রথমে মেয়েটি পরতে চায় না। দুয়েকবার আদির অনুরোধ করার পর মেয়েটি জামা চেঞ্জ করে। আদি ঘরে এসে দেখে মেয়েটি তার টি–শার্ট ও প্যান্ট পরেছে।

সবকিছু কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে আদির। মেয়েটির সঙ্গে এত কথা বলছে, একটি কথারও জবাব দিচ্ছে না মেয়েটি। একপর্যায়ে আদি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘প্লিজ, কিছু মনে করো না। আমাকে এ পর্যন্ত অনেক মেয়ে প্রপোজ করেছে। আমি সায় দিইনি। কিন্তু আজ তোমাকে দেখার পর মনে হলো, তোমার জন্য বোধ হয় এত দিন আমি অপেক্ষা করেছি।’ আদির চোখে পানি টলমল করছে। মেয়েটি আদির মাথায় হাত বুলাতেই, আদি মেয়েটির পায়ের কাছে পড়ে যায়। তারপর মেয়েটি আদিকে ধরে খাটের ওপর বসায়। মেয়েটির কোমল হাতের পরশে আদি ঘুমিয়ে পড়ে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আদির ঘুম ভাঙে। এদিক–সেদিক তাকিয়ে মেয়েটিকে খুঁজছে। কিন্তু কোথাও মেয়েটি নেই। বালিশের এক পাশে একটা চিঠি পেল আদি। অতি আগ্রহের সঙ্গে চিঠির ভাঁজটা খুলে পড়তে শুরু করে সে।

default-image

হে পরমপ্রিয় সখা,

তব তরে মোর প্রেম জাগিয়েছে বৈকি। তুমি তো কেবল বলিয়াছো কথা। যা কি না আমার বক্ষে ছুরির আঘাতের মতো বিঁধিয়াছে। সেই আঘাত স্বর্গের সুখ মনে হইয়াছে। তোমার চোখে যে প্রেম দেখিয়াছি আমি, সেই প্রেম উপেক্ষা করে চলে আসার শক্তি আমার যে নেই। তুমি যে মম চিত্ত করেছ হরণ। মোর হৃদয়টুকু তোমাকে দিয়ে এলেম হে। তোমার সনে দুটো কথা বলিবার প্রবল ইচ্ছা ছিল। সেটা তুমি বুঝে নিয়ো। কী করে বলি, আমি যে কথা বলিতে জানি না। প্রকৃতি যে মোরে করেছে বাক্‌প্রতিবন্ধী। তুমি বলেছ, আমি সুন্দরী। হ্যাঁ, জানি আমি সুন্দরী। এত সুন্দর না হলেও ভালো ছিল। কথা বলতে পারি না বলে, পাশের বাড়ির কাদির চাচা বাবার সন্ধানে এসে আমাকে একা পেয়ে জোর করে জড়িয়ে ধরেছিল। সর্বনাশটাও হতো, তার আগে বাবা চলে এসেছিল। পৃথিবীর বুকে অনেক শেয়াল–কুকুর আছে। আমার দৃষ্টিতে মানুষও শেয়াল–কুকুরের চেয়ে কম নয়। তুমিও মানুষ, তোমাকে কি না শেয়াল–কুকুর ভাবতে পারছি না। ফাঁকা ঘরে তুমি আমি ছিলেম বহুক্ষণ। দুটি তরুণ–তরুণী একই কক্ষে থাকবে, আর কিছু হবে না, সেটা আজ তোমার সঙ্গে থেকে বুঝেছি। অথচ দেখ, কেন জানি তোমার আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে যেতে আমারও খুব ইচ্ছা হয়েছিল। তুমি ভালো মানুষ। পুরুষ মানুষ অতটা ভালো সাজে না। তুমি ভালো থেকো পরমপ্রিয় সখা। হয়তো জীবনে আর কখনো হবে না দেখা। তাই বলে এটা ভেব না, তোমাকে ভুলে যাব। লোকে বলে ভালোবাসা মানে নাকি শরীর তরে শরীরের আলিঙ্গন। আমার তরে তোমার একটু স্মৃতিই যথেষ্ট, একটু প্রীতি যথেষ্ট, একটু স্পর্শ যথেষ্ট।

ইতি

অপরিচিতা

চিঠিটা পড়ে আদির চোখে পানি আসে। জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। দৃষ্টি ফেলে গ্রামের মেঠো পথে। জনতার অভাব নেই। নেই শুধু অপরিচিতা নামের সেই মেয়েটি। প্রেম বুঝি এমনই, ক্ষণে আসে ক্ষণে যায়।
লেখক: এম হৃদয়, সিঙ্গাপুর

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন