দেখতে দেখতে এ দেশে আমার ৪৫ বছর পার হয়ে গেল। এ দেশ সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা ভালো–মন্দ মিশিয়ে। জাতি–বিদ্বেষ নিয়ে এ দেশের অনেক বদনাম আছে, কিন্তু আজ এটা আমার বিষয় নয়। আমার এত বছরের অভিজ্ঞতায় এটা এ দেশের প্রতিদিনের জীবনে বড় বিষয় নয়। গত এক বছরের অভিজ্ঞতা কল্পনার বাইরে ছিল।

অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে বৃষ্টির খুব অভাব। বুশ ফায়ার এ দেশে অতি স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিটি প্রদেশে বড় বড় ফায়ার সার্ভিস দপ্তর আছে। তার ওপর আছে রুরাল ফায়ার সার্ভিস দপ্তর। যখন আগুন লাগে, তখন ফায়ার ফাইটারদের সাহসিকতার অনেক গল্প বের হয়। এ সময় যদি কোনো বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা যায়, ‘বড় হয়ে কী হবে?’ নিশ্চিত উত্তর আসবে, ফায়ার ফাইটার হব।’ অনেকে নিজের পেশার বাইরে স্বেচ্ছায় ফায়ার ফাইটিং কোর্স করে এবং ফায়ার ফাইটিং রিজার্ভে নাম লেখায়। একবার বুশ ফায়ারের সময় আমার অফিসের সিইওকে পাওয়া যাচ্ছিল না। জানা গেল, তিনি একজন ভলেন্টিয়ার ফায়ার ফাইটার। পরের দিন ধুলা–ভস্মমাখা শরীর নিয়ে ভদ্রলোক সোজা অফিসে হাজির হয়ে গোসল সেরে কাজে যোগ দেন।

কয়েক বছর ধরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে কমতে ২০১৯ সালে ১০ ভাগের ১ ভাগ বৃষ্টিও হয়নি। বুশ ফায়ার প্রতিবছর হয়। কিন্তু ২০১৯ সালের বুশ ফায়ার গ্রীষ্মকাল আসার আগেই অক্টোবর মাস থেকেই ভয়াবহ রূপ নেয়। নভেম্বরে আগুন সারা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ংকর অবস্থা। শত শত কিলোমিটারজুড়ে দেশের সর্বত্র আগুন আর আগুন। বড় শহরগুলো যদিও সুরক্ষিত, ছোট শহর ও গ্রামগুলোকে বাঁচানোর মতো প্রয়োজনীয় লোকবল ছিল না। হাজারো বাড়িঘর ও গবাদিপশু পুড়ে ছাই হতে থাকে। বড় শহরে থেকেও উপায় ছিল না। আগুনের ধোঁয়া দিনকে রাত করে ফেলে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন কোথায় হারিয়ে যান। মন্ত্রীর অফিসও বলতে নারাজ তিনি কোথায় গেছেন। পরে জানা গেল, মরিসন হাওয়াই দ্বীপে পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাচ্ছেন। এটা কি প্রধানমন্ত্রীর ছুটির সময়? দেশে প্রবল সমালোচনা। এমনিতেই পাবলিক মরিসনকে পছন্দ করে না। লোকে বলে, মরিসন অব দ্য সেলস। কারণ, মরিসন সব বিষয়ে সেলসম্যানদের মতো এক কথা বারবার বলে পাবলিককে বোঝানোর চেষ্টা করেন। যা–ই হোক, মরিসনের কাছে খবর পৌঁছাল। তিনি ছুটি ফেলে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরলেন। তাতেও উপায় ছিল না। মরিসন যেখানে যান, সেখানে গালাগাল খেতে থাকেন। আগুন কোনোভাবে নেভানো যাচ্ছিল না। নভেম্বর–ডিসেম্বর দুই মাস ধরে আবহাওয়া অফিস জানিয়ে দিত কোন দিন আগুন লাগবে। দুপুরের পরে বাতাস এত গরম হয়ে যেত যে গাছে এমনিই আগুন ধরে যেত। হাজারো কিলোমিটারজুড়ে এ অবস্থা। অস্ট্রেলিয়ার অতি দক্ষ ফায়ার ফাইটাররা হার মেনে গেলেন। তাঁদের বেশ কয়েকজন মারা গেলেন। দেশ মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন।

এ সময় আমেরিকা, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড থেকে আগুন নেভানোর সরঞ্জাম নিয়ে সাহায্যকারী লোকজন আসেন। আগুন নেভাতে গিয়ে আমেরিকান একটি প্লেন পড়ে যায় ও বেশ কয়েকজন মারা যান। এমনিতে সাধারণ লোকজন বেশি মারা যায়নি। কারণ, বোধ হয় অস্ট্রেলিয়ানরা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর ব্যাপারে অতি সাবধান। যাকে বলে সারভাইবেল ইনসটিনকট। কিন্তু কোনোভাবে অবস্থা সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। সমুদ্রের ধারে ছুটি কাটানোর ছোট ছোট শহরগুলো পুড়ে শেষ হয়ে যায়। এ সময় আসে ৩১ ডিসেম্বর। সিডনির নববর্ষের আতশবাজি দুনিয়া বিখ্যাত। এ বছর আগুনের মধ্যে আতশবাজি বন্ধের দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত আতশবাজির জন্য যে যে ব্যবসায়ী টাকা দিয়েছিলেন, তাঁদের দাবিতে ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে উৎসবটি হয়। শহর কিন্তু ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এবং বাতাসে পোড়া গন্ধ। এ রকম ভৌতিক পরিবেশে ২০২০ নতুন বছর শুরু হয়। উৎসবে যোগ দিতে এবার কিন্তু লাখো মানুষ আসেনি। অস্ট্রেলিয়া নিজেকে বলে লাকি কান্ট্রি। সত্যি লাকি কান্ট্রি। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় অপ্রত্যাশিতভাবে বৃষ্টি হয়। তারপর আসে বিক্ষিপ্তভাবে প্রবল বৃষ্টি। দেশের অনেক অঞ্চল বন্যায় ভেসে যায়। শেষ হয় ভয়াবহ বুশ ফায়ার।

আমরা যখন বুশ ফায়ার নিয়ে ব্যস্ত, তখনই খবর আসে যে চীনের উহানে নতুন ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে, যা কোনো ওষুধে সারে না। পরে জানা গেল যে এই অসুখ পুরো শহরে হাজারো লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা মারা যাচ্ছে। জানুয়ারির শেষ দিকে জানা গেল, এই রোগ নানা দেশে ছড়াচ্ছে। জীবাণুটির নাম করোনাভাইরাস।

অস্ট্রেলিয়াতে করোনা বোধ হয় আসে আমেরিকা থেকে। এ সময়ে হলিউড অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস বিরাট দল নিয়ে সিনেমা শুটিংয়ের জন্য আসেন। আসার পর টম ও তাঁর স্ত্রীর করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। পরে অবশ্য দুজনই ভালো হয়ে যান। তারপর অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী পিটার ডাটন আমেরিকা থেকে করোনা নিয়ে ফেরেন। তিনিও ভালো হয়ে যান। তবে দেশের অনেক স্থানে এ রোগ ধরা পড়তে শুরু করে।

এবার স্কট মরিসন ভুল করলেন না। প্রথমেই চীনের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করলেন এবং অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করলেন। ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যাওয়া যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হয়। এ জন্য রাতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। আমার ভাগ্য ভালো। ওই রাতে আমার ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল। আমি যাত্রা বাতিল করি।

এর মধ্যে সিডনির চীনা অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকেরা সরকারকে জানান, তাঁদের হাজারখানেক লোক উহানে আটকা পড়েছেন। তাঁদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে সরকারকে তাঁরা অনুরোধ করেন। সরকার সাড়া দেয় এবং দুইবার বিমান পাঠিয়ে প্রায় ৮০০ লোককে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তাঁদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রেখে ছেড়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের কারও দেশে ফেরার পর করোনা হয়েছে বলে জানা যায়নি।

যাহোক, করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকে। এই সময় কয়েক হাজার যাত্রী নিয়ে রুবি প্রিন্সেস নামে একটি যাত্রীবাহী জাহাজ সিডনি বন্দরে ফিরে আসে। যাত্রীদের অনেকের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ আছে বলে গুজব রটে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই তাঁদের নামতে দিল এবং তাঁরা অস্ট্রেলিয়া জুড়ে নিজ বাড়িতে ফিরে গেলেন। পরে তাঁদের অনেকের করোনাভাইরাস দেখা দিল। যাঁদের বয়স বেশি ছিল, তাঁদের অনেকেই মারা গেলেন। এভাবে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া শুরু হলো। এই ভুল কেমন করে হয়েছিল, এ নিয়ে এখন তদন্ত চলছে।

স্কট মরিসন দৃঢ় পদক্ষেপ নিলেন। করোনা মোকাবিলার জন্য সব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করলেন। মুখ্যমন্ত্রীদের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় বিরোধী লেবার পার্টির। ঠিক হয় যে জাতীয় সরকার সপ্তাহে দুইবার মিলে সব সিদ্ধান্ত নেবে। তাদের প্রথম সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করে সবাইকে বাড়িতে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া একেবারে নিষেধ করে দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় কাজ কী হতে পারে, তারও নির্দেশ দেওয়া হয়। এভাবে চলে গেছে ছয় সপ্তাহ। এর মধ্যে আইন না মানার জন্য অনেকে ধরা পড়ে জরিমানা দিয়েছেন। তার মধ্যে নিউ সাউথ ওয়েলসের একজন মন্ত্রীও আছেন। মন্ত্রী মহোদয় আইন ভেঙে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে ইস্তফা দিয়ে নিজের জান বাঁচান। এ দেশে বিতর্কিত হয়ে কেউ জাতীয় পদ ধরে রাখতে চান না। দুনিয়াতে করার অন্য অনেক কাজ রয়েছে।

এর মধ্যে আটকে পড়া অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকেও দুটি ফ্লাইট এসেছে। ফিরে আসা নাগরিকদের ১৪ দিন সরকারি খরচে কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশি কারও করোনাভাইরাস হয়নি। 

এর মধ্যে করোনার প্রকোপ কমে গেছে। ১০০ জন মারা গেছেন। প্রতিদিন হাজারো লোকের টেস্ট হচ্ছে। জাতীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তিন ধাপে লকডাউন উঠিয়ে নেওয়া হবে। প্রতি ধাপের পর অন্য ধাপে যাওয়ার আগে অবস্থা বিবেচনা করা হবে। প্রথম ধাপ চলে গেছে। এখন স্থানীয়ভাবে চলাফেরা করা যাবে এবং বাড়িতে একসঙ্গে পাঁচজন পর্যন্ত অতিথি গ্রহণ করা যাবে। দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে একসঙ্গে ১০ জনের বেশি ঢুকতে দেওয়া যাবে না।

এই হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান অবস্থা। নিঃসন্দেহে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো বলা যাবে। এর কারণ, এ দেশের সামাজিক অবস্থা। অস্ট্রেলিয়া সরকার দেশের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করে। কর্মহীনদের ভাতাও এর সমান। ফলে এ দেশে ব্রিটেন বা আমেরিকার মতো গরিব আন্ডার ক্লাস নেই। এ দেশে জীবনযাত্রার মান উন্নত ও সংক্রমণের আশঙ্কা অনেক কম। অন্য দেশে এই আন্ডার ক্লাস মারা গেছে হাজারো। ৯০ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ান সরকারের কাজে খুশি। অস্ট্রেলিয়ানরা আজ নিজেদের নিয়ে গর্বিত। দুনিয়া অস্ট্রেলিয়ার কাছে শিখতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন