default-image

শরৎকাল আসার পর থেকেই দাদির মুখে একটা শ্লোক শুনতাম, ‘আইলোরে আশ্বিন, গা করে শিনশিন; পৌষের জাড়ে (শীতে) মহিষের শিং লড়ে (কাঁপে); মাঘের শীতে বাঘ কাঁদে।’ পুরো ছড়াটা এখন আর ঠিকঠাক মনে নেই আর দাদিরও অনেক বয়স হয়ে গিয়েছিল, তাই তিনিও আর মনে করতে পারতেন না। কিন্তু ছোটবেলায় উনার মুখে শুনে শুনে আমরা ছোটরাও কোরাসে বলতাম ছড়াটা।

শরৎকালের দ্বিতীয় মাস আশ্বিন থেকেই খুবই হালকাভাবে শীত পড়া শুরু হতো বলেই হয়তো–বা ছড়াটা শুরু হয়েছিল আশ্বিন মাসকে দিয়ে। তবে আমার যেটুকু মনে আছে, সেটা হচ্ছে— ভোরের দিকে সামান্য শীত পড়ত, কিন্তু দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর শীতটা থাকত না; উল্টা গরম লাগা শুরু হত। শরৎকালের শীতের মধ্যে একটা কোমল ভাব ছিল। যেটার তীব্রতা ধীরে ধীরে বেড়ে মাঘে এসে একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাত।

শরতের শীতের ভোরগুলো ছিল আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। এমনিতেই মা অনেক ভোরে উঠে রান্নার কাজ শুরু করে দিতেন, কিন্তু শরতের ভোরে মা নিয়মিত রান্না শুরু করার আগে প্রায়ই সামান্য পিঠা বানাতেন বিশেষ করে ছোটদের জন্য। রান্নাঘরের টুংটাং শব্দে ঘুম ভেঙে রান্নাঘরে গেলে মা গায়ে হালকা শীতের কাপড় পরিয়ে মাটির চুলার পাশে বসিয়ে দিতেন আমাকে। মাটির চুলায় খড়কুটা দিয়ে রান্না হতো। এই আগুন তো এই ধোঁয়া—এভাবেই রান্নার কাজ এগিয়ে চলত। আমি চুলার পাশে বসে চোখ মুছতাম আর মায়ের পিঠা বানানো দেখতাম। এই পিঠাগুলোর মধ্যে ভাপা পিঠাটা ছিল সবচেয়ে সাধারণ। চালের গুঁড়ার মধ্যে পরিমাণমতো পানি মিশিয়ে সেটাকে বাটিতে নিয়ে চুলায় সিদ্ধ হতে থাকা মাটির সরার ওপর বসিয়ে দিয়ে ঢেকে দিলেই পিঠা তৈরি হয়ে গেল। সেদ্ধ পানির ভাপ মাটির সরার কেন্দ্রের ছিদ্র পথে এসে চালের গুঁড়াগুলোকে সেদ্ধ করে দিত। তারপর সেই পিঠা কোলায় (গুড় রাখার পাত্র) রাখা গুড় দিয়ে খাওয়া হতো। অনেক পরে শহরে এসে জেনেছি, এর মধ্যে গুড় আর নারকেল দিলে সেটার স্বাদ অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু আমার কেন জানি একেবারে সাদা সেই ভাপা পিঠাটাই ভালো লাগত।

বিজ্ঞাপন
default-image

শহরতলিতে আসার পর শরৎকালের আবহাওয়ায় পরিবর্তন তেমন একটা না এলেও আমাদের জীবনমানে আমূল পরিবর্তন এসেছে তত দিনে। নদীভাঙনে নিঃস্ব–রিক্ত হয়ে শহরের প্রতিকূল পরিবেশে আব্বা প্রতিদিনই বিভিন্ন কাজের চেষ্টায় সকাল সকাল বের হয়ে পড়তেন। আর ঠিক তখনই পাশের গ্রাম চৌড়হাস থেকে একজন নারী ঝুড়িতে করে ভাপা পিঠা ফেরি করতে আসতেন আমাদের গ্রামে। উনাকে আমরা ফুফু ডাকতাম। ফুফু কাকালে কলসি ধরার মতো করে একটা ঝুড়ি ধরে রাখতেন। তার ওপরটা কাঁথা দিয়ে ঢাকা থাকত। সেই কাঁথার নিচে কলাপাতায় মোড়ানো বিভিন্ন আকারের ভাপা পিঠা থাকত। আমার যতটুকু মনে পড়ে, সবচেয়ে ছোটটা আট আনা, মাঝারিটা এক টাকা আর সবচেয়ে বড়টা দুই টাকায় বিক্রি করতেন। উনি এসেই হাঁক ছাড়তেন, এই পিঠা, ভাপা পিঠা। আর আমরা মায়ের কাছে আবদার করতাম সেটা কিনে দেওয়ার জন্য। সব সময় যে মা আবদার রক্ষা করতে পারতেন, এমনটি নয়। তবে বেশির ভাগ সময়ই কিনে দিতেন।

শরৎকাল এলেই আবহাওয়ায় যে পরিবর্তনটা দৃশ্যমান হতো, সেটা হচ্ছে ভোরের দিকে কুয়াশা পড়া শুরু হয়ে যেত। আমরা ছোটরা ফজরের নামাজ পড়ে এসে সারা পাড়াময় হেঁটে বেড়াতাম একসময়। কেউ একজন একদিন বলেছিল, শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটলে বুদ্ধি বাড়ে। ব্যস, এরপর থেকে আমরা ঘাসের মধ্যে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে শুরু করলাম। ঘাসের ডগা থেকে মুক্তার দানাগুলো আমাদের পায়ে এসে পড়ত আর কেমন একটা শিহরণ অনুভব করতাম। একসময় আমরা জেনে গেলাম, বুদ্ধি বাড়ার সঙ্গে শিশিরের কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটতে আমাদের খুবই ভালো লাগত বলে আমরা আর অভ্যাসটা ত্যাগ করলাম না। অনেক বড় হয়ে গ্রামে গেলেও বন্ধুরা সবাই মিলে শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটতাম। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি, আমি যদি এখনো গ্রামে ফিরে যাই, শরতের ভোরে ঘুম থেকে উঠে একই কাজ করব।

অস্ট্রেলিয়ার ঋতুবৈচিত্র্যে পরিবর্তনটা ঘটে বাংলাদেশের একেবারে উল্টো সময়ে। যদিও বলা হয়, এখানে মাত্র চারটা ঋতু—গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত। কিন্তু আমার মনে হয়, এখানে আসলে দুইটা ঋতু—শীত ও গ্রীষ্ম। বাকিগুলোর পরিবর্তন খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে আপনি যদি প্রকৃতির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন, তাহলে পরিবর্তনগুলো টের পাবেন। এখানেও বাংলাদেশের মতোই ছয়টা ঋতু আছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী মার্চের প্রথম দিন থেকেই শরৎকালের শুরু। বাসা থেকে স্টেশনে যাওয়ার পথে ভোরবেলা রাস্তার পাশের খোলা মাঠে হঠাৎ গাঢ় কুয়াশার চাদর মনে করিয়ে দিল, শরৎকাল এসে গেছে। আর শরীরে গরমও না ঠান্ডাও না, এমন একটা শিরশিরে অনুভূতি।

default-image

এরপর ট্রেনে করে অফিসে আসার পথে ওলাইক্রিক স্টেশনে ঢোকার আগমুহূর্তে কাশফুলের দোল দেখে আরও নিশ্চিত হলাম, প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে। তবে এখানে যেহেতু বাংলাদেশের মতো অহরহ কাশফুল পাওয়া যায় না, তাই পরিবর্তনটাও মানুষের চোখ এড়িয়েই যায়। বাংলাদেশের মতো এখানেও শরৎ মানেই নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। তবে শরতের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ দুর্গাপূজা। আর এটা যেহেতু বাংলাদেশের পঞ্জিকার সঙ্গে মিল রেখেই পালন করা হয়, তাই অস্ট্রেলিয়ার শরৎকালের আনন্দটা আমার কাছে অপূর্ণই থেকেই যায়। গাছে গাছে পাতাগুলো বর্ণিল রং ধারণ করে। দেখে মনে হয়, কোনো এক অদৃশ্য কারিগর তাঁর তুলির আঁচড়ে গাছগুলোকে রাঙিয়ে দিয়েছেন। এই গাছগুলোই শীতকালে এসে সব পাতা ঝরিয়ে একেবারে নির্জীব হয়ে যায়।

আমি আর আমার মেয়ে তাহিয়া যেহেতু একটু পাগল টাইপের, তাই প্রকৃতির ঋতুর পরিবর্তনগুলো ধরে ফেলি। আমরা ছুটির দিনের ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাসার পেছনের ঘাসের মধ্যে পা ডুবিয়ে হাঁটাহাঁটি করি। শুরুতে সে রাজি না হলেও পরবর্তী সময়ে অনেক আনন্দ পেয়েছে। এখন সে নিজে থেকেই খালি পায়ে শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটে। শরৎকাল এল আর বাচ্চারা কাশফুল দেখবে না, সেটা কী করে হয়। তাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একসময় আমরা কাশফুলও জোগাড় করে ফেললাম। সেটা নিয়ে বাচ্চাদের উচ্ছ্বাস দেখে খুবই ভালো লাগছিল। এরপর ভাবলাম, শরৎকালের আরেক অনুষঙ্গ ভাপা পিঠার ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়। যেই ভাবা, সেই কাজ। একদিন বাংলা দোকানে গিয়ে খুঁজে পেয়ে গেলাম বাংলাদেশের ভাত রান্না করার পাতিলের মতো পাতিল। তবে ডিজিটাল যুগ বলেই হয়তো–বা পাতিলের সঙ্গে একেবারে আটকানো রয়েছে সাত ছিদ্রবিশিষ্ট একটা সরার মতো বস্তু। আমরা তক্ষুনি সেটা আর সঙ্গে চালের গুঁড়া নিয়ে বাসায় এসে বানাতে শুরু করে দিলাম।

বিজ্ঞাপন
default-image

এই পাতিলের মধ্যে পানি দিয়ে সেটা ফুটে উঠার পর বাংলাদেশের নিয়মেই আমরা পিঠা বানাতে শুরু করলাম পরীক্ষামূলকভাবে। মাত্র তিনটা বানিয়েই আমরা সাফল্য পেয়ে গেলাম। তাই সেদিনের মতো আর বানানো হলো না। কিন্তু মুশকিল বাধল পিঠা বানানোর শেষে পাত্র পরিষ্কার করতে গিয়ে। যেহেতু পাত্রের মুখের সঙ্গে সরার মতো বস্তুটা একেবারে লাগানো এবং সেটা পাত্রের ভেতরের দিকে বাঁকানো, তাই পাত্রটা থেকে সম্পূর্ণরূপে পানি পরিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন আমি স্ট্যাপলার রিমুভার নিয়ে পাত্রের মুখ থেকে ঢাকনা খুলে ফেলতে লেগে গেলাম। অনেক সময় ব্যয় করার পর ঢাকনাটা একটু আলগা হলো, কিন্তু সেটা খোলা গেল না। সকালবেলা প্রতিবেশী নাজমুল ভাইয়ের কাছ থেকে প্লায়ার্স নিয়ে এসে সেটা দিয়ে ঢাকনাটা সরিয়ে ফেলতে পারলাম। এরপর আমরা আর তাহিয়ার বান্ধবী জেইনারা মিলে পরিকল্পনা করলাম আবার একবার পিঠা বানানোর। আমাদের এই ছেলেমানুষিতে বরাবরের মতোই উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে এলেন নাজমুল ভাই ও সন্ধ্যা ভাবি। এরপর আমরা বানিয়ে ফেললাম একেবারে বাংলাদেশের ভাপা পিঠা। ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’—প্রবাদটির প্রমাণ আবার হাতেনাতে পেলাম।

বিদেশের যান্ত্রিক জীবনের আনন্দগুলোকেও কেন জানি আমার কাছে যান্ত্রিক আর একঘেয়েমি লাগে। তাই বৈচিত্র্য আনার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের পাগলামি করি, যেটার রসদ জোগায় আমার শৈশবের গ্রামবাংলার আবহমান কালের স্মৃতি। আর সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মনেও আগ্রহ তৈরি হয়ে যায়। তৈরি হতে থাক নতুন নতুন স্মৃতি। আশা করি, ওরা যখন বড় হয়ে অতি যান্ত্রিকতায় হাঁপিয়ে উঠবে, তখন যেন শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলোতে উঁকি দিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে পারবে।

  • লেখক: মো. ইয়াকুব আলী, মিন্টো, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন