default-image

অতি সম্প্রতি ঢাকায় ট্রাফিক পুলিশের কাছে এক চিকিৎসকের আইডি কার্ড প্রদর্শন নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। এটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যে নিন্দা, সমালোচনা ও তুমুল বিতর্কের ঝড় বইছে দেশে-প্রবাসে, তার মূল সমস্যা আইডি কার্ড নয় বলেই আমি মনে করি। এটি অজুহাত বা অছিলামাত্র।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ইগো, ক্ষমতা ও অসদাচরণ কেমন প্রকৃতির, তার বাস্তবতা কারও কাছে অজানা নয়। তবে সবাই কিন্তু তেমন নন। বিষয়টি যদি পুলিশকেন্দ্রিক হয়, তাহলে তো কথাই নেই। এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

অপর দিকে ক্ষমতাধর শক্তির মদদপুষ্ট কোনো সরকারি অফিসের একজন পিয়ন থেকে পদস্থ কর্মকর্তা উচ্চ পদের রাজনৈতিক ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় যে কারও জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে, তার দোর্দণ্ড ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে। বিষয়টি তেমনি—‘যে যায় লঙ্কায়, সে–ই হয় রাবণ’। নিজ নিজ ক্ষেত্রে এরা প্রায় প্রত্যেকেই রাবণ প্রকৃতির।

আলোচ্য ঘটনাটির সূত্রপাত যেভাবে হয়েছে, তাতে বোধ করি, পুলিশ চিকিৎসকের কাছে আইডি কার্ড চেয়ে কোনো অন্যায় করেনি। গায়ের অ্যাপ্রোন গাড়ির কর্মক্ষেত্রের স্টিকার আইডি কার্ডের বিকল্প নয়। যেকোনো সাধারণ ব্যক্তি এ পন্থায় জালিয়াতি যে করতে পারেন, তার প্রমাণ নিত্যই পাওয়া যায় দেশের আনাচে–কানাচে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ভুয়া ব্যাজ, ইউনিফর্ম, আইডি ও গাড়ি ব্যবহার করে জালিয়াতেরা এমন অপকর্ম নিত্যই ঘটাচ্ছে দেশে। হরতাল বা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্সগুলোর রোগী পরিবহনের আড়ালে যাত্রী পরিবহনের মতো কাজও করে মানুষ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। সুতরাং পুলিশের কর্তব্য নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টির বিষয়টি সহজভাবে দেখারও সুযোগ নেই এ ক্ষেত্রে।

তারপরও নানা অভিজ্ঞতার আলোকেই বিতর্ক এড়াতে পুলিশের উচিত ছিল চিকিৎসকের কাছ থেকে তার সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া। এমনটি করা হলে এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
চিকিৎসক ও পুলিশ এই দুই পেশাই জনসেবামূলক। দেশ ও সমাজের যেকোনো সমস্যা ও সংকটে এই দুই পেশার বিরল ত্যাগ পেশার প্রধান ধর্ম হিসেবেই বিবেচিত। উভয় পেশাতেই ত্যাগের নজির স্থাপন করেই তাঁদের মহান দায়িত্বপালন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে একে অপরকে ছোট করে দেখার বা অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই । শত প্রতিকূলতার মুখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি রক্ষায় পুলিশের নিরলস অবদানকে কোনো ক্রমেই খাটো করে মাপা যায় না। জীবন বিয়োগের ঝুঁকি উভয় পেশাতেই রয়েছে কমবেশি।

এর দুদিন পরই দেখা গেল আরেকটি অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি। জনৈক নারী আইনজীবির সঙ্গে রাস্তায় পুলিশের অপ্রীতিকর বাহাস। এ ঘটনাও ব্যক্তির অসহিষ্ণুতা ও ইগো কমপ্লেক্সকে তুলে ধরে। তারপরও দেখা গেল পুলিশ সহনশীলতার পরিচয়ই দিয়েছে। পুলিশের মতো রাষ্ট্রের একটি জনসেবামূলক বাহিনীর এমন জনবান্ধব ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই । এমনটিই দেশের সর্বস্তরের মানুষ পুলিশের কাছ থেকে বন্ধুর মতো আচরণ আশা করে। সাধারণ সব ক্ষেত্রেই পুলিশকে হতে হবে সুস্থির, সহিষ্ণু ও সদাচারণকারী।

যুগ যুগ ধরে সমাজে বিদ্যমান পরিস্থিতি এমন যে বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রে যেকোনো পর্যায়ের শ্রেণি-পেশার মানুষ থেকে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ইগো ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার অপনোদন যত দিন না করা যাবে, তত দিন এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার বিকল্প কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন আরেক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা। তার জন্য প্রয়োজন আলাদা পরিসর।

লেখক: সুইডেনপ্রবাসী

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন